সিঁড়ি দিয়ে ওঠা কিংবা একটু দ্রুত হাঁটার সময় অনেকেই হাঁপিয়ে যান। শ্বাস নিতে কষ্ট হয়, শরীর দুর্বল লাগে। বয়স বাড়া, ওজন বৃদ্ধি, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব বা শরীরের ফিটনেস কমে যাওয়ার কারণে এমনটা হতে পারে। তবে সব সময় বিষয়টিকে সাধারণ ক্লান্তি বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে যে কাজ সহজেই করা যেত, এখন সামান্য পরিশ্রমেই যদি শ্বাসকষ্ট শুরু হয় কিংবা ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়তে থাকে, তাহলে তা সতর্ক হওয়ার মতো বিষয়। বয়স বা স্বাভাবিক দুর্বলতার কারণে এমন হচ্ছে ধরে নিয়ে উপেক্ষা করলে কখনো কখনো বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, পরিশ্রমের সময় শ্বাসকষ্ট দেখা দেওয়া হৃদরোগ, ফুসফুসের সমস্যা, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের জটিলতা কিংবা অন্য কোনো শারীরিক সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এটি হৃদরোগের প্রাথমিক সংকেতও হতে পারে।
অনেক সময় বুকব্যথা হওয়ার আগেই শ্বাসকষ্ট হৃদরোগের সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা দিতে পারে। তাই ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা কিংবা ধূমপানের অভ্যাস থাকলে এ ধরনের উপসর্গকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
শ্বাসকষ্টের সঙ্গে যদি বুকে চাপ বা ব্যথা, মাথা ঘোরা, অনিয়মিত হৃদস্পন্দন, অতিরিক্ত ঘাম কিংবা পায়ে ফোলাভাব দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
শ্বাসকষ্টের প্রকৃত কারণ কীভাবে জানা যাবে?
সিঁড়ি ওঠা বা হাঁটার সময় কেন শ্বাসকষ্ট হচ্ছে, তা শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। হৃদরোগ, ফুসফুসের রোগ, রক্তস্বল্পতা, থাইরয়েডের সমস্যা, স্থূলতা, কিডনি সমস্যা এমনকি দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ থেকেও এ ধরনের সমস্যা হতে পারে।
তাই রোগ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন রোগীর বিস্তারিত চিকিৎসা ইতিহাস, শারীরিক পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় মেডিকেল টেস্ট।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাথমিকভাবে রক্তচাপ পরীক্ষা, ইসিজি, বুকের এক্স-রে এবং বিভিন্ন রক্ত পরীক্ষা করা হতে পারে। পাশাপাশি হিমোগ্লোবিনের মাত্রা, রক্তে শর্করা, থাইরয়েড, কিডনি ও লিভারের কার্যকারিতাও পরীক্ষা করা প্রয়োজন হতে পারে।
হৃদরোগের আশঙ্কা থাকলে চিকিৎসকরা ইকোকার্ডিওগ্রাফি, ট্রেডমিল স্ট্রেস টেস্ট কিংবা সিটি করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রাফির মতো পরীক্ষা করার পরামর্শ দিতে পারেন।
ইকোকার্ডিওগ্রাফির মাধ্যমে শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে হৃদপিণ্ডের গঠন, ভালভ ও রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা পরীক্ষা করা হয়। আর ট্রেডমিল স্ট্রেস টেস্টে হাঁটার সময় হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ ও ইসিজির পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়।
করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রামের মাধ্যমে হৃদপিণ্ডে রক্ত সরবরাহকারী ধমনিতে কোনো বাধা বা চর্বির স্তর জমেছে কি না, তা শনাক্ত করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হঠাৎ শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া, দ্রুত পরিস্থিতির অবনতি হওয়া কিংবা বিশ্রামের পরও শ্বাসকষ্ট না কমা গুরুতর সমস্যার লক্ষণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দ্রুত রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করলে হৃদরোগ, হার্ট ফেইলিউর বা অন্যান্য জটিলতা এড়ানো সম্ভব।
কেন দ্রুত রোগ শনাক্ত করা জরুরি
শ্বাসকষ্ট হলে যেমন বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়, তেমনি নিজের মতো করে কারণ অনুমান করাও ঠিক নয়। কারণ নির্ণয়ের জন্য প্রয়োজন সঠিক পরীক্ষা।
বিশেষ করে সিঁড়ি ওঠা, দ্রুত হাঁটা বা শারীরিক পরিশ্রমের সময় নতুন করে শ্বাসকষ্ট শুরু হলে কিংবা আগের তুলনায় সমস্যা বাড়তে থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মুম্বাইয়ের নিউবার্গ অজয় শাহ ল্যাবরেটরির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডা. অজয় শাহ বলেন, রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে প্রথমেই রোগীর বিস্তারিত চিকিৎসা ইতিহাস জানা হয়। শ্বাসকষ্ট কখন শুরু হচ্ছে, কতক্ষণ স্থায়ী হচ্ছে, কতটা তীব্র—এসব বিষয় বিবেচনা করা হয়।
