দেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা এ চিত্র পেয়েছেন। সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে ৫১ দশমিক ৯ শতাংশের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি। সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারে এ হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ।
সিসা শিশুর মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ক্ষতি করতে পারে। এর প্রভাবে বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা, মনোযোগ, শেখার ক্ষমতা ও আচরণে সমস্যা দেখা দিতে পারে। এসব ক্ষতির সব সময় তাৎক্ষণিক লক্ষণ থাকে না। অনেক ক্ষেত্রে শিশুকে সুস্থ দেখালেও তার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুর রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা জানা নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়।
গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা আছে। অর্থাৎ এই বয়সী প্রতি ১০০ শিশুর মধ্যে প্রায় ৩৯ জনের রক্তে সিসা গবেষণায় নির্ধারিত উচ্চমাত্রার সীমায় বা তার ওপরে রয়েছে। ডব্লিউএইচওর উদ্যোগে ১৮ থেকে ২৪ অক্টোবর পালিত হচ্ছে ১৪তম আন্তর্জাতিক সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধ সপ্তাহ। এবারের প্রতিপাদ্য ‘শনাক্তকরণ থেকে প্রতিরোধে’।
গবেষণাটি করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান। চলতি মাসের ১৪ তারিখে এটি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম মেডআর্কাইভে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষকেরা নতুন করে শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করেননি। তাঁরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভের (মিকস) আগে থেকে সংগৃহীত রক্ত পরীক্ষার ফল ও পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য নতুন করে বিশ্লেষণ করেছেন। ইউনিসেফের কারিগরি সহায়তায় হওয়া এ জরিপে প্রথমবারের মতো জাতীয় পর্যায়ে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের রক্তে সিসাসহ কয়েকটি ভারী ধাতুর মাত্রা পরীক্ষা করা হয়।
জরিপে ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী ১৮ হাজার ৯০৫ শিশুকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১০ হাজার ৬২২ শিশুর রক্তে সিসার পরীক্ষার ফল পাওয়া যায়। আর্থসামাজিক নানা বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে বিবেচনা করে করা মূল বিশ্লেষণে সম্পূর্ণ তথ্য মিলেছে ৯ হাজার ৭১৭ শিশুর। পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষা, বসবাসের এলাকা ও ঘরের অবস্থার সঙ্গে সিসার উচ্চমাত্রার সম্পর্ক খতিয়ে দেখা হয়েছে।
সম্পদ অনুযায়ী পরিবারগুলোকে পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। সবচেয়ে ধনী ও সবচেয়ে দরিদ্র শ্রেণির মধ্যে ব্যবধান ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট। গবেষকেরা দেখেছেন, সম্পদের শ্রেণি যত ওপরে উঠেছে, উচ্চমাত্রার হারও তত বেড়েছে। মায়ের শিক্ষা, ঘরের অবস্থাসহ অন্যান্য বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নেওয়ার পরও এ সম্পর্ক বজায় ছিল।
ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসা বেশি কেন, সে প্রশ্নে গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন সম্ভাব্য কিছু ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর মতে, এসব শিশু প্যাকেটজাত খাবার বেশি খেতে পারে। তাদের বাসায় আসবাব, দেয়ালের রং ও নানা ধরনের তৈজসও বেশি থাকে। এসব পণ্যে সিসা থাকতে পারে, ফলে এগুলোর সংস্পর্শ শিশুর শরীরে সিসা ঢোকার পথ হতে পারে। তবে এসব উৎস গবেষণায় আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তাই প্যাকেটজাত খাবার, আসবাব বা রঙের কারণেই এমন হচ্ছে, এই সিদ্ধান্ত সরাসরি টানা যায় না।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লাও মনে করেন, ধনী পরিবারের শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার সুযোগ তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তিনি বলেন, এসব পরিবারের শিশুরা আমদানি করা খেলনা বেশি পায়, বাসায় সাজসজ্জার সামগ্রীও থাকে। পোলট্রি মুরগির খাবারে সিসা থাকতে পারে এবং সম্পন্ন পরিবারের অনেক শিশু মুরগির মাংস বেশি খায়। এসব পথেও শরীরে সিসা ঢোকা অস্বাভাবিক নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।
