দেশের কোনো সরকারি হাসপাতালে হঠাৎ জীবনরক্ষাকারী ওষুধের প্রয়োজন হলো। কিন্তু সংশ্লিষ্ট খাতে বরাদ্দ শেষ হয়ে গেছে। একই সময়ে হাসপাতালের অন্য কোনো খাতে অর্থ অব্যবহৃত পড়ে আছে। তবু সেই অর্থ জরুরি ওষুধ কেনায় ব্যবহার করা সহজ নয়। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা এখানেই।
বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্য বাজেটের বড় অংশ নির্দিষ্ট খাতভিত্তিক বরাদ্দের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন, ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রক্ষণাবেক্ষণ ও অন্যান্য ব্যয়ের জন্য আলাদা আলাদা অর্থ রাখা হয়। একটি খাতের অর্থ অন্য খাতে নিতে গেলে দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
ফলে অনেক সময় সমস্যাটি অর্থের মোট ঘাটতি নয়, বরং প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনীয় জায়গায় অর্থ ব্যবহার করতে না পারা।
এই সীমাবদ্ধতা সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় জরুরি পরিস্থিতিতে। বড় দুর্ঘটনা, রোগের প্রাদুর্ভাব, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, অগ্নিকাণ্ড কিংবা অন্য কোনো দুর্যোগের সময় হাসপাতালে হঠাৎ অতিরিক্ত ওষুধ, চিকিৎসা সরঞ্জাম, জনবল ও পরিবহনের প্রয়োজন হতে পারে। বছরের শুরুতেই এসব প্রয়োজনের সঠিক পরিমাণ অনুমান করা সম্ভব নয়। অথচ বর্তমান বাজেট কাঠামো দ্রুত এমন পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জন্য যথেষ্ট নমনীয় নয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—স্বাস্থ্য খাতে সাফল্য কীভাবে মাপা হচ্ছে। সাধারণত কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে এবং কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেটিই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু কতজন রোগী সেবা পেলেন, কত দ্রুত চিকিৎসা দেওয়া হলো, প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া গেল কি না, চিকিৎসার মান কেমন ছিল কিংবা রোগীর স্বাস্থ্যে বাস্তবে কী পরিবর্তন এলো—এসব বিষয় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়।
ফলে বরাদ্দের অর্থ পুরোপুরি ব্যয় করতে পারাকেই কখনো কখনো দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে দেখা হয়। অথচ স্বাস্থ্যসেবায় মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত, খরচ করা অর্থের বিনিময়ে মানুষের জন্য কতটা কার্যকর সেবা নিশ্চিত করা গেল।
এই জায়গায় একটি জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এমন একটি তহবিল থাকলে প্রয়োজনের ভিত্তিতে দ্রুত অর্থ ছাড়, জরুরি পরিস্থিতিতে তাৎক্ষণিক সহায়তা এবং সরকারি-বেসরকারি সক্ষমতাকে রোগীর প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
থাইল্যান্ড ও ভারতসহ কয়েকটি দেশ স্বাস্থ্য অর্থায়নে শুধু খরচের উপকরণের পরিবর্তে সেবার পরিমাণ ও ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে এমন কিছু ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু হয়েছিল। জাতীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠনের কাঠামোও তৈরি করা হয়েছিল। তবে উদ্যোগগুলো প্রত্যাশিত পর্যায়ে এগোয়নি।
জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল গঠন মানেই বর্তমান সরকারি স্বাস্থ্য বাজেট বাতিল করা নয়। বরং এটি বিদ্যমান ব্যবস্থার পাশাপাশি একটি নমনীয় অর্থায়ন কাঠামো হিসেবে কাজ করতে পারে।
এ জন্য প্রথমে একটি জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। সেখানে তহবিলের উদ্দেশ্য, অর্থের উৎস, কোন খাতে ব্যয় করা যাবে, অর্থ ছাড়ের নিয়ম, জরুরি কেনাকাটার ব্যবস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা কেনার সুযোগ এবং নিরীক্ষা ও জবাবদিহির পদ্ধতি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
