স্প্যানিশ ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত দ্বৈরথে আবারও মুখোমুখি হচ্ছে বার্সেলোনা ও রিয়াল মাদ্রিদ। রবিবার, ২৫ অক্টোবর, বার্সেলোনার মাঠে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই ম্যাচে একদিকে শিরোপার দৌড়ে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগ, অন্যদিকে সেই ব্যবধান কমিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নতুন উত্তেজনা ফেরানোর চ্যালেঞ্জ। দুই দলের লড়াইটি শুধু তিন পয়েন্টের নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মর্যাদা, আত্মবিশ্বাস এবং সমর্থকদের কাছে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের প্রশ্ন।
মৌসুমের শুরু থেকেই দুর্দান্ত ছন্দে রয়েছে হান্সি ফ্লিকের বার্সেলোনা। স্প্যানিশ লিগে প্রথম নয়টি ম্যাচেই জয় পেয়েছে দলটি। অন্যদিকে, হোসে মরিনহোর অধীনে রিয়াল মাদ্রিদ সাম্প্রতিক চার ম্যাচে টানা জয় তুলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত দিয়েছে।
তবে দুই দলের সর্বশেষ ইউরোপীয় ম্যাচের ফলাফল তাদের প্রস্তুতির ছবিতে ভিন্নতা এনেছে। মঙ্গলবার চ্যাম্পিয়নস লিগে প্যারিস সাঁ-জার্মেইনের কাছে ৪-২ গোলে হেরে মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে প্রথম পরাজয়ের মুখ দেখেছে বার্সেলোনা। বিপরীতে, বুধবার আরবি লাইপজিগকে বড় ব্যবধানে হারিয়ে আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে রিয়াল।
আল জাজিরার ২৪ অক্টোবরের ম্যাচ-পূর্ব বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বার্সেলোনা জিতলে দুই দলের পয়েন্টের ব্যবধান নয় পয়েন্টে পৌঁছাতে পারে। আর রিয়াল জয় পেলে ব্যবধান কমে তিন পয়েন্টে নেমে আসবে। ফলে এই ম্যাচের ফল শিরোপার লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
মরিনহোর প্রত্যাবর্তন ঘিরে বাড়তি আগ্রহ
এবারের এল ক্লাসিকোর অন্যতম আকর্ষণ রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হোসে মরিনহো। ৬৩ বছর বয়সী এই পর্তুগিজ কোচ এর আগে রিয়ালের দায়িত্বে থেকে বার্সেলোনার বিপক্ষে ১৭টি এল ক্লাসিকোতে ডাগআউটে ছিলেন। এবার তাঁর সামনে ১৮তম ম্যাচে দলকে জেতানোর চ্যালেঞ্জ।
২০১০ সালে রিয়ালের তৎকালীন সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ মরিনহোকে কোচ হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন। তখন পেপ গার্দিওলার বার্সেলোনার আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলাই ছিল রিয়ালের বড় লক্ষ্য।
মরিনহোর প্রথম মেয়াদে দুই দলের দ্বৈরথ আধুনিক ফুটবলের অন্যতম উত্তেজনাপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়েছিল। বার্সেলোনার বিপক্ষে প্রথম ১০টি এল ক্লাসিকোর মধ্যে মাত্র একটিতে জিতেছিলেন তিনি। তবে শেষ পাঁচ ম্যাচে অপরাজিত থেকে তিনটি জয় তুলে নেন।
এবারের পরিস্থিতি অবশ্য আলাদা। বার্সেলোনা ইতিমধ্যে নিজেদের খেলার ধরন ও দলীয় সমন্বয়ে ধারাবাহিকতা দেখিয়েছে। অন্যদিকে, মরিনহোকে নতুন করে দল সাজাতে হচ্ছে।
