দুই দশকের বেশি সময় ধরে যে আকাশি-সাদা জার্সি তার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ, সেই জার্সিতেই আজ শেষবারের মতো মাঠে নামছেন লিওনেল মেসি। আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে শেষ ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে সমর্থকদের উদ্দেশে আবেগঘন বার্তা দিয়েছেন দেশটির ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই তারকা।
বুধবার বুয়েনস আয়ার্সের মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে বেনিনের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচ খেলবে আর্জেন্টিনা। ম্যাচটি তাই কেবল আরেকটি আন্তর্জাতিক প্রীতি ম্যাচ নয়; আর্জেন্টিনা ফুটবলের দীর্ঘ ও গৌরবময় এক অধ্যায়ের আবেগঘন সমাপ্তি হিসেবেই দেখছেন সমর্থকেরা।
ম্যাচের আগে প্রকাশ করা এক ভিডিও বার্তায় মেসি বলেন, ‘সময়টা এসে গেছে। এই জার্সি ছিল আমার স্বপ্ন, আমার গর্ব এবং আমার জীবন। আমাকে এতটা ভালোবাসার জন্য ধন্যবাদ। তোমাদের খুব মিস করব।’
বিদায়ের মুহূর্তে মেসির কথায় অবশ্য কোনো আক্ষেপের সুর নেই। বরং দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়ে তৃপ্তির কথাই জানিয়েছেন তিনি। তার ভাষায়, ‘আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি, কারণ আমি সবটুকু দিয়ে গেছি।’
আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের জার্সিতে মেসির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২১ বছর আগে। সেই পথ সবসময় মসৃণ ছিল না। একসময় জাতীয় দলের হয়ে প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারার অভিযোগে তাকে তীব্র সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়েছে। হতাশা, ব্যর্থতা এবং একাধিক ফাইনালে হারের পর তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়েও তৈরি হয়েছিল নানা প্রশ্ন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গল্প বদলে যায়। মেসির নেতৃত্বেই আর্জেন্টিনা দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে বড় আন্তর্জাতিক সাফল্য পায়। বিশেষ করে বহু প্রতীক্ষিত বিশ্বকাপ জয়ের পর জাতীয় দলের হয়ে তার ক্যারিয়ার পূর্ণতার নতুন মাত্রা পায়।
জাতীয় দলের হয়ে এখন পর্যন্ত ২০৭ ম্যাচ খেলেছেন মেসি। এই সময়ে তার গোলসংখ্যা ১২৫ এবং অ্যাসিস্ট ৬৬টি। আর্জেন্টিনার ইতিহাসে তিনিই সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলা, সর্বোচ্চ গোল এবং সর্বোচ্চ অ্যাসিস্ট করা ফুটবলার।
এই পরিসংখ্যানের পাশাপাশি আর্জেন্টিনার হয়ে তার দীর্ঘ পথচলার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য স্মৃতি। হতাশার রাত যেমন আছে, তেমনি আছে শিরোপা জয়ের উচ্ছ্বাসও। ফলে মেসির বিদায়কে শুধু একজন ফুটবলারের জাতীয় দল ছাড়ার ঘটনা হিসেবে দেখছেন না সমর্থকেরা।
মনুমেন্টাল স্টেডিয়ামে শেষ ম্যাচ ঘিরে তাই তৈরি হয়েছে বিশেষ আবহ। গ্যালারিতে থাকবে উৎসব, আবেগ ও অশ্রু। যে মাঠে এত বছর আর্জেন্টিনার হয়ে নিজের সামর্থ্য দেখিয়েছেন মেসি, সেখানেই শেষবারের মতো আকাশি-সাদা জার্সি পরে দাঁড়াবেন তিনি।
আর্জেন্টিনার সমর্থকদের কাছে এই মুহূর্তটি আরও বিশেষ হয়ে উঠেছে মেসির নিজের কথায়। দুই দশকের বেশি সময় ধরে দেশের প্রতিনিধিত্ব করার পর তিনি যখন বলছেন, ‘আমি শান্তিতে বিদায় নিচ্ছি’, তখন তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অর্জনটিও যেন সেই কথার মধ্যে প্রতিফলিত হচ্ছে।
শেষবারের মতো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে মাঠে নামার অপেক্ষায় থাকা মেসির জন্য আজকের রাত তাই একটি ম্যাচের চেয়েও বেশি কিছু। এটি আর্জেন্টিনার হয়ে তার দীর্ঘ পথচলার শেষ অধ্যায়—যেখানে মাঠের ৯০ মিনিটের চেয়েও বড় হয়ে উঠবে স্মৃতি, ভালোবাসা আর বিদায়ের আবেগ।
আর ম্যাচ শেষ হওয়ার পর আকাশি-সাদা জার্সিতে মেসিকে আর দেখা যাবে না জাতীয় দলের হয়ে। থেকে যাবে তার গোল, রেকর্ড, শিরোপা এবং দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনা ফুটবলের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা অসংখ্য স্মৃতি।

