ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল শেষে বিজয়ী দলের অধিনায়কের হাতে যে ঝলমলে সোনালি ট্রফি দেখা যায়, সেটিই আসল ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফি। কোটি কোটি দর্শকের সামনে সেই মুহূর্ত বিশ্বজয়ের প্রতীক হয়ে উঠলেও বাস্তবতা হলো—চ্যাম্পিয়ন দল ট্রফিটি স্থায়ীভাবে নিজেদের কাছে রাখতে পারে না।
উদযাপন শেষ হওয়ার কিছু সময়ের মধ্যেই আসল ট্রফি আবার ফিফার কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এর পরিবর্তে বিজয়ী দেশের ফুটবল ফেডারেশনকে দেওয়া হয় সোনার প্রলেপযুক্ত পিতলের একটি অবিকল প্রতিরূপ। এর আনুষ্ঠানিক নাম ‘ফিফা ওয়ার্ল্ড কাপ উইনার্স ট্রফি’। স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের জন্য এই রেপ্লিকাটিই সংশ্লিষ্ট দেশের কাছে থাকে।
বর্তমানে ব্যবহৃত ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিটির উচ্চতা ৩৬ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ দশমিক ১৭৫ কেজি। এটি ১৮ ক্যারেটের নিরেট সোনা দিয়ে তৈরি। ট্রফির নিচের অংশে রয়েছে মূল্যবান ম্যালাকাইট পাথরের দুটি বলয়। দুই মানব অবয়বের মাথার ওপর পৃথিবীর গোলক তুলে ধরার অনন্য নকশাটি তৈরি করেছিলেন ইতালীয় ভাস্কর সিলভিও গাজানিগা। ১৯৭৪ সালের বিশ্বকাপ থেকে এই ট্রফিই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
ফিফা মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, চ্যাম্পিয়ন দলকে দেওয়া স্থায়ী রেপ্লিকা ট্রফিটি পিতল দিয়ে তৈরি হলেও এর ওপর সোনার প্রলেপ দেওয়া হয়। দেখতে প্রায় আসল ট্রফির মতো হলেও এটি মূল ট্রফি নয়। আসল ট্রফি স্থায়ীভাবে না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে বিশ্বকাপের প্রথম ট্রফি জুলে রিমে কাপ-এর ইতিহাস।
তৎকালীন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিততে পারলে জুলে রিমে ট্রফির স্থায়ী মালিক হওয়ার সুযোগ পেত। সেই নিয়মে ১৯৫৮, ১৯৬২ ও ১৯৭০ সালে বিশ্বকাপ জিতে প্রথম দেশ হিসেবে ব্রাজিল ট্রফিটির স্থায়ী মালিকানা অর্জন করে।
কিন্তু সেই গৌরব বেশিদিন টেকেনি। ১৯৮৩ সালের ১৯ ডিসেম্বর রিও ডি জেনিরোয় ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে জুলে রিমে ট্রফিটি চুরি হয়ে যায়। নিরাপত্তাব্যবস্থা ভেঙে দুর্বৃত্তরা ট্রফিটি নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে ব্যাপক তদন্ত চালানো হয় এবং কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তবে বহু চেষ্টা সত্ত্বেও ট্রফিটি আর উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেকের ধারণা ছিল, সোনার মূল্য পাওয়ার উদ্দেশ্যে ট্রফিটি গলিয়ে ফেলা হয়েছিল। ফিফাও জানিয়েছে, ট্রফিটি গলিয়ে ধ্বংস করা হয়েছে—এমন ধারণাই সবচেয়ে বেশি প্রচলিত। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো চূড়ান্ত ও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে জুলে রিমে ট্রফির প্রকৃত পরিণতি আজও রহস্যে ঢাকা।
এই অভিজ্ঞতার পরই বিশ্বকাপ ট্রফি সংরক্ষণের নীতিতে পরিবর্তন আনা হয়। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো দেশ যতবারই বিশ্বকাপ জিতুক না কেন, আসল ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফির স্থায়ী মালিক হতে পারে না।
অর্থাৎ, বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর কয়েক মিনিটের জন্য আসল ট্রফি হাতে তুলে ধরার সম্মানই বিজয়ী দলের সর্বোচ্চ প্রাপ্তি। এরপর ট্রফিটি আবার ফিফার কঠোর নিরাপত্তায় সংরক্ষিত হয়, আর চ্যাম্পিয়ন দেশের সংগ্রহশালায় স্থান পায় তার আনুষ্ঠানিক রেপ্লিকা।

