কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত পাঁচ চিকিৎসকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন। এ ছাড়া অন্যত্র সংযুক্তিতে থাকা আরও সাত চিকিৎসককে নিজ কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হাসপাতালে পৌঁছান মন্ত্রী। তিনি চিকিৎসকদের উপস্থিতি, রোগীদের সেবার মান ও হাসপাতালের সার্বিক পরিবেশ ঘুরে দেখেন। এ সময় রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং দুজন অসহায় ব্যক্তিকে ব্যক্তিগতভাবে আর্থিক সহায়তা দেন।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, সেখানে মোট ৫১ জন চিকিৎসকের মধ্যে পরিদর্শনের সময় ১২ জন অনুপস্থিত ছিলেন। তাঁদের সাতজন অন্যত্র সংযুক্তিতে কাজ করছেন। বাকি পাঁচজন দীর্ঘদিন ধরে নিজ কর্মস্থলে আসছেন না। অর্থাৎ প্রায় প্রতি চারজন চিকিৎসকের একজন সেদিন কর্মস্থলে ছিলেন না, যা উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় জনবল ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই সামনে এনেছে।
পরিদর্শনের সময় মুরাদনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার ঘোষণা দেন মন্ত্রী। পরিকল্পনার আওতায় হাসপাতালে ১০টি ডায়ালাইসিস মেশিন বসানো হবে। প্রসূতি মায়েদের জন্য থাকবে ২০ শয্যার ওয়ার্ড এবং নবজাতকদের জন্য ২০ শয্যার ব্যবস্থা। এ ছাড়া নারী ও পুরুষের জন্য আলাদা ফিজিওথেরাপি সেবা এবং একটি ব্রেস্টফিডিং সেন্টার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মন্ত্রী জানান, আগামী ১৫ থেকে ১৬ দিনের মধ্যে এই প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ করার পরিকল্পনা আছে। আগামী ১ নভেম্বর নতুন করে যোগ দিতে যাওয়া ৪৮ জন চিকিৎসকের মধ্য থেকে মুরাদনগর হাসপাতালে চিকিৎসক পদায়নের আশ্বাসও দেন তিনি।
হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আগের তুলনায় উন্নতি দেখা গেলেও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য, রোগীদের মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিতের পাশাপাশি হাসপাতাল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখাও জরুরি।
হাসপাতালসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, বর্জ্য ফেলার জন্য উপজেলায় উপযুক্ত জমির সংকট আছে। এ সমস্যার সমাধানে স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপযুক্ত ব্যবস্থা করা যায় কি না, তা বিবেচনা করা হবে বলে জানান মন্ত্রী।
এ ছাড়া হাসপাতালের বিকল যানবাহনগুলো কন্ডেমনেশন প্রক্রিয়ায় নিতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন তিনি। অ্যাম্বুলেন্সের সংকট নিয়ে মন্ত্রী বলেন, আগামী অর্থবছরের মধ্যে অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশের উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবায় কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। বর্তমান সরকার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করতে উদ্যোগ নিয়েছে। তিনি বলেন, মুরাদনগর হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মান আগের চেয়ে ভালো মনে হয়েছে। তবে পরিদর্শনে কিছু অনিয়ম তাঁর নজরে এসেছে। এসব বিষয়ে চিকিৎসকদের সতর্ক করা হয়েছে।
চিকিৎসকদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, প্রয়োজনীয় জনবল পদায়ন, আধুনিক চিকিৎসাসুবিধা বাড়ানো এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নের মাধ্যমে মুরাদনগরের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা আরও সহজ ও কার্যকর করার আশ্বাস দেন মন্ত্রী। সব মিলিয়ে এই পরিদর্শন একদিকে চিকিৎসকদের কর্মস্থলে অনুপস্থিতির পুরোনো সমস্যাকে সামনে এনেছে, অন্যদিকে হাসপাতালের অবকাঠামো ও সেবা সম্প্রসারণের নতুন প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। এসব ঘোষণা কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয় এবং অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা কতটা কার্যকর হয়, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

