মাত্র ৩৫ টাকা মাসিক আয় দিয়ে শুরু হয়েছিল যে জীবন, সেই মানুষটিই একসময় হয়ে উঠেছিলেন ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শক্তিমান অভিনেতা। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, পেয়েছেন কোটি মানুষের ভালোবাসা, কিন্তু খ্যাতি ও অর্থের শীর্ষে পৌঁছেও ভুলে যাননি নিজের সংগ্রামের দিনগুলো। তিনি নানা পাটেকর—একজন অভিনেতা, যিনি শুধু পর্দায় নয়, বাস্তব জীবনেও মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছিলেন।
৭৫ বছর বয়সে বৃহস্পতিবার মারা গেছেন এই কিংবদন্তি অভিনেতা। গোয়ার বাসভবনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর ভারতীয় চলচ্চিত্র অঙ্গনে নেমে আসে শোকের ছায়া। ভক্ত, সহকর্মী ও চলচ্চিত্রপ্রেমীরা স্মরণ করছেন তার অসাধারণ অভিনয় এবং সাধারণ জীবনযাপনের দর্শন।
নানা পাটেকরের জীবনের শুরু ছিল কঠিন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে। কৈশোরেই পরিবারের আর্থিক সংকট মোকাবিলায় তাকে কাজ শুরু করতে হয়েছিল। মাত্র ১৩ বছর বয়সে মাসে ৩৫ টাকা ও একবেলা খাবারের বিনিময়ে সিনেমার পোস্টার আঁকতেন তিনি। কলেজজীবনে রাস্তায় জেব্রা ক্রসিং আঁকার কাজ করেও আয় করেছেন।
অভাবের সেই দিনগুলোই তাকে সাধারণ মানুষের কষ্ট বুঝতে শিখিয়েছিল। পরবর্তী সময়ে নানা জানিয়েছিলেন, নিজের জীবনের সংগ্রামের অভিজ্ঞতার কারণেই তিনি দরিদ্র ও অসহায় মানুষের কষ্টকে নিজের কষ্টের মতো অনুভব করেন।
অভিনয়জগতে প্রবেশের পর ধীরে ধীরে নিজের জায়গা তৈরি করেন নানা পাটেকর। ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’, ‘অব তক ছাপ্পান’ এবং ‘ওয়েলকাম’-এর মতো সিনেমায় তার অভিনয় দর্শকদের মুগ্ধ করেছে। কখনো প্রতিবাদী চরিত্র, কখনো কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা, আবার কখনো হাস্যরসাত্মক ভূমিকায় নিজের অভিনয় দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছেন তিনি।
তার অভিনয়ের বিশেষত্ব ছিল সংলাপ বলার স্বতন্ত্র ভঙ্গি, চোখের অভিব্যক্তি এবং চরিত্রের গভীরে প্রবেশ করার ক্ষমতা। বলিউডে তিনি এমন এক অভিনেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন, যিনি চরিত্রকে শুধু অভিনয় করতেন না, বরং জীবন্ত করে তুলতেন।
তবে চলচ্চিত্রের সাফল্য তাকে জীবনযাত্রায় বদলে দেয়নি। তারকাখ্যাতির মধ্যেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত। মুম্বাইয়ের সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে থাকতেন, গ্রামের বাড়িতে সময় কাটাতে ভালোবাসতেন। বিলাসবহুল জীবন, দামি গাড়ি বা আড়ম্বরপূর্ণ জীবনধারার প্রতি তার আগ্রহ ছিল না।
নানা পাটেকর মনে করতেন, অর্থের সবচেয়ে ভালো ব্যবহার হলো মানুষের কাজে লাগানো। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, দামি গাড়িতে কোটি টাকা খরচ করার চেয়ে সেই অর্থ দিয়ে কোনো মানুষের জীবনে পরিবর্তন আনা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
তার মানবিক কাজের সবচেয়ে বড় উদাহরণ মহারাষ্ট্রের কৃষকদের জন্য তার উদ্যোগ। ২০১৫ সালে রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে খরা, ঋণের চাপ ও ফসল নষ্ট হওয়ার কারণে বহু কৃষক পরিবার চরম সংকটে পড়ে। কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা নানা পাটেকরকে গভীরভাবে নাড়া দেয়।
তিনি নিজে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কাছে যেতে শুরু করেন। বিদর্ভ অঞ্চলে আত্মহত্যা করা কৃষকদের ৬২টি পরিবারকে তিনি আর্থিক সহায়তা দেন। পরে লাতুর ও ওসমানাবাদ অঞ্চলের আরও ১১৩টি পরিবারকে সহায়তা করেন।
তবে তিনি দ্রুত বুঝতে পারেন, শুধু এককালীন অর্থ সহায়তা দিয়ে কৃষকদের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ। এই চিন্তা থেকেই মারাঠি অভিনেতা মকরন্দ অনাসপুরের সঙ্গে ২০১৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘নাম ফাউন্ডেশন’।
এই সংগঠনের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা, পানি সংরক্ষণ, জলাধার পুনরুদ্ধার এবং গ্রামীণ উন্নয়নে কাজ শুরু হয়। কৃষকদের আর্থিক সংকটের পাশাপাশি তাদের সামাজিক ও মানসিক সমস্যার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, নানা পাটেকর নিজের আয়ের বড় অংশ মানবিক কাজে ব্যয় করতেন। তার আয়ের প্রায় ৯০ শতাংশ দাতব্য কাজে ব্যবহারের কথা বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। যদিও তার ব্যক্তিগত আয় বা অনুদানের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি, তবে কৃষক পরিবারগুলোর পাশে তার সরাসরি সহায়তা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগের প্রমাণ রয়েছে।
নানা পাটেকরের কাছে মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছিল প্রচারের বিষয় নয়, বরং ব্যক্তিগত দায়িত্ব। তিনি কখনো নিজের মানবিক কাজকে বড় করে দেখাতে চাননি। তার মতে, অন্যের জীবনে সামান্য আনন্দ আনতে পারাই ছিল সবচেয়ে বড় অর্জন।
অভিনয়জীবনে তিনি যেমন শক্তিশালী চরিত্রে দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছেন, তেমনি বাস্তব জীবনেও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তৈরি করেছেন আলাদা সম্মান। একজন অভিনেতা হিসেবে নানা পাটেকরের নাম ইতিহাসে থাকবে, কিন্তু একজন মানবিক মানুষ হিসেবেও তিনি বহু মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকবেন।
৩৫ টাকা আয় করা সেই সংগ্রামী কিশোর থেকে কোটি মানুষের প্রিয় অভিনেতা—নানা পাটেকরের জীবন দেখিয়েছে, প্রকৃত সাফল্য শুধু খ্যাতি বা অর্থে নয়, মানুষের জন্য কিছু করার মধ্যেও নিহিত।

