ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই শুধু মাঠের লড়াই নয়, এটি একই সঙ্গে বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনৈতিক আয়োজন। কোটি কোটি দর্শকের আবেগকে ঘিরে তৈরি হয় বিশাল বাণিজ্যিক বাজার। এবারের বিশ্বকাপে দল বেড়েছে, ম্যাচের সংখ্যাও বেড়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে দর্শকের আগ্রহ, সম্প্রচারমূল্য এবং স্পনসরদের বিনিয়োগ।
তবে এই অর্থনৈতিক উৎসবের সুফল সবার ঘরে সমানভাবে পৌঁছায়নি। একদিকে ফিফা, সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো বিপুল আয়ের সুযোগ পেয়েছে, অন্যদিকে মাঠে গিয়ে খেলা দেখা অনেক সমর্থকের জন্য বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে ব্যয়বহুল অভিজ্ঞতা।
ফিফার আয়েই সবচেয়ে বড় উল্লম্ফন:
বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার জন্য বিশ্বকাপ দীর্ঘদিন ধরেই সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ থেকে ফিফার আয় হয়েছিল প্রায় ৭৬০ কোটি ডলার। এবার যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত ৪৮ দলের বিশ্বকাপ সেই রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে।
ডয়চে ব্যাংকের গবেষণা বিভাগের জ্যেষ্ঠ কৌশলবিদ ম্যারিয়ন লাবোরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চার বছরের ব্যবধানে ফিফার মোট আয় প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। অর্থনৈতিক দৃষ্টিতে এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ফিফাকেই দেখছেন তিনি।
ফিফার আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে সম্প্রচারস্বত্ব, বাণিজ্যিক অংশীদারিত্ব, লাইসেন্সিং, আতিথেয়তা সেবা এবং টিকিট বিক্রি। এর পাশাপাশি এবার টিকিট পুনর্বিক্রয়ের জন্য আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থা চালু করে নতুন আয়ের পথ তৈরি করেছে সংস্থাটি। পুনর্বিক্রয় হওয়া টিকিট থেকে ক্রেতা ও বিক্রেতা—দুই পক্ষের কাছ থেকেই কমিশন নিয়েছে ফিফা।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা আরও বাড়াতে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় নিতে পারে ফিফা। বিশেষ করে চীন ও ভারতের মতো বড় বাজার যুক্ত হলে দর্শকসংখ্যা ও আয়—দুই ক্ষেত্রেই নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বকাপ দেখতে গিয়ে বাড়ছে সমর্থকদের খরচ:
বিশ্বকাপের মাঠে বসে প্রিয় দলের খেলা দেখা অনেক ফুটবলপ্রেমীর জীবনের অন্যতম স্বপ্ন। কিন্তু এবারের আসরে সেই স্বপ্ন পূরণ করতে অনেক সমর্থককে গুনতে হয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ।
টিকিটের দাম নিয়ে শুরু থেকেই আলোচনা ছিল। শুধু মূল টিকিট নয়, চাহিদার ওপর ভিত্তি করে দাম বাড়ানোর নীতিও সমালোচনার মুখে পড়ে। পুনর্বিক্রয় বাজারে অনেক টিকিটের দাম সাধারণ দর্শকের নাগালের বাইরে চলে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ফাইনালের সর্বোচ্চ আনুষ্ঠানিক টিকিট মূল্য ছিল প্রায় ৩২ হাজার ৯৭০ ডলার। আর পুনর্বিক্রয়ের বাজারে কিছু টিকিটের দাম কয়েক মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। টিকিটের বাইরে বিদেশি সমর্থকদের জন্য বিমানভাড়া, আবাসন, খাবার ও স্থানীয় যাতায়াত খরচও বড় চাপ তৈরি করেছে।
বিশেষ করে নিউ জার্সি ট্রানজিটের ভাড়া বৃদ্ধি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়। বিশ্বকাপের সময় মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যাতায়াতের ভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বাড়ানো হয়েছিল। সমালোচনার পর তা কমানো হলেও দর্শকদের অতিরিক্ত খরচের বিষয়টি সামনে আসে।