তিনি বলেন, বুকে ব্যথা, বুক ধড়ফড়, কাশি, শ্বাস নেওয়ার সময় শব্দ হওয়া, দুর্বলতা ও পায়ে ফোলাভাবের মতো উপসর্গও খতিয়ে দেখা হয়। পাশাপাশি রোগীর জীবনযাপন, অভ্যাস ও অন্যান্য রোগের বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
ডা. শাহের মতে, সিবিসি (কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট) পরীক্ষা রক্তস্বল্পতা বা সংক্রমণের তথ্য দিতে পারে। এ ছাড়া রক্তে শর্করা, লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা, থাইরয়েড প্রোফাইল এবং প্রয়োজনে কার্ডিয়াক বায়োমার্কার পরীক্ষাও করা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বুকের এক্স-রে ফুসফুস ও হৃদপিণ্ডের বিভিন্ন সমস্যা শনাক্তে সহায়ক। অন্যদিকে ইসিজি হৃদস্পন্দনের স্বাভাবিকতা এবং হৃদপিণ্ডের ওপর অতিরিক্ত চাপ রয়েছে কি না, তা বুঝতে সাহায্য করে।
শ্বাসকষ্ট ও হৃদরোগের সম্পর্ক
সামান্য পরিশ্রমেই যদি শ্বাসকষ্ট হয়, সমস্যা বাড়তে থাকে, বিশ্রামের পরও না কমে কিংবা সঙ্গে বুকের চাপ, মাথা ঘোরা বা ঘামের মতো উপসর্গ থাকে, তাহলে হৃদরোগের সম্ভাবনা বিবেচনা করা হয়।
পুণের মণিপাল হাসপাতালের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান ডা. অভিজিৎ যোশী বলেন, বিশেষ করে নারী, বয়স্ক ব্যক্তি ও ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে বুকব্যথার আগেই শ্বাসকষ্ট হৃদরোগের প্রাথমিক লক্ষণ হতে পারে।
তিনি জানান, সব হৃদরোগে বুকব্যথা থাকবে—এমন নয়। অনেক রোগীর ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট, ক্লান্তি, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতাই প্রধান লক্ষণ হতে পারে। ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে নীরব হৃদরোগের ঝুঁকিও বেশি।
ডা. যোশীর মতে, হৃদপিণ্ডের পাম্প করার ক্ষমতা কমে গেলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পর্যাপ্ত অক্সিজেন ও রক্ত পৌঁছাতে পারে না। এর ফলে ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট, পায়ে ফোলাভাব এবং ফুসফুসে তরল জমার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
তিনি বলেন, শ্বাসকষ্টের সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, ঠোঁট নীল হয়ে যাওয়া, দ্রুত হৃদস্পন্দন, পা ফুলে যাওয়া, রক্ত বমি বা বিশ্রামের পরও শ্বাস নিতে সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।
বয়সের অজুহাতে উপেক্ষা নয়
বয়স বাড়ার সঙ্গে শরীরের কর্মক্ষমতা কিছুটা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। পেশির শক্তি কমে এবং হৃদপিণ্ড ও ফুসফুসের কার্যক্ষমতাতেও পরিবর্তন আসে। তবে দীর্ঘদিন ধরে চলা বা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া শ্বাসকষ্টকে শুধু বয়সের কারণে হচ্ছে বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
মুম্বাইয়ের গ্লেনেগলস হাসপাতালের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. রাহুল গুপ্তা বলেন, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও উচ্চ কোলেস্টেরল হৃদরোগের বড় ঝুঁকি। এসব সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের শ্বাসকষ্টকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, কেউ আগে সহজে শারীরিক পরিশ্রম করতে পারলেও বর্তমানে একই কাজ করতে গিয়ে শ্বাসকষ্ট অনুভব করলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। দ্রুত রোগ শনাক্ত হলে হার্ট অ্যাটাক বা হার্ট ফেইলিউরের মতো জটিলতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ডা. গুপ্তার মতে, হৃদযন্ত্রের সুস্থতার একটি সাধারণ সূচক হলো—কোনো ব্যক্তি অতিরিক্ত ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্ট ছাড়াই দৈনন্দিন কাজ করতে পারছেন কি না। যেমন, উপসর্গ ছাড়াই এক বা দুই তলা সিঁড়ি ওঠা কিংবা প্রায় ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটতে পারা শারীরিক সক্ষমতার ভালো ইঙ্গিত হতে পারে।
তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, স্মার্টওয়াচ বা নিজস্ব পর্যবেক্ষণ কোনোভাবেই চিকিৎসকের বিকল্প নয়। শ্বাসকষ্ট দীর্ঘস্থায়ী হলে বা বাড়তে থাকলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
সময়মতো রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা শুরু করলে শুধু জীবন রক্ষা নয়, দীর্ঘমেয়াদে জীবনযাত্রার মানও উন্নত করা সম্ভব। তাই শ্বাসকষ্টকে অবহেলা না করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনা জরুরি। নিজে থেকে ওষুধ গ্রহণ করা বিপজ্জনক হতে পারে।