রিয়ালের কোচও মনে করেন, তাঁর দলকে এখনই বার্সেলোনার সঙ্গে একই পর্যায়ে বিচার করা ঠিক হবে না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দলটির সঙ্গে কাজ করার সময় এখনো খুব বেশি হয়নি। খেলোয়াড়েরা তাঁর কৌশল বুঝছেন, আর তিনিও খেলোয়াড়দের সক্ষমতা বিশ্লেষণ করে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণ করছেন।
মরিনহোর মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ দল গড়ে ওঠার প্রক্রিয়া এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। তাই এই ম্যাচ তাঁর দলের অগ্রগতি যাচাইয়ের বড় পরীক্ষা হলেও, ফলাফল দিয়ে পুরো প্রকল্পের মূল্যায়ন করা উচিত হবে না।
বার্সেলোনার আত্মবিশ্বাসে ধাক্কা, তবে ঘরের মাঠে বড় সুযোগ
বার্সেলোনা স্প্যানিশ লিগে প্রথম নয়টি ম্যাচেই জয় পেয়েছে। ২৭ পয়েন্ট নিয়ে দলটি শীর্ষে রয়েছে এবং দ্বিতীয় স্থানে থাকা দলের সঙ্গে ব্যবধানও ধরে রেখেছে।
তবে পিএসজির কাছে ৪-২ গোলের পরাজয় কিছু দুর্বলতা সামনে এনেছে। কোচ ফ্লিকের মতে, ম্যাচে ভালো দিক থাকলেও কয়েকটি পরিস্থিতিতে দলকে আরও উন্নতি করতে হবে।
তিনি জানিয়েছেন, খেলোয়াড়দের সঙ্গে ওই ম্যাচ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলাকে নিজেদের উন্নতির সুযোগ হিসেবেই দেখছেন তিনি।
ফ্লিকের কাছে এল ক্লাসিকো শুধু লিগের তিন পয়েন্টের লড়াই নয়। তাঁর মতে, এই ম্যাচের গুরুত্ব মাঠের ফলাফলের বাইরেও বিস্তৃত, কারণ বিশ্বের অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী এই দ্বৈরথের দিকে তাকিয়ে থাকেন।
বার্সেলোনার জন্য বড় সুবিধা হতে পারে নিজেদের মাঠে খেলা। তবে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ের অনুপস্থিতি দলটির কৌশল নির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
চার জয়ের ধারায় রিয়াল মাদ্রিদ
রিয়াল মাদ্রিদ লিগে এখন পর্যন্ত সাতটি ম্যাচ জিতেছে। তবে আতলেতিকো মাদ্রিদ ও রিয়াল বেতিসের কাছে হেরে পয়েন্ট হারিয়েছে দলটি। ফলে বার্সেলোনার সঙ্গে ব্যবধান ছয় পয়েন্টে পৌঁছেছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে রিয়ালের পারফরম্যান্সে উন্নতি দেখা যাচ্ছে। টানা চার ম্যাচে জয়ের পাশাপাশি আক্রমণভাগের খেলোয়াড়েরাও গোল পাচ্ছেন। চ্যাম্পিয়নস লিগে আরবি লাইপজিগকে হারানো দলটির আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়েছে।
মরিনহো বলেছেন, এল ক্লাসিকো অন্য ম্যাচের মতো নয়। আগের ম্যাচে কী হয়েছে, তা এই দ্বৈরথে খুব বেশি প্রভাব ফেলে না। তাঁর লক্ষ্য ভালো ফুটবল খেলে জয় তুলে নেওয়া।
রিয়ালের জন্য এই ম্যাচে জয় শুধু পয়েন্টের ব্যবধান কমাবে না; সাম্প্রতিক এল ক্লাসিকোগুলোতে বার্সেলোনার আধিপত্যের বিপরীতে নিজেদের অবস্থানও শক্ত করার সুযোগ তৈরি করবে।
দুই দলের মুখোমুখি পরিসংখ্যান
প্রকাশিত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই দলের মধ্যে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে মোট ২৬৪টি ম্যাচ হয়েছে।
| পরিসংখ্যান | সংখ্যা |
|---|---|
| বার্সেলোনার জয় | ১০৬ |
| রিয়াল মাদ্রিদের জয় | ১০৭ |
| ড্র | ৫২ |
