বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আবারও ফিরে আসছে বিশ্বকাপের মঞ্চে। দীর্ঘ ২১ বছর পর বিশ্বকাপে মুখোমুখি হচ্ছে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনা। বুধবার ১৬ জুলাই বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই সেমিফাইনাল নির্ধারণ করবে কোন দল জায়গা করে নেবে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই দুই দলের প্রতিটি লড়াইই আলাদা গুরুত্ব বহন করে। মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতার পাশাপাশি অতীতের নানা নাটকীয় ঘটনা এই ম্যাচকে বরাবরই ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথগুলোর একটি করে তুলেছে। ফলে এবারও দুই পরাশক্তির লড়াই ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে।
এবারের বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত অপরাজিত রয়েছে ইংল্যান্ড। নকআউট পর্বে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, স্বাগতিক মেক্সিকো এবং নরওয়েকে হারিয়ে শেষ চারে জায়গা করে নিয়েছে তারা। দলটির আক্রমণভাগে দারুণ ছন্দে রয়েছেন অধিনায়ক হ্যারি কেইন এবং মিডফিল্ড তারকা জুড বেলিংহ্যাম। দুজনই এখন পর্যন্ত ছয়টি করে গোল করার পাশাপাশি একটি করে গোলেও সহায়তা করেছেন।
বিশেষ করে বেলিংহ্যামের পারফরম্যান্স আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। মেক্সিকো ও নরওয়ের বিপক্ষে টানা দুই নকআউট ম্যাচে জোড়া গোল করে তিনি এমন এক কীর্তি গড়েছেন, যা সর্বশেষ দেখা গিয়েছিল আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনার সময়ে। অন্যদিকে গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্রের বিপক্ষে হ্যারি কেইনের জোড়া গোল ইংল্যান্ডকে দারুণ প্রত্যাবর্তনের জয় এনে দেয়।
তবে ফাইনালের পথে ইংল্যান্ডের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। গ্রুপ পর্বে শীর্ষস্থান অর্জনের পর নকআউট পর্বে প্রতিটি ম্যাচেই কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে লাতিন আমেরিকার দলটিকে। কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত সময়ে ৩-২ গোলের জয়, মিশরের বিপক্ষে শেষ মুহূর্তের নাটকীয় প্রত্যাবর্তন এবং কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনাল নিশ্চিত করেছে তারা।
আর্জেন্টিনার সাফল্যের কেন্দ্রে রয়েছেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবারও নিজের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ দিয়ে চলেছেন। এখন পর্যন্ত আটটি গোল ও দুটি গোলে সহায়তা করেছেন তিনি। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচেই আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক করে টুর্নামেন্টে নিজের উপস্থিতি জানান দেন এই মহাতারকা।
ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার প্রতিদ্বন্দ্বিতা শুধু বর্তমান নয়, ইতিহাসেও সমান সমৃদ্ধ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে দুই দল এখন পর্যন্ত ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে। এর মধ্যে ইংল্যান্ড জয় পেয়েছে ছয় ম্যাচে, আর্জেন্টিনা জিতেছে তিনটিতে এবং পাঁচটি ম্যাচ ড্র হয়েছে।
বিশ্বকাপে দুই দলের সাক্ষাৎ আরও বেশি স্মরণীয়। ১৯৬২, ১৯৬৬ ও ২০০২ সালে জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড। অন্যদিকে ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার ফাইনালে দিয়েগো ম্যারাডোনার অবিস্মরণীয় নৈপুণ্যে ২-১ গোলে জিতেছিল আর্জেন্টিনা। সেই ম্যাচেই জন্ম নেয় ফুটবল ইতিহাসের দুটি বিখ্যাত মুহূর্ত—‘ঈশ্বরের হাত’ গোল এবং ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। ১৯৯৮ সালের রাউন্ড অব ষোলোতে ২-২ সমতার পর টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা। পরে ২০০২ সালে ডেভিড বেকহ্যামের পেনাল্টি গোলে ইংল্যান্ড প্রতিশোধ নেয়।
দুই দলের সর্বশেষ মুখোমুখি লড়াই হয়েছিল ২০০৫ সালে একটি প্রীতি ম্যাচে, যেখানে ৩-২ ব্যবধানে জয় পেয়েছিল ইংল্যান্ড। এরপর দুই দশকের বেশি সময় পেরিয়ে আবারও বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় মঞ্চে দেখা হচ্ছে তাদের।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ম্যাচে কৌশলগত লড়াই যেমন গুরুত্বপূর্ণ হবে, তেমনি বড় ভূমিকা রাখবে ব্যক্তিগত নৈপুণ্য। একদিকে হ্যারি কেইন, জুড বেলিংহ্যাম, বুকায়ো সাকা ও ডেকলান রাইসের ওপর ভরসা করছে ইংল্যান্ড। অন্যদিকে লিওনেল মেসির সঙ্গে হুলিয়ান আলভারেজ, লাউতারো মার্তিনেজ, রদ্রিগো ডি পল ও এনজো ফার্নান্দেজের সমন্বয়ে শক্তিশালী আক্রমণ সাজিয়েছে আর্জেন্টিনা।
ফাইনালের টিকিটের লড়াইয়ে দুই দলের লক্ষ্য একটাই—আর মাত্র একটি জয়। তাই ফুটবলপ্রেমীরা অপেক্ষা করছেন এমন একটি ম্যাচের জন্য, যেখানে ইতিহাস, আবেগ, প্রতিশোধ এবং শিরোপার স্বপ্ন—সবকিছুই একসঙ্গে মিশে থাকবে নব্বই মিনিটের লড়াইয়ে।

