২০০৩ সালে লিওনেল মেসির বয়স মাত্র ১৬। বার্সেলোনার এক প্রতিভাবান কিশোর হিসেবে তিনি তখন ধীরে ধীরে পরিচিতি পাচ্ছেন। সেই সময়ই বিশ্বের শীর্ষ ক্রীড়া সামগ্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠান নাইকি তার সঙ্গে প্রথম চুক্তি করে। বার্ষিক প্রায় ১০ হাজার ইউরোর বিনিময়ে মেসিকে নিজেদের ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হিসেবে যুক্ত করা হয়।
তখনও কেউ জানত না, এই কিশোরই একদিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হয়ে উঠবেন।
দুই বছরের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে যায়। ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে মেসি টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। একই সময়ে বার্সেলোনার মূল দলেও নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেন তিনি। ইউরোপজুড়ে তার নাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
কিন্তু মেসির মূল্য যত দ্রুত বাড়ছিল, নাইকির দৃষ্টিভঙ্গি ততটা বদলাচ্ছিল না। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, প্রতিষ্ঠানটি তার সঙ্গে নতুন করে পূর্ণাঙ্গ চুক্তি করেনি; বরং আগের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতেই সম্পর্ক চালিয়ে যাচ্ছিল।
এ সময় একটি ছোট ঘটনা দুই পক্ষের সম্পর্কে বড় প্রভাব ফেলে বলে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে। জানা যায়, মেসির বাবা হোর্হে মেসি পরিবারের জন্য কয়েকটি অতিরিক্ত ট্র্যাকস্যুট চেয়েছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, নাইকি সেই অনুরোধকে গুরুত্ব দেয়নি। বিষয়টি অর্থের চেয়ে সম্মান ও সম্পর্কের দিক থেকেই মেসি পরিবারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ঠিক তখনই সুযোগ নেয় অ্যাডিডাস।
প্রতিষ্ঠানটি মেসিকে বছরে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ইউরোর প্রস্তাব দেয়, যা আগের চুক্তির তুলনায় প্রায় ৭৫ গুণ বেশি। শুধু আর্থিক প্রস্তাবই নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ব্যক্তিগত গুরুত্ব এবং পরিবারের প্রতি ইতিবাচক আচরণের আশ্বাসও দেয় তারা।
শেষ পর্যন্ত মেসি অ্যাডিডাসে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তাকে হারাতে না চেয়ে নাইকি আইনি লড়াইয়ে যায়। তবে আদালত রায় দেন, আগের তথাকথিত “কমিটমেন্ট লেটার” বাধ্যতামূলক পূর্ণাঙ্গ চুক্তি ছিল না। ফলে অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করতে মেসির কোনো আইনি বাধা নেই।
এরপর অ্যাডিডাস আর পেছনে তাকায়নি। মেসিকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে নিজেদের সঙ্গে যুক্ত করে এবং ধীরে ধীরে তাকে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ব্র্যান্ড মুখগুলোর একজন হিসেবে গড়ে তোলে।
আজ মেসি ও অ্যাডিডাসের অংশীদারত্ব ক্রীড়া বিপণনের ইতিহাসে অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্বজুড়ে ফুটবল, বুট, জার্সি এবং বিভিন্ন প্রচারণায় অ্যাডিডাসের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একজন তিনি।
এই সম্পর্কের বাণিজ্যিক প্রভাবও স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। ২০২৩ সালে মেসি ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়ার পর অ্যাডিডাসের শেয়ারের দাম একদিনেই প্রায় ১০ শতাংশ বেড়েছিল বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্যে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার যুক্ত হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।
অন্যদিকে নাইকির ঝুলিতে তখন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর মতো আরেক বিশ্বতারকা থাকলেও, মেসিকে হারানোর মাধ্যমে ফুটবল বিশ্বের একটি বিশাল অংশে নিজেদের প্রভাব কমে যাওয়ার বাস্তবতা তাদের মেনে নিতে হয়েছিল।
তবে এই গল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক মনে রাখা প্রয়োজন। অতিরিক্ত কয়েকটি ট্র্যাকস্যুট চাওয়ার ঘটনা এবং সেটিই চুক্তি ভেঙে যাওয়ার মূল কারণ ছিল—এমন দাবি বহু বছর ধরে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচলিত থাকলেও, এ বিষয়ে নাইকি, অ্যাডিডাস বা মেসির পক্ষ থেকে বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা প্রকাশ করা হয়নি। তাই ঘটনাটিকে নিশ্চিত ইতিহাসের বদলে বহুল আলোচিত একটি বর্ণনা হিসেবেই দেখা উচিত।
তবুও এই ঘটনা ব্যবসা ও ব্র্যান্ড ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা মনে করিয়ে দেয়—কখনো কখনো একটি সম্পর্ক শুধু অর্থ দিয়ে নয়, সম্মান, আস্থা এবং মানুষের প্রতি আচরণ দিয়েও গড়ে ওঠে বা ভেঙে যায়।

