দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগিতা সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ শুরু হতে বাকি মাত্র দুই দিন। আগামী বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) ঢাকায় শুরু হচ্ছে এই আসর। কিন্তু এত বড় ফুটবল আয়োজনকে ঘিরে রাজধানীতে এখনো তেমন উৎসবের পরিবেশ দেখা যাচ্ছে না। প্রচার-প্রচারণার অভাব, অংশগ্রহণকারী দলগুলোর আগমন ও আবাসন নিয়ে অস্পষ্টতা এবং আয়োজকদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের গুরুত্ব অনেক। আঞ্চলিক ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই প্রতিযোগিতাকে ঘিরে সাধারণত দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। বিশেষ করে স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশে আয়োজন হলে রাজধানীজুড়ে ফুটবল উৎসবের আমেজ থাকার কথা। অথচ এবার প্রতিযোগিতা শুরুর একেবারে কাছাকাছি এসেও সেই পরিচিত চিত্র দেখা যাচ্ছে না।
টুর্নামেন্টে অংশ নিতে ইতোমধ্যে কয়েকটি দল ঢাকায় পৌঁছেছে। সোমবার (২ নভেম্বর) প্রথম দল হিসেবে রাজধানীতে আসে ভুটান। এরপর মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) দ্বিতীয় দল হিসেবে ঢাকায় পৌঁছায় শ্রীলঙ্কা।
একই দিন ভারত ও পাকিস্তান দলেরও বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। বৃহস্পতিবার এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের ম্যাচ দিয়েই শুরু হবে এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। দিনের পরের ম্যাচে ভুটানের মুখোমুখি হবে স্বাগতিক বাংলাদেশ। ফ্লাডলাইটের আলোয় নিজেদের প্রথম ম্যাচ খেলতে নামবে বাংলাদেশ দল।
ভারত-পাকিস্তানের মতো আকর্ষণীয় ম্যাচ দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু হলেও আয়োজনকে ঘিরে দর্শকদের মধ্যে প্রত্যাশিত আগ্রহ তৈরির কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ এখনো চোখে পড়ছে না। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক কিংবা জনসমাগমস্থলে প্রতিযোগিতার প্রচারও নেই বললেই চলে।
এদিকে টুর্নামেন্টের আয়োজক দক্ষিণ এশীয় ফুটবল ফেডারেশন (সাফ) এবং স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন কারিগরি ও আনুষঙ্গিক সহায়তার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যাচ্ছে।
বিশেষ করে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর আগমন, আবাসন, সংবাদমাধ্যমের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ এবং ম্যাচ পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রস্তুতি নিয়ে বিভিন্ন জটিলতার তথ্য পাওয়া গেছে।
এই সমন্বয়হীনতার একটি উদাহরণ সামনে এসেছে শ্রীলঙ্কা ফুটবল দলের ঢাকায় পৌঁছানোর পর। দলটির আগমনের ছবি সংগ্রহ করতে বাফুফের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কোনো ছবি সরবরাহ করতে পারেননি।
কারণ হিসেবে জানা যায়, শ্রীলঙ্কা দলের আগমনের ছবি তোলার দায়িত্ব কোন আলোকচিত্রীকে দেওয়া হয়েছে, সেটিই তখন পর্যন্ত নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
বাফুফের একজন নির্বাহী কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিদেশি দলগুলোর বাংলাদেশে পৌঁছানোর মুহূর্তগুলো ধারণ করতে সাফ কর্তৃপক্ষকে আলোকচিত্রী নিয়োগের অনুরোধ জানানো হয়েছিল। কিন্তু এ বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাফুফে চাইলে নিজস্ব আলোকচিত্রী পাঠাতে পারত। তবে সে ক্ষেত্রে সাফের পক্ষ থেকে পারিশ্রমিক দেওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় বিষয়টি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
শুধু ছবি সংগ্রহের ক্ষেত্রেই নয়, বিদেশি দলগুলোর আবাসনের বিষয়েও পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। শ্রীলঙ্কা দল কখন হোটেলে পৌঁছাবে, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি।
তিনি জানান, এর আগে ভুটান দলের ফুটবলারদের বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর আগমনী ভিসার আনুষ্ঠানিকতা শেষ করতে প্রায় দুই ঘণ্টা সময় লেগেছিল। ফলে বিদেশি দলগুলোর আগমন ও হোটেলে পৌঁছানোর সময়সূচি নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
অংশগ্রহণকারী দলগুলোর থাকার ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। কোন দল কোন হোটেলে অবস্থান করবে, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দিতে পারেননি বাফুফের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
তবে জানা গেছে, স্বাগতিক বাংলাদেশ ও ভুটান দল রাজধানীর ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকা হোটেলে অবস্থান করছে। একই হোটেলে আরও একটি দলের থাকার কথা রয়েছে।
অন্যদিকে বাকি তিনটি দলের আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় নবনির্মিত ক্রাউন প্লাজা হোটেলে।
দলগুলোর আগমনের সময়সূচি নিয়েও আনুষ্ঠানিক তথ্যের ঘাটতি রয়েছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার বেলা দেড়টার পর ভারতীয় দলের ঢাকায় পৌঁছানোর কথা। পাকিস্তান দলের আসার কথা একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার পর।
এদিকে মালদ্বীপ দলের বুধবার (৪ নভেম্বর) সকালে ঢাকায় আসার কথা রয়েছে। ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর আগে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে রাজধানীতে পৌঁছাবে দলটি।
এত কাছাকাছি সময়ে দলগুলোর আগমন এবং আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের আয়োজন নিয়ে সংশ্লিষ্টদের প্রস্তুতির বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের আগমনও শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে ভুটান ও ভারত থেকে দুজন ম্যাচ কমিশনার ঢাকায় পৌঁছেছেন।