সিসা শরীরে ঢুকলে রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি ও হাড়সহ বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছাতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, তাদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র তখনো বিকাশের পর্যায়ে থাকে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব শিক্ষাগত অর্জনেও পড়তে পারে। সিসার সংস্পর্শ রক্তস্বল্পতা, কিডনির ক্ষতি ও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গেও সম্পর্কিত।
শিশুবিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আবিদ হোসেন মোল্লা বলেন, শিশুর শরীরে সিসার ক্ষতি হয়েছে কি না, তা শুধু বাইরের চেহারা বা তাৎক্ষণিক উপসর্গ দেখে বোঝা যায় না। তাঁর ভাষ্য, উচ্চমাত্রার সংস্পর্শে গুরুতর উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তবে তুলনামূলক কম মাত্রার সংস্পর্শেও বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সিসা মস্তিষ্কের বিকাশ ব্যাহত করে এবং অনুভূতি সৃষ্টিকারী স্নায়ুর কার্যকারিতা নষ্ট করতে পারে। অনেক সময় হিমোগ্লোবিনের মাত্রাও কমে যায়। আবিদ হোসেন মোল্লা ও মোহাম্মদ সহিদুল্লা দুজনই জানান, আগের তুলনায় এখন স্নায়ুগত সমস্যায় আক্রান্ত শিশু তাঁদের কাছে বেশি আসছে।
বাংলাদেশে এর আগেও এ নিয়ে গবেষণা হয়েছে। ২০১৬ সালে এনভায়রনমেন্টাল হেলথ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় সিরাজদিখান ও পাবনার ৫২৪ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। ২০ থেকে ৪০ মাস বয়সী এসব শিশুর রক্তে সিসার মাত্রার পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক ও মোটর বিকাশ মূল্যায়ন করা হয়েছিল। সিরাজদিখানের শিশুদের রক্তে সিসা তুলনামূলক বেশি পাওয়া যায়। সেখানে সিসার মাত্রা বাড়ার সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক পরীক্ষায় কম নম্বর পাওয়ার সম্পর্কও দেখা গেছে। তবে গবেষকেরা একে দুটি বিষয়ের মধ্যকার সম্পর্ক হিসেবেই তুলে ধরেছেন। প্রতিটি শিশুর বিকাশজনিত সমস্যার একমাত্র কারণ সিসা, এমন সিদ্ধান্ত এর ভিত্তিতে দেওয়া যায় না।
২০২০ সালে জার্নাল অব নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারসে প্রকাশিত ৭৩৪ শিশুর আরেক গবেষণায় জন্মের সময় নাড়ির রক্তে সিসার মাত্রা এবং দুই থেকে তিন বছর বয়সে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ বিশ্লেষণ করা হয়। অপুষ্টিজনিত খর্বাকৃতির শিশুদের ক্ষেত্রে গর্ভকালীন সিসার সংস্পর্শের সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক নম্বর কমার সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে সব স্থানে এ সম্পর্ক একই রকম ছিল না। গবেষকদের ধারণা, অপুষ্টি বা খর্বাকৃতি শিশুদের সিসার ক্ষতির প্রতি আরও সংবেদনশীল করে তুলতে পারে।
বিভাগভেদেও চিত্রে বড় পার্থক্য আছে। মিকস ২০২৫-এর প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, ঢাকায় ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা মিলেছে। সিলেটে এ হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ ও চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ। বিপরীতে বরিশালে ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ এবং রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ। গবেষকদের সমন্বিত বিশ্লেষণেও বরিশালকে ভিত্তি ধরে ঢাকায় উচ্চমাত্রার সঙ্গে বেশি সম্পর্ক এবং রাজশাহীতে কম সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এই গবেষণার ফল একটি প্রচলিত ধারণাকে নাড়া দেয়। সাধারণত ভাবা হয়, দারিদ্র্য ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বেশি ঝুঁকি তৈরি করে। কিন্তু এখানে উল্টো চিত্র মিলেছে। এতে বোঝা যায়, সিসার ঝুঁকি শুধু দরিদ্র এলাকার সমস্যা নয়। সচ্ছল পরিবারের জীবনযাত্রা, ভোগ্যপণ্য ও খাদ্যাভ্যাসের মধ্য দিয়েও শিশুর শরীরে সিসা ঢুকতে পারে। তবে প্রকৃত উৎস এখনো নিশ্চিত নয়। গবেষকেরাই বলছেন, উৎসগুলো আলাদাভাবে যাচাই হয়নি। কাজেই কার্যকর প্রতিরোধের জন্য খাদ্য, রং, খেলনা, তৈজস ও পশুখাদ্যে সিসার উপস্থিতি নিয়ে আলাদা অনুসন্ধান জরুরি।
এ গবেষণা বিদ্যমান জরিপের তথ্য নতুন করে বিশ্লেষণ করে করা। এটি সম্পর্ক দেখায়, কার্যকারণ প্রমাণ করে না। ঢাকায় সিসার হার সবচেয়ে বেশি হওয়ায় শহুরে পরিবেশ ও ভোগের ধরন এতে ভূমিকা রাখছে কি না, তাও খতিয়ে দেখার বিষয়।
সবচেয়ে বড় কথা, শিশুর ক্ষতি বাইরে থেকে বোঝা কঠিন। তাই ঝুঁকি শনাক্ত ও প্রতিরোধের উদ্যোগ আগেভাগে নেওয়া দরকার। নীতিনির্ধারকদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হলো সিসার উৎস চিহ্নিত করা, পণ্যের মান নজরদারি জোরদার করা এবং অভিভাবকদের সচেতন করা। চিকিৎসকেরা বলছেন, স্নায়ুগত সমস্যায় আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। এ অবস্থায় বিষয়টিকে জনস্বাস্থ্যের অগ্রাধিকার হিসেবে দেখার তাগিদ আরও জোরালো হয়েছে।