তহবিল পরিচালনার জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাবও বিবেচনা করা যেতে পারে। জাতীয় বাজেট থেকে প্রতি বছর নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ এতে দেওয়া যেতে পারে। পাশাপাশি আরও কয়েকটি উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে মুঠোফোন যোগাযোগ খাতকে বিবেচনা করা যেতে পারে। বর্তমানে এই খাত থেকে কর, ফি ও তরঙ্গ ব্যবহারের অর্থসহ বিভিন্ন পথে সরকার রাজস্ব পায়। বিদ্যমান রাজস্ব কাঠামো অপরিবর্তিত রেখেই অতিরিক্ত ১ থেকে ২ শতাংশ অর্থ স্বাস্থ্য তহবিলের জন্য নির্দিষ্ট করা গেলে একটি নিয়মিত অর্থের উৎস তৈরি হতে পারে।
ওষুধ কোম্পানি, ব্যাংক, বীমা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামাজিক দায়বদ্ধতা খাতের অর্থের একটি অংশও এই তহবিলে যুক্ত করা যেতে পারে। উন্নয়ন সহযোগী, বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, ব্যক্তি এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বেচ্ছা অনুদানও সহায়ক হতে পারে।
তবে তহবিলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হবে নমনীয়তা ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রাখা।
সরকারের নিয়মিত বাজেট থেকে হাসপাতালের বেতন-ভাতা, নিয়মিত ওষুধ, রক্ষণাবেক্ষণ, বিদ্যুৎ, পানি এবং অন্যান্য দৈনন্দিন ব্যয় চলতে পারে। অন্যদিকে জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল থেকে হাসপাতালগুলোকে নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এককালীন বা সমন্বিত বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে, যা জরুরি প্রয়োজন কিংবা স্থানীয়ভাবে চিহ্নিত সমস্যায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রেও শুধু কত টাকা ব্যয় হলো তা নয়, কী ফল পাওয়া গেল—সেটি বিবেচনা করা প্রয়োজন। একটি হাসপাতাল কতজন রোগীকে সেবা দিল, জরুরি রোগী কত দ্রুত চিকিৎসা পেল, প্রয়োজনীয় ওষুধ সবসময় ছিল কি না, রোগীদের কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছে এবং চিকিৎসার নির্ধারিত মান বজায় রাখা হয়েছে কি না—এসব সূচক ভবিষ্যৎ বরাদ্দের সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে।
সরকারি হাসপাতালে কোনো বিশেষ সেবা দেওয়ার সক্ষমতা না থাকলে নির্ধারিত মূল্য ও মানের ভিত্তিতে অনুমোদিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে সেবা কেনার সুযোগও রাখা যেতে পারে।
জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিলের মধ্যেই আলাদা জরুরি স্বাস্থ্য তহবিল রাখা হলে মহামারি, রোগের প্রাদুর্ভাব বা বড় দুর্যোগের সময় নির্দিষ্ট নিয়মে দ্রুত অর্থ ছাড় দেওয়া সম্ভব হবে।
তবে অর্থ ব্যবহারে নমনীয়তা যেন অনিয়মের সুযোগ তৈরি না করে, সেটি নিশ্চিত করাও জরুরি। বরাদ্দ থেকে শুরু করে ব্যয়, সেবা প্রদান এবং ফলাফল পর্যন্ত প্রতিটি টাকার গতিপথ ডিজিটালভাবে অনুসরণযোগ্য করা যেতে পারে।
সবার জন্য উন্মুক্ত তথ্যভান্ডারে কোন হাসপাতাল কত অর্থ পেয়েছে, কোথায় ব্যয় করেছে, কতজন মানুষ সেবা পেয়েছেন এবং কী ফল পাওয়া গেছে—এসব তথ্য প্রকাশ করা হলে স্বচ্ছতা বাড়বে।
প্রচলিত আর্থিক নিরীক্ষার পাশাপাশি কার্যসম্পাদনভিত্তিক নিরীক্ষাও প্রয়োজন। অর্থ নিয়ম মেনে ব্যয় হয়েছে কি না, তার পাশাপাশি বরাদ্দের উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করা উচিত।
চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে যে অতিরিক্ত এককালীন বরাদ্দ রাখা হয়েছে, তার একটি অংশ দিয়ে জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিলের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু করার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে অর্থের প্রয়োজন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। অর্থ কোথায়, কখন এবং কীভাবে ব্যবহার হচ্ছে—সেই ব্যবস্থাও বদলাতে হবে। একটি কার্যকর জাতীয় স্বাস্থ্য তহবিল সেই পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে, যদি এর সঙ্গে শক্তিশালী জবাবদিহি, স্বচ্ছতা এবং ফলাফলভিত্তিক মূল্যায়ন নিশ্চিত করা যায়।

