২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের শেষ বাঁশি বাজতেই দুই ভিন্ন ছবি ফুটে ওঠে। একদিকে স্পেনের কিশোর তারকা লামিন ইয়ামালের উচ্ছ্বাস, অন্যদিকে লিওনেল মেসির নিস্তব্ধ, বিষণ্ন মুখ। নিউইয়র্ক–নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থক যখন তার নাম ধরে গান গাইছিলেন, তখন মেসি দীর্ঘক্ষণ গ্যালারির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। অনেকের কাছেই সেই দৃশ্য মনে করিয়ে দিয়েছে—হয়তো বিশ্বকাপ মঞ্চে এটাই ছিল তার শেষ উপস্থিতি।
ফাইনালের পর আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনিও আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পাশাপাশি মেসির আন্তর্জাতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মেসির সঙ্গে তার কোনো কথা হয়নি। কথা বলতে বলতেই আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি সম্মেলন ছেড়ে বেরিয়ে যান।
৩৯ বছর বয়সেও মেসি প্রমাণ করেছেন, বয়স তার প্রতিভাকে থামাতে পারেনি। বরং সময়ের সঙ্গে নিজের খেলাকে বদলে নিয়ে তিনি নতুন ভূমিকায়ও সমান কার্যকর থেকেছেন। ১৬ বছর বয়সে বার্সেলোনার জার্সিতে অভিষেকের পর একাধিকবার নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তুলেছেন তিনি। বর্তমান আর্জেন্টিনা ও ইন্টার মায়ামির মেসি সেই দীর্ঘ অভিযোজনেরই ফল।
পুরো টুর্নামেন্টে নিজের জাদুকরী নৈপুণ্যে সমর্থকদের মুগ্ধ করলেও ফাইনালে যেন সেই মেসিকে দেখা যায়নি। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এর বড় কারণ ছিল আর্জেন্টিনার ম্যাচ পরিকল্পনা। দলের কৌশল এমন ছিল যে, মেসি দীর্ঘ সময় কার্যত খেলার বাইরে চলে যান। ফলে নিজের সৃজনশীলতা দেখানোর সুযোগই পাননি তিনি।
ভুল কৌশলে হারিয়ে গেল মেসির প্রভাব
ম্যাচের শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা আক্রমণাত্মক ও শারীরিক লড়াইয়ের পথ বেছে নেয়। কিন্তু সেই কৌশল স্পেনের বিপক্ষে কার্যকর হওয়ার বদলে উল্টো দলের সবচেয়ে বড় অস্ত্র মেসিকেই নিষ্ক্রিয় করে দেয়। বলের দখল, আক্রমণ গঠন কিংবা সুযোগ তৈরির বদলে দলটির মনোযোগ যেন শারীরিক লড়াই ও প্রতিপক্ষকে থামানোর দিকেই বেশি ছিল।
অনেকের মতে, স্পেনের জয় শুধু একটি দলের জয় নয়, এটি ছিল ইতিবাচক ফুটবলেরও জয়।
রেফারিং নিয়ে বিতর্ক
ম্যাচের শুরু থেকেই স্লোভেনিয়ার রেফারি স্লাভকো ভিনসিকের সিদ্ধান্ত নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। দানি ওলমোর ওপর আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের কঠোর ফাউলের পরও কেবল মৌখিক সতর্কতায় ছেড়ে দেওয়া হলে স্পেন সমর্থকদের ক্ষোভ বাড়ে।
গ্যালারি থেকে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর নাম ধরে ব্যঙ্গাত্মক স্লোগানও শোনা যায়। টুর্নামেন্টজুড়ে আর্জেন্টিনা সুবিধা পেয়েছে—এমন অভিযোগের প্রতিফলন হিসেবেই অনেকে এই প্রতিক্রিয়াকে দেখেছেন।
