ইংল্যান্ডে শিশুদের প্রতি যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের পিতামাতার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করার জন্য সরকার ২০২৩ সালে একটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই প্রতিশ্রুতি অনুসারে, এ ধরনের অপরাধীদের তাদের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ বা তত্ত্বাবধানের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হবে। কিন্তু ৭ মে ২০২৫-এ প্রকাশিত নতুন আইনের খসড়া অনুযায়ী, এই নিষেধাজ্ঞা কেবলমাত্র সেই শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যাদের বিরুদ্ধে অপরাধটি সংঘটিত হয়েছে এবং যাদের উপর অপরাধীর পিতামাতার অধিকার রয়েছে।
এই সীমাবদ্ধতার কারণে ভুক্তভোগী পরিবার, শিশু সুরক্ষা প্রচারকারী এবং আইন বিশেষজ্ঞরা তীব্র সমালোচনা করেছেন। তারা এটিকে সরকারের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে যাওয়া এবং শিশুদের নিরাপত্তার প্রতি অঙ্গীকারের দুর্বলতা হিসেবে বিবেচনা করছেন।
প্রেক্ষাপট-
২০২৩ সালে যুক্তরাজ্য সরকার ঘোষণা করেছিল, যে শিশু যৌন অপরাধে দোষী ব্যক্তিদের পিতামাতার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করার জন্য আইন সংশোধন করা হবে। এই প্রতিশ্রুতি এসেছিল বিভিন্ন উচ্চ-প্রোফাইল মামলার প্রেক্ষাপটে, যেখানে এ ধরনের অপরাধীরা তাদের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার বজায় রেখেছিল, যা সমাজে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। লক্ষ্য ছিল শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভুক্তভোগীদের প্রতি সরকারের সমর্থন প্রদর্শন করা।
কিন্তু ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকাশিত ভিকটিমস অ্যান্ড প্রিজনার্স বিল-এর সংশোধিত খসড়ায় দেখা গেছে যে এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র সেই শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে যারা অপরাধের সরাসরি শিকার এবং যাদের উপর অপরাধীর পিতামাতার আইনি অধিকার রয়েছে। এর ফলে যদি কোনো অপরাধী তাদের নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে অপরাধ না করে, তবে তারা তাদের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ বা তত্ত্বাবধানের অধিকার বজায় রাখতে পারে। এই সীমাবদ্ধতা সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
পরিবার এবং প্রচারকারীদের প্রতিক্রিয়া-
ভুক্তভোগী পরিবার:
ভুক্তভোগী পরিবারগুলো এই আইনকে “বিশ্বাসঘাতকতা” হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, এই সীমিত আইন শিশুদের নিরাপত্তার প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতিকে দুর্বল করে। একজন ভুক্তভোগীর মা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক- জানিয়েছে বলেছেন, “আমরা ভেবেছিলাম সরকার আমাদের পাশে আছে কিন্তু এই আইন আমাদের আশা ভঙ্গ করেছে। এটা শিশুদের ঝুঁকির মুখে ফেলে।” পরিবারগুলোর মতে, শিশু যৌন অপরাধে দোষী ব্যক্তিরা সাধারণভাবে শিশুদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, এবং তাদের পিতামাতার অধিকার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা উচিত। সূত্র: বিবিসি
শিশু সুরক্ষা প্রচারকারী:
