বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটে নতুন এক ইতিহাসের জন্ম হয়েছে। দীর্ঘ অপেক্ষার পর অবশেষে টেস্ট ফরম্যাটে কোনো বাংলাদেশি পেসারের হাত ধরে এসেছে হ্যাটট্রিকের বিরল কীর্তি। আবুধাবিতে আফগানিস্তানের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টের তৃতীয় দিনের সকালে দুর্দান্ত বোলিং করে এই রেকর্ড গড়েছেন পেসার হাসান মাহমুদ।
এর আগে বাংলাদেশের হয়ে টেস্টে হ্যাটট্রিকের কীর্তি ছিল মাত্র দুইজন বোলারের। ২০০৩ সালে অলক কাপালি এবং ২০১৩ সালে সোহাগ গাজী এই বিশেষ অর্জনের মালিক হয়েছিলেন। তবে দুজনই ছিলেন স্পিনার। এবার হাসানের হাত ধরে প্রথমবারের মতো কোনো পেসার টেস্টে হ্যাটট্রিকের স্বাদ পেলেন।
ম্যাচের পরিস্থিতিও ছিল নাটকীয়। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ৩৪৬ রানে অলআউট হওয়ার পর আফগানিস্তান বেশ শক্ত অবস্থানে ছিল। দ্বিতীয় দিনের খেলা শেষে তাদের সংগ্রহ ছিল ৪ উইকেটে ২১১ রান। ব্যাটিংয়ে নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে তারা বাংলাদেশের ওপর চাপ তৈরি করেছিল।
কিন্তু তৃতীয় দিনের সকালেই বদলে যায় পুরো ম্যাচের চিত্র। বাংলাদেশের পেস আক্রমণ আফগান ব্যাটিং লাইনআপে ভয়াবহ ধস নামায়। বিশেষ করে এবাদত হোসেন ও হাসান মাহমুদের ধারালো বোলিংয়ে মাত্র ১ রানের ব্যবধানে চারটি উইকেট হারিয়ে বিপাকে পড়ে আফগানিস্তান।
দিনের শুরুতেই এবাদত হোসেন আঘাত হানেন। ৩২ রান করা ইকরাম আলি খিলকে দুর্দান্ত ইন-সুইঙ্গারে বোল্ড করে তিনি আফগান প্রতিরোধ ভেঙে দেন। এরপর বল হাতে দায়িত্ব নেন হাসান মাহমুদ।
হাসানের করা পরের ওভারের প্রথম বলেই ইসমত আলমকে সাজঘরে ফেরান তিনি। নিখুঁত লাইন ও সুইংয়ে অফস্টাম্প উড়িয়ে দেন এই পেসার। এরপর ক্রিজে আসা নতুন ব্যাটার কায়েস আহমেদকে দ্বিতীয় বলেই পরাস্ত করেন। সুইং করা বলটি ব্যাটের কিনারা ছুঁয়ে চলে যায় উইকেটরক্ষক লিটন দাসের গ্লাভসে।
দুই বলে দুই উইকেট পাওয়ার পর সামনে আসে ইতিহাসের মুহূর্ত। হ্যাটট্রিক বল মোকাবিলা করতে আসেন জিয়াউর রহমান। হাসানের করা বল ব্যাটের পাশ দিয়ে লিটনের হাতে জমা হলে বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা ক্যাচের আবেদন করেন। তবে মাঠের আম্পায়ার প্রথমে সেই আবেদন গ্রহণ করেননি।
অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে রিভিউ নেন। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দেখা যায়, বল ব্যাটে স্পর্শ না করলেও সরাসরি অফস্টাম্পে আঘাত করত। ফলে আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে দেওয়া হয় এলবিডব্লিউ আউট।
সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ে বাংলাদেশ দল। তিন বলে তিন উইকেট নিয়ে হাসান মাহমুদ শুধু ব্যক্তিগত মাইলফলকই অর্জন করেননি, বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসেও যোগ করেছেন এক নতুন অধ্যায়।
এই হ্যাটট্রিকের মাধ্যমে হাসান প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশের পেস বোলিংয়ের উন্নতির ধারাও। একসময় টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের মূল শক্তি ছিল স্পিন আক্রমণ। তবে সাম্প্রতিক সময়ে পেসাররা আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজেদের সক্ষমতা দেখাচ্ছেন। হাসানের এই অর্জন সেই পরিবর্তনেরই আরেকটি বড় উদাহরণ।
হাসানের দুর্দান্ত বোলিংয়ে ম্যাচে আবারও নিয়ন্ত্রণ ফিরে পায় বাংলাদেশ। আফগানিস্তান বড় চাপে পড়ে যায়। সর্বশেষ খবর অনুযায়ী, তারা ৮ উইকেটে ২২১ রান নিয়ে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। দলের হয়ে রহমত শাহ ৮৭ রানে অপরাজিত ছিলেন এবং সেঞ্চুরির অপেক্ষায় ছিলেন।
আবুধাবির এই ম্যাচে হাসান মাহমুদের হ্যাটট্রিক শুধু একটি ব্যক্তিগত সাফল্য নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রিকেটের জন্য একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত। টেস্ট ক্রিকেটে দেশের পেস বোলিংয়ের নতুন সম্ভাবনার বার্তাও দিয়ে গেল এই অসাধারণ পারফরম্যান্স।