আগ্রাসী ফুটবলে হারিয়ে যায় আর্জেন্টিনা
প্রথম হলুদ কার্ড দেখাতে রেফারির সময় লাগে ৪০ মিনিট। লিসান্দ্রো মার্তিনেস মিকেল ওয়ারসাবালকে ফাউল করার পর সেই কার্ড দেখেন। এর আগে একাধিক কঠিন ট্যাকল হলেও খেলা চলতে থাকে।
আর্জেন্টিনা সেমিফাইনালে যে নান্দনিক ফুটবল খেলেছিল, ফাইনালে তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায়নি। বরং অযথা আগ্রাসী আচরণই ম্যাচজুড়ে চোখে পড়ে।
মেসিও এক পর্যায়ে আবেগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি। স্পেনের মার্ক কুকুরেয়া মুখের সামনে হাত তুলে কথা বলায় তাকে লাল কার্ড দেখানোর ইঙ্গিত দেন রেফারিকে।
অতিরিক্ত সময়ে যাওয়ার ঠিক আগে এনজো ফার্নান্দেজ বলের দিকে নজর না দিয়ে পাও কুবারসির ওপর চড়াও হন। দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। সেই মুহূর্তে আর্জেন্টিনার ম্যাচে ফেরার সম্ভাবনাও অনেকটাই শেষ হয়ে যায়।
ইতিহাসে প্রথমবার ৯০ মিনিটে শটহীন আর্জেন্টিনা
এই ফাইনালে আর্জেন্টিনা এমন একটি রেকর্ড গড়েছে, যা তারা নিশ্চয়ই ভুলে যেতে চাইবে। বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথমবার কোনো দল নির্ধারিত ৯০ মিনিটে একটিও শট নিতে পারেনি।
ম্যাচের ১১৭তম মিনিটে প্রথমবার গোলের চেষ্টা করেন মেসি। কিন্তু তার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়।
অন্যদিকে পুরো ম্যাচে স্পেন গোলমুখে ১২টি অন-টার্গেট শট নেয়, যেখানে আর্জেন্টিনার সংখ্যা ছিল শূন্য।
প্রথমার্ধেই আর্জেন্টিনা প্রতিপক্ষের বক্সের আশপাশে যত পাস খেলেছিল, তার চেয়ে বেশি ফাউল করেছিল। শেষ তৃতীয়াংশে তাদের পাস ছিল মাত্র আটটি, অথচ ফাউল ছিল নয়টি—যা তাদের ম্যাচ পরিকল্পনার চিত্র স্পষ্ট করে।
শেষ বাঁশির পরও উত্তেজনা
ম্যাচ শেষে মেসিকে ঘিরে সতীর্থদের কান্নার দৃশ্য যেমন আবেগ ছড়ায়, তেমনি কিছুক্ষণের মধ্যেই দুই দলের খেলোয়াড় ও কর্মকর্তাদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
বদলি হিসেবে নামা লেয়ান্দ্রো পারেদেস প্রথমে এরিক গার্সিয়ার গলা চেপে ধরেন। পরে গাভিকে মাটিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনাতেও তাকে জড়িত দেখা যায়।
এক যুগের অবসানের ইঙ্গিত?
এটি ছিল বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির ৩৪তম ম্যাচ। বয়স ও সময় বিবেচনায় অনেকেই মনে করছেন, এটাই হয়তো বিশ্বকাপে তার শেষ উপস্থিতি।
যদিও ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কিছু বলেননি মেসি, তবু ফুটবলবিশ্বের কাছে তিনি ইতোমধ্যেই সর্বকালের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজের জায়গা নিশ্চিত করেছেন।
ফাইনালের ফলাফল তার ক্যারিয়ারের মহিমা কমাতে পারবে না। তবে অনেক সমর্থকের বিশ্বাস, এমন এক বিদায়ী মঞ্চে আর্জেন্টিনা যদি নিজেদের স্বাভাবিক ফুটবল খেলত, তাহলে হয়তো মেসির শেষ বিশ্বকাপের গল্পটি অন্যরকমও হতে পারত।