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই দলের জয়ের সংখ্যায় খুব সামান্য ব্যবধান রয়েছে। রিয়াল মাদ্রিদ এক জয়ে এগিয়ে থাকলেও সাম্প্রতিক সাতটি এল ক্লাসিকোর মধ্যে ছয়টিতে হেরেছে দলটি।
এবারের ম্যাচে সেই ধারার পরিবর্তন ঘটানো মরিনহোর জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।
ম্যাচের আগে দুই দলের খেলোয়াড় পরিস্থিতি
বার্সেলোনা
বার্সেলোনার মাঝমাঠের খেলোয়াড় দানি ওলমো উরুর চোটের কারণে প্রায় এক মাসের জন্য মাঠের বাইরে থাকবেন। এ ছাড়া জুলস কুন্দে, এরিক গার্সিয়া, আন্দ্রেয়াস ক্রিস্টেনসেন ও রুনি বার্দগির অনুপস্থিতিও দলটির জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
সম্ভাব্য একাদশে গোলরক্ষক হিসেবে জোয়ান গার্সিয়া এবং রক্ষণভাগে জাভি এসপার্ট, পাউ কুবারসি, জেরার্ড মার্তিন ও জোয়াও কানসেলোর থাকার কথা রয়েছে।
মাঝমাঠে মার্ক বার্নাল ও পেদ্রির পাশাপাশি আক্রমণভাগে লামিনে ইয়ামাল, ফেরান তোরেস, অ্যান্থনি গর্ডন ও রাফিনিয়ার নাম রয়েছে সম্ভাব্য একাদশে।
রিয়াল মাদ্রিদ
রিয়ালের জন্য বড় ধাক্কা ভিনিসিউস জুনিয়রের নিষেধাজ্ঞা। এ ছাড়া চোটের কারণে রাউল আসেনসিও ও রদ্রিগোকে পাওয়া যাবে না।
সম্ভাব্য একাদশে গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়ার পাশাপাশি রক্ষণভাগে ফেদেরিকো ভালভের্দে, আন্তোনিও রুডিগার, ডিন হুইসেন ও আলভারো কারেরাসের নাম রয়েছে।
মাঝমাঠে বের্নার্দো সিলভা ও এদুয়ার্দো কামাভিঙ্গা এবং আক্রমণভাগে আরদা গুলের, জুড বেলিংহাম, ইয়ান ডিওমান্দে ও কিলিয়ান এমবাপ্পেকে দেখা যেতে পারে।
তবে এগুলো সম্ভাব্য একাদশ; ম্যাচ শুরুর আগে দুই দলের আনুষ্ঠানিক একাদশ প্রকাশিত হলে চূড়ান্ত পরিস্থিতি পরিষ্কার হবে।
কখন ও কোথায় দেখা যাবে এল ক্লাসিকো?
|
তারিখ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, রবিবার সময়:স্পেনের স্থানীয় সময় রাত ৯টা; বাংলাদেশ সময় রাত ২টা, ২৬ অক্টোবর। মাঠ: স্পেনের বার্সেলোনায় স্পটিফাই ক্যাম্প ন্যু।
|
প্রকাশিত সম্প্রচারসূচি অনুযায়ী, স্পেনে মুভিস্টার ও দাজন, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় বিইন স্পোর্টস, ভারতে ফ্যানকোড এবং যুক্তরাজ্যে ডিজনি প্লাস ও প্রিমিয়ার স্পোর্টসের মাধ্যমে ম্যাচটি দেখার কথা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সম্প্রচারের দায়িত্বে রয়েছে ইএসপিএন ও ইএসপিএন প্লাস।
বার্সেলোনার সামনে নিজেদের আধিপত্য আরও শক্ত করার সুযোগ, আর রিয়াল মাদ্রিদের সামনে ব্যবধান কমিয়ে শিরোপার লড়াইয়ে নতুন গতি ফেরানোর চ্যালেঞ্জ। ফ্লিকের প্রতিষ্ঠিত দলীয় কাঠামোর বিপরীতে মরিনহোর নতুন পরিকল্পনা কতটা কার্যকর হয়, সেটিও ম্যাচটির অন্যতম আকর্ষণ।
বার্সেলোনার ধারাবাহিকতা, রিয়ালের সাম্প্রতিক জয়, গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের অনুপস্থিতি এবং দুই কোচের কৌশল—সবকিছু মিলিয়ে এবারের এল ক্লাসিকোতে উত্তেজনার যথেষ্ট উপাদান রয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে, তার উত্তর মিলবে মাঠের লড়াইয়েই।

