আবুধাবি টেস্টে বাংলাদেশের হয়ে একদিকে যেমন নতুন রেকর্ডের অংশীদার হলেন লিটন দাস, অন্যদিকে তেমনি দলকে এনে দিলেন শক্ত অবস্থান। দীর্ঘদিনের চাপ, সমালোচনা এবং ব্যর্থতার পর লিটনের ব্যাট থেকে এলো গুরুত্বপূর্ণ এক শতক। তার এই ইনিংস শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, দলের প্রয়োজনের মুহূর্তে দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়েরও একটি বড় উদাহরণ হয়ে থাকল।
আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবি টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে শতক তুলে নিয়ে বাংলাদেশের উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে সবচেয়ে বেশি টেস্ট শতকের রেকর্ডে মুশফিকুর রহিমের পাশে বসেছেন লিটন দাস। দুজনেরই এখন উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে টেস্টে শতকের সংখ্যা তিনটি।
মধ্যাহ্ন বিরতির পর ৮১ রান নিয়ে আবার ব্যাটিংয়ে নামেন লিটন। ধৈর্য ধরে এগিয়ে গিয়ে কায়েস আহমেদের বলে চার মেরে পূর্ণ করেন নিজের সপ্তম টেস্ট শতক। মাত্র ১১৫ বলে মাইলফলকে পৌঁছান তিনি।
শতক পাওয়ার পর অবশ্য বেশিক্ষণ ক্রিজে থাকতে পারেননি লিটন। তার বিদায়ের পরপরই বাংলাদেশের অধিনায়ক ইনিংস ঘোষণা করেন। দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৩৭২ রান ৭ উইকেট হারিয়ে। ফলে আফগানিস্তানের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় বিশাল ৪৭৯ রান।
এই ইনিংসে লিটনের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মেহেদী হাসান মিরাজ। সপ্তম উইকেটে দুজন মিলে যোগ করেন ১৪৯ রান। মিরাজ অপরাজিত থাকেন ৫২ রানে। টেস্ট ক্রিকেটে সপ্তম উইকেট বা তার নিচে ব্যাটিং করা জুটিগুলোর মধ্যে এটি শতরানের তৃতীয় যৌথ সর্বোচ্চ জুটি।
লিটনের এই শতক এসেছে এমন এক সময়ে, যখন তাকে নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল অনেক। অস্ট্রেলিয়া সফর তার জন্য ছিল হতাশাজনক। সেই সফরে ব্যাট হাতে বড় ব্যর্থতার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাকে। শীর্ষ ছয়ে ব্যাটিং করে অন্তত তিন ইনিংস খেলা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে কোনো রান না করে সিরিজ শেষ করা ইতিহাসের ষষ্ঠ ব্যাটসম্যান হন তিনি। বাংলাদেশের হয়ে এমন ঘটনা ছিল প্রথমবার।
এর আগে সিলেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে দুই টেস্ট আগে লিটন একটি শতক ও একটি অর্ধশতক করেছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া সফরের ব্যর্থতা তার আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিয়েছিল। পাশাপাশি এশিয়ান গেমসে টি-টোয়েন্টি দলের অধিনায়ক হিসেবেও প্রত্যাশিত সাফল্য পাননি তিনি। ফলে মাঠের বাইরের আলোচনা এবং সমালোচনার চাপও ছিল তার ওপর।
তবে আবুধাবির ব্যাটিং সহায়ক উইকেট যেন লিটনের জন্য নতুন সুযোগ নিয়ে আসে। দলের কঠিন সময়ে ব্যাটিংয়ে নেমে তিনি প্রথমে মিরাজের সঙ্গে ছোট ছোট জুটি গড়ে ইনিংসকে স্থিতিশীল করেন। এরপর নিজের ছন্দ ফিরে পেয়ে তুলে নেন অর্ধশতক এবং শেষ পর্যন্ত রূপ দেন শতকে।
এই ইনিংস অবশ্য পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত ছিল না। ভাগ্যও ছিল লিটনের সঙ্গে। ১৪ ও ২৬ রানে জীবন পান তিনি। ৪৬ রানে একটি রানআউটের সুযোগ থেকেও বেঁচে যান। এরপর ৬৭ রানে ক্যাচের আবেদন থেকেও রক্ষা পান, কারণ তখন আফগানিস্তান তাদের সব পর্যালোচনার সুযোগ ব্যবহার করে ফেলেছিল।
কিন্তু সুযোগ পাওয়া ইনিংসকে বড় করার কাজটি করেছেন লিটন নিজেই। চাপের মুহূর্তে নিজের স্বাভাবিক ব্যাটিং ধরে রেখে তিনি দেখিয়েছেন, অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো কঠিন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা।
লিটনের এই শতক শুধু একটি ব্যক্তিগত মাইলফলক নয়, বাংলাদেশের ব্যাটিং গভীরতারও প্রমাণ। মুশফিকুর রহিমের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারের পাশে একই রেকর্ডে নাম লেখানো লিটনের জন্য বিশেষ অর্জন। একই সঙ্গে দলের জন্যও এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তার ইনিংসের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ আফগানিস্তানের সামনে বড় লক্ষ্য ছুড়ে দিতে পেরেছে।
এখন আফগানিস্তানের সামনে চ্যালেঞ্জ ৪৭৯ রান। আবুধাবির কন্ডিশনে এই লক্ষ্য তাড়া করা সহজ হবে না। বাংলাদেশের বোলাররা যদি শুরুতেই চাপ তৈরি করতে পারেন, তাহলে এই ম্যাচে বড় জয় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। অন্যদিকে আফগানিস্তানকে ইতিহাস গড়তে হলে ব্যাট হাতে অসাধারণ দৃঢ়তা দেখাতে হবে।
লিটনের শতকের দিনটি তাই বাংলাদেশের জন্য শুধু একটি ভালো ইনিংসের স্মৃতি নয়, বরং কঠিন সময় পেরিয়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যানের আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ার গল্পও হয়ে থাকবে।