শিশু সুরক্ষার পক্ষে কাজ করা সংগঠন এবং প্রচারকারীরা এই আইনের সীমাবদ্ধতাকে শিশুদের জন্য “বিপজ্জনক” বলে অভিহিত করেছেন। ন্যাশনাল সোসাইটি ফর দ্য প্রিভেনশন অব ক্রুয়েলটি টু চিলড্রেন (এনএসপিসিসি) এর একজন মুখপাত্র বলেছেন, “এই আইন শিশুদের সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি পশ্চাৎপদ পদক্ষেপ। শিশু যৌন অপরাধে দোষী ব্যক্তিদের অন্য শিশুদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।” তারা আরও যুক্তি দিয়েছেন যে এই ধরনের অপরাধীরা তাদের আচরণের কারণে সব শিশুর জন্য হুমকি এবং তাদের পিতামাতার অধিকারের উপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা উচিত।
আইন বিশেষজ্ঞ:
আইন বিশেষজ্ঞরা এই আইনের ভাষাকে “অস্পষ্ট” এবং “সীমিত” বলে সমালোচনা করেছেন। একজন পারিবারিক আইনজীবী বিবিসিকে বলেছেন, “এই আইনের বর্তমান রূপ শিশুদের সুরক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। এটি কেবলমাত্র নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ায় অনেক শিশু এখনও ঝুঁকির মুখে থাকবে।” তারা পরামর্শ দিয়েছেন যে আইনটি আরও বিস্তৃত করা উচিত, যাতে শিশু যৌন অপরাধে দোষী সকল ব্যক্তির পিতামাতার অধিকার স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়।

সরকারের অবস্থান-
ইউকে সরকার জানিয়েছে যে ভিকটিমস অ্যান্ড প্রিজনার্স বিল-এর লক্ষ্য শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। একজন সরকারি মুখপাত্র বলেছেন, “আমরা শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। এই আইনের মাধ্যমে আমরা নিশ্চিত করতে চাই যে শিশু যৌন অপরাধীরা তাদের শিকারের সঙ্গে যোগাযোগের অধিকার হারাবে।” তবে তারা স্বীকার করেছেন যে আইনের ভাষা এবং এর প্রয়োগের বিষয়ে আরও আলোচনা প্রয়োজন। সরকার জানিয়েছে যে তারা ভুক্তভোগীদের এবং প্রচারকারীদের মতামত বিবেচনা করে আইনটি পর্যালোচনা করবে।
সম্ভাব্য প্রভাব-
নতুন আইনের বর্তমান রূপে বেশ কিছু সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে:
শিশুদের নিরাপত্তার ঝুঁকি: যেহেতু আইনটি কেবলমাত্র অপরাধের সরাসরি শিকার শিশুদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তাই অপরাধীদের অন্য সন্তান বা পরিবারের শিশুরা ঝুঁকির মুখে থাকতে পারে।
আস্থার ঘাটতি: সরকারের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে যাওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার এবং জনগণের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা হ্রাস পেতে পারে।
আইনি জটিলতা: আইনের সীমিত প্রয়োগের কারণে পারিবারিক আদালতগুলোতে নতুন মামলা বা আইনি বিতর্ক বাড়তে পারে।
প্রস্তাবিত সমাধান-
প্রচারকারী এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আইনটি সংশোধনের জন্য নিম্নলিখিত প্রস্তাব দিয়েছে:
বিস্তৃত নিষেধাজ্ঞা: শিশু যৌন অপরাধে দোষী সকল ব্যক্তির পিতামাতার অধিকার সম্পূর্ণভাবে বাতিল করা।
কঠোর পর্যবেক্ষণ: অপরাধীদের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কঠোর শর্ত এবং তত্ত্বাবধান আরোপ করা।
ভুক্তভোগীদের মতামত: আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী পরিবার এবং শিশু সুরক্ষা সংগঠনের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া।
পরিশেষে- ইংল্যান্ডে শিশু যৌন অপরাধীদের পিতামাতার অধিকার বাতিলের নতুন আইন নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। সরকারের প্রাথমিক প্রতিশ্রুতি থেকে পিছিয়ে যাওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবার এবং শিশু সুরক্ষা প্রচারকারীরা হতাশা প্রকাশ করেছেন। এই আইনের বর্তমান রূপ শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সরকারের উপর এখন চাপ রয়েছে যে তারা এই আইনটি পুনর্বিবেচনা করে এবং শিশুদের সুরক্ষার জন্য আরও কঠোর এবং বিস্তৃত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

