বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে, যেখানে প্রত্যেক নাগরিক প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা পাবেন এবং চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে কোনো পরিবারকে আর্থিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হবে না। এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য স্বাস্থ্যবিমাকে দীর্ঘদিন ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত উপায় হিসেবে বিবেচনা করা হলেও বাস্তবে দেশটি এখনো পরীক্ষামূলক উদ্যোগের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেনি। ফলে চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ এখনো মানুষের নিজের পকেট থেকেই পরিশোধ করতে হচ্ছে, যা অনেক পরিবারকে ঋণগ্রস্ত করছে, সম্পদ বিক্রি করতে বাধ্য করছে কিংবা প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে।
অনেকেই মনে করেন, দেশের বিশাল অনানুষ্ঠানিক শ্রমবাজারই স্বাস্থ্যবিমা চালুর সবচেয়ে বড় বাধা। কারণ কর্মজীবী মানুষের একটি বড় অংশের নির্দিষ্ট বেতন, লিখিত চাকরির চুক্তি বা নিয়োগকর্তার আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। ফলে বেতন থেকে নিয়মিত অর্থ কেটে স্বাস্থ্যবিমা পরিচালনার প্রচলিত মডেল এখানে সহজে কার্যকর করা কঠিন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রকৃত সমস্যা শুধু অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতিতে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে দুর্বল বিমা খাত, সীমাবদ্ধ স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কাঠামোর অভাব।
বাংলাদেশে বিমা খাতের সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো মানুষের আস্থার ঘাটতি। বিমা এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে মানুষ আজ অর্থ প্রদান করেন ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময় সুবিধা পাওয়ার প্রত্যাশায়। কিন্তু বাস্তবে অনেকের অভিজ্ঞতা সুখকর নয়। বহু ক্ষেত্রে গ্রাহকরা বিমার শর্ত পুরোপুরি না বুঝেই চুক্তিতে যুক্ত হন, পরে দাবি নিষ্পত্তির সময় জটিলতার মুখে পড়েন। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, প্রিমিয়াম নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলো যতটা আগ্রহী, দাবি পরিশোধে ততটা নয়। এই নেতিবাচক অভিজ্ঞতা স্বাস্থ্যবিমার প্রতিও অনাস্থা তৈরি করেছে।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, দেশে বিমা বলতে এখনো অধিকাংশ মানুষ জীবনবিমাকেই বোঝেন। স্বাস্থ্যবিমা একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষায়িত খাত হলেও এ বিষয়ে বিশেষ দক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বর্তমানে দেশে জীবনবিমা ও সাধারণ বিমাসহ মোট ৮২টি প্রতিষ্ঠান থাকলেও খুব অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্যবিমা সেবা দেয় এবং কেবল স্বাস্থ্যবিমা নিয়েই কাজ করে—এমন প্রতিষ্ঠান কার্যত নেই। ফলে এই খাতে বিশেষায়িত দক্ষতা, ঝুঁকি মূল্যায়ন ও দাবি ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয় অবকাঠামোও গড়ে ওঠেনি।
স্বাস্থ্যবিমার বিস্তারে দেশের স্বাস্থ্যসেবার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিমা মানুষকে চিকিৎসার অর্থ জোগাতে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু নতুন হাসপাতাল, চিকিৎসক বা ওষুধ তৈরি করতে পারে না। সরকারি হাসপাতালগুলোতে অতিরিক্ত রোগীর চাপ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট, প্রয়োজনীয় ওষুধের ঘাটতি এবং বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতা এখনো বড় সমস্যা। অন্যদিকে বেসরকারি মানসম্মত হাসপাতাল ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও মূলত বড় শহরগুলোতেই কেন্দ্রীভূত। ফলে বিমা থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহজলভ্য হয় না।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও দেখায়, কেবল স্বাস্থ্যবিমা চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না। যেসব দেশ সফলভাবে স্বাস্থ্যসেবার বিস্তার ঘটাতে পেরেছে, তারা আগে শক্তিশালী সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, প্রাথমিক চিকিৎসা, স্থানীয় পর্যায়ের সেবা এবং জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। অর্থাৎ স্বাস্থ্যবিমা একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্যব্যবস্থার পরিপূরক হতে পারে, কিন্তু দুর্বল ব্যবস্থার বিকল্প নয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব। একটি জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা কর্মসূচি পরিচালনার জন্য এমন একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন, যা জনগণকে নিবন্ধন করবে, অর্থ সংগ্রহ করবে, হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করবে, চিকিৎসা ব্যয়ের অর্থ পরিশোধ করবে এবং পুরো ব্যবস্থার জবাবদিহি নিশ্চিত করবে। বর্তমানে বাংলাদেশে স্বাস্থ্যনীতি, বিমা নিয়ন্ত্রণ এবং স্বাস্থ্য অর্থায়ন নিয়ে বিভিন্ন সংস্থা কাজ করলেও জাতীয় স্বাস্থ্যবিমা পরিচালনার পূর্ণ দায়িত্ব ও সক্ষমতা নিয়ে কোনো একক প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে বিভিন্ন পরীক্ষামূলক প্রকল্প চালু হলেও সেগুলো জাতীয় পর্যায়ে বিস্তৃত করার মতো সুসংগঠিত কাঠামো তৈরি হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়া। প্রথমেই সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, জেলা হাসপাতালের সক্ষমতা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও রোগ নির্ণয় সুবিধা সম্প্রসারণ এবং সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালের মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে অর্থ ব্যবস্থাপনা ও সেবা ক্রয়ের জন্য একটি স্বাধীন ও দক্ষ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে।
এরপর পর্যায়ক্রমে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং আনুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের মতো সহজে নিবন্ধনযোগ্য জনগোষ্ঠীকে স্বাস্থ্যবিমার আওতায় এনে অভিজ্ঞতা অর্জন করা যেতে পারে। অন্যদিকে নিম্নআয়ের ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য করভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়িয়ে যেতে হবে। এই সমন্বিত পদ্ধতিই দীর্ঘমেয়াদে সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবার লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যবিমা বাস্তবায়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের অভাব নয়; বরং আস্থার সংকট, দুর্বল স্বাস্থ্য অবকাঠামো, অপর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অঙ্গীকারের ঘাটতি। এসব মৌলিক সমস্যার সমাধান ছাড়া শুধু নতুন বিমা কর্মসূচি চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। তাই স্বাস্থ্যবিমাকে বিচ্ছিন্ন কোনো প্রকল্প হিসেবে নয়, বরং সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা সংস্কারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করাই হতে পারে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই পথ।

