২০২৬ বিশ্বকাপ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে ইতিহাসের পাতায় যুক্ত হয়েছে নতুন একটি অধ্যায়। প্রথমবারের মতো ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চারটি দলই বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে। ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ আসরের দীর্ঘ ইতিহাসে এর আগে কখনো বিশ্বের এক, দুই, তিন ও চার নম্বর দল একসঙ্গে শেষ চারে খেলেনি।
সেমিফাইনালের চার দল হলো ফ্রান্স, স্পেন, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ফুটবলে ধারাবাহিকভাবে আধিপত্য বিস্তার করা এই চার দল এবার বিশ্বকাপেও নিজেদের শক্তিমত্তার প্রমাণ দিয়েছে। ফলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, র্যাঙ্কিং ও মাঠের পারফরম্যান্সের মধ্যে বিরল এক মিল দেখা যাচ্ছে এবারের আসরে।
সবশেষে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কোয়ার্টার ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারায় লিওনেল স্কালোনির দল। আর্জেন্টিনার হয়ে গোল করেন আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, হুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্তিনেজ। তবে ম্যাচটি ছিল বিতর্কেও ঘেরা। শেষ দিকে ভিডিও সহকারী রেফারির সিদ্ধান্তে সুইজারল্যান্ড একজন খেলোয়াড় হারালে ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়।
অন্যদিকে ইংল্যান্ডও সহজ পথ পাড়ি দেয়নি। নরওয়ের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত গড়ানো ম্যাচে জুড বেলিংহ্যামের জোড়া গোলে জয় তুলে নেয় থ্রি লায়ন্সরা। এই জয়ের মাধ্যমে ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠে ইংল্যান্ড।
ফ্রান্সও নিজেদের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছে মরক্কোর বিপক্ষে। ২-০ গোলের জয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করে দিদিয়ের দেশমের শিষ্যরা। দলের দুই প্রধান তারকা কিলিয়ান এমবাপে ও উসমান দেম্বেলে একটি করে গোল করেন।
স্পেনের যাত্রাটাও ছিল দারুণ নাটকীয়। বেলজিয়ামের বিপক্ষে ২-১ গোলের জয়ে শেষ চার নিশ্চিত করে তারা। ম্যাচের নায়ক ছিলেন বদলি খেলোয়াড় মিকেল মেরিনো। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে গোল করে দলকে জয় এনে দেওয়ার ধারাবাহিকতা তিনি আবারও ধরে রাখেন।
এখন নজর সেমিফাইনালের দুই মহারণের দিকে।
প্রথম সেমিফাইনালে মুখোমুখি হবে ফ্রান্স ও স্পেন। ১৪ জুলাই ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে এই লড়াই। বর্তমান র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ দুই দল একে অপরের বিপক্ষে মাঠে নামায় ম্যাচটিকে অনেকেই আগাম ফাইনাল হিসেবে দেখছেন। একদিকে ২০১৮ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স, অন্যদিকে ২০১০ সালের শিরোপাজয়ী স্পেন। তরুণ প্রতিভা লামিনে ইয়ামালকে ঘিরে স্পেনের প্রত্যাশা আকাশচুম্বী, আর এমবাপের নেতৃত্বে ফ্রান্সও রয়েছে দুর্দান্ত ছন্দে।
অন্য সেমিফাইনালে ১৫ জুলাই আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হবে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। শিরোপা ধরে রাখার মিশনে থাকা আর্জেন্টিনার সামনে ১৯৬৬ সালের পর আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্নে বিভোর ইংল্যান্ড। লিওনেল মেসি এবারের বিশ্বকাপে ছয় ম্যাচে আট গোল করে দুর্দান্ত ফর্মে আছেন। অন্যদিকে ইংল্যান্ডের হয়ে জুড বেলিংহ্যাম ছয় গোল করে গোলদাতাদের লড়াইয়েও অন্যতম শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের সেমিফাইনাল শুধু চারটি শক্তিশালী দলের লড়াই নয়, বরং আধুনিক আন্তর্জাতিক ফুটবলের সেরা চার ফুটবল দর্শনেরও সংঘর্ষ। চার দলই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বড় আসরে ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করেছে এবং প্রতিটি দলেই রয়েছে বিশ্বমানের খেলোয়াড়ে ভরা স্কোয়াড।
ফিফা র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ চার দল একসঙ্গে সেমিফাইনালে ওঠার ঘটনাটি তাই শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং বিশ্ব ফুটবলের প্রতিযোগিতামূলক মানেরও প্রতিফলন। এটি দেখিয়ে দেয়, দীর্ঘ সময় ধরে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স ধরে রাখা দলগুলো বড় মঞ্চেও নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে।
এখন ফুটবলপ্রেমীদের অপেক্ষা দুই হাইভোল্টেজ সেমিফাইনালের। এই দুই ম্যাচের বিজয়ীরাই লড়বে বিশ্বকাপের শিরোপার জন্য, আর পরাজিত দুটি দল মুখোমুখি হবে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে। বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের চোখ এখন এই চার পরাশক্তির দিকে, কারণ আগামী কয়েক দিনেই নির্ধারিত হবে ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন চ্যাম্পিয়ন।