এ ছাড়া ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া ও ওমান থেকে কয়েকজন রেফারি এবং সহকারী রেফারির মঙ্গলবার বিকেলের মধ্যে রাজধানীতে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
তবে প্রতিযোগিতা শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে কয়েকজন ম্যাচ কর্মকর্তার ভিসাসংক্রান্ত প্রস্তুতির বিষয়েও জটিলতা দেখা দিয়েছে।
জানা গেছে, থাইল্যান্ডের একজন রেফারি মূল্যায়নকারী এবং একজন সহকারী রেফারি বাংলাদেশে আসার ভিসার ব্যবস্থা করতে সোমবার প্রথমবারের মতো সাফ সচিবালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
টুর্নামেন্টের একেবারে শেষ মুহূর্তে এসে ম্যাচ পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের ভিসা প্রক্রিয়া নিয়ে এমন অনিশ্চয়তা আয়োজকদের প্রস্তুতি সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী দল, ম্যাচ কর্মকর্তা, রেফারি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আগমন ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা আগেভাগে সম্পন্ন করা গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে শেষ মুহূর্তের জটিলতা পুরো আয়োজনের ব্যবস্থাপনাকে চাপের মুখে ফেলতে পারে।
এবারের প্রস্তুতির সঙ্গে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আগের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপগুলোর আয়োজনের পার্থক্যও চোখে পড়ছে।
এর আগে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত তিনটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপকে ঘিরে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও দর্শক আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনও সেসব আসরে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে উৎসবের পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি অনেকটাই ভিন্ন। প্রতিযোগিতা শুরুর মাত্র দুই দিন আগে রাজধানীতে বড় কোনো প্রচার কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে না। এমনকি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের প্রচারে শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে বিলবোর্ডও চোখে পড়ছে না বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে সাধারণ মানুষের কাছে টুর্নামেন্টের বার্তা কতটা পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রচার-প্রচারণার পাশাপাশি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও ঘাটতি রয়েছে। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর অনুশীলনের সময়সূচি ও স্থান সম্পর্কে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।
এতে সংবাদকর্মীরা কোন দলের অনুশীলন কখন এবং কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, সে অনুযায়ী সংবাদ সংগ্রহের প্রস্তুতি নিতে পারছেন না।
ফলে টুর্নামেন্টকে ঘিরে সংবাদ পরিবেশন এবং ফুটবলপ্রেমীদের কাছে নিয়মিত তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজেও সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
বড় কোনো আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রতিযোগিতা সফলভাবে আয়োজনের জন্য শুধু মাঠ ও খেলোয়াড় প্রস্তুত থাকাই যথেষ্ট নয়। অংশগ্রহণকারী দলগুলোর যাতায়াত, আবাসন, অনুশীলন, ম্যাচ পরিচালনা এবং সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয়ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরের ক্ষেত্রে এসব প্রস্তুতি আরও গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এই প্রতিযোগিতার মাধ্যমে স্বাগতিক দেশের ফুটবল ব্যবস্থাপনা ও আয়োজন সক্ষমতাও আন্তর্জাতিকভাবে সামনে আসে।
এবারের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপে ভারত-পাকিস্তানের আকর্ষণীয় লড়াই এবং স্বাগতিক বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দর্শকদের আগ্রহ তৈরির বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। কিন্তু প্রচারের ঘাটতি ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতার কারণে সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
টুর্নামেন্ট শুরুর আগে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সাফ ও বাফুফের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করা। একই সঙ্গে বিদেশি দলগুলোর প্রয়োজনীয় সুবিধা, ম্যাচ কর্মকর্তাদের আনুষ্ঠানিকতা এবং সংবাদমাধ্যমের জন্য তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থা দ্রুত গুছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।
আগামী বৃহস্পতিবার মাঠে গড়াবে দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতা। মাঠের লড়াইয়ে দলগুলো কতটা ভালো করবে, তা নির্ধারিত হবে খেলায়। তবে মাঠের বাইরের আয়োজন কতটা সফল হবে, সেটি নির্ভর করছে আয়োজকদের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি ও ব্যবস্থাপনার ওপর।
দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলপ্রেমীদের কাছে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ দীর্ঘদিন ধরেই আবেগের নাম। সেই আয়োজনকে ঘিরে ঢাকায় এখনো প্রত্যাশিত উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়নি। তাই মাঠে প্রথম বাঁশি বাজার আগে আয়োজকদের প্রস্তুতি ও সমন্বয়ের ঘাটতি দূর করাই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

