দেশজুড়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ চলাকালে সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্লাটিলেট অ্যাফেরেসিস কিটের সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে এই পদ্ধতিতে প্লাটিলেট সংগ্রহের প্রয়োজন হলে রোগীদের বাইরে থেকে কিট কিনতে হচ্ছে, অথবা অনেক বেশি খরচে বেসরকারি হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাংকের সেবা নিতে হচ্ছে।
ডেঙ্গুর মৌসুম সামনে রেখে কয়েকটি সরকারি হাসপাতাল গত সেপ্টেম্বরেই কিট কেনার চাহিদা জানিয়েছিল। কিন্তু নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সেই কিট কেনা হয়নি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের মধ্যে চিঠি চালাচালিতে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ডেঙ্গুতে আক্রান্ত কিছু রোগীর রক্তে প্লাটিলেটের মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যেতে পারে। বিশেষ পরিস্থিতিতে তাঁদের চিকিৎসায় সুস্থ রক্তদাতার কাছ থেকে সংগ্রহ করা প্লাটিলেট লাগে। অ্যাফেরেসিস পদ্ধতিতে একজন রক্তদাতার শরীর থেকে সরাসরি প্লাটিলেট সংগ্রহ করতে এই বিশেষ কিট ব্যবহার করা হয়। ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন ব্লাড ব্যাংকে প্লাটিলেটের চাহিদাও বেড়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে গত কয়েক মাসে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চাহিদা তিন থেকে চার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগকে একটি চিঠি পাঠায়। চিঠিতে বলা হয়, দেশে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে এবং এসব রোগীর চিকিৎসায় অনেক সময় জরুরি ভিত্তিতে প্লাটিলেট অ্যাফেরেসিস প্রয়োজন হয়। অথচ সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে এই কিটের কোনো সরবরাহ নেই। দেশের ২২টি মেডিকেল কলেজ ও বিশেষায়িত হাসপাতালে মোট ২৮টি অ্যাফেরেসিস মেশিন রয়েছে। এর মধ্যে ১৭টি হাসপাতাল থেকে মোট ১৭ হাজার ৮৭৪টি কিটের চাহিদা পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভাষ্য, সরকারি হাসপাতালে কিট না থাকায় রোগীদের বাইরে থেকে তা কিনতে হচ্ছে। অধিকাংশ রোগী নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের হওয়ায় এই বাড়তি ব্যয় বহন করা তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। খরচের ব্যবধানও বিশাল। বেসরকারি হাসপাতাল ও ব্লাড ব্যাংকে অ্যাফেরেসিস পদ্ধতিতে এক ইউনিট প্লাটিলেট সংগ্রহে খরচ হয় ২২ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা। রেড ক্রিসেন্ট ব্লাড ব্যাংকে এই খরচ ২৫ হাজার ৪০০ টাকা। অথচ সরকারি হাসপাতালে একই সেবা মেলে মাত্র ২ হাজার ৭০০ টাকায়।
গত ১ নভেম্বর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ আরেকটি চিঠিতে কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের (সিএমএসডি) পরিচালককে দ্রুত ২০ হাজার প্লাটিলেট অ্যাফেরেসিস কিট কেনার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেয়। চিঠিতে ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসায় এসব কিটের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে চিকিৎসা ও শল্যচিকিৎসা সরঞ্জাম সরবরাহ খাতে সিএমএসডির অনুকূলে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ আছে। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ জানিয়েছে, এই অর্থ এখনো ব্যয় হয়নি। রোগীদের চিকিৎসার স্বার্থে ওই বরাদ্দ থেকেই কিটগুলো কেনার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
টিবিএসকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে সিএমএসডির পরিচালক মোহাম্মদ শফিউর রহমান জানান, নির্দেশনা অনুযায়ী কিট কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তবে সরকারি ক্রয়বিধি মেনে কিনে বিতরণ করতে তিন থেকে চার মাস সময় লাগতে পারে। সাধারণত ডিসেম্বর থেকে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা কমতে শুরু করে। ফলে চলতি মৌসুমে সময়মতো সরকারি হাসপাতালে কিট পৌঁছানোর সম্ভাবনা কম।
আগে কেন কিট কেনা হয়নি, এমন প্রশ্নে শফিউর রহমান বলেন, সাধারণ ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় এসব কিট ব্যবহার করা হয় না, গুরুতর রোগীদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন হয়। তিনি আরও জানান, এর আগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখা থেকে এসব কিট কেনা হতো।
চিকিৎসকেরা বলছেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেই কিংবা প্লাটিলেটের সংখ্যা কমলেই তা দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। রোগীর শারীরিক অবস্থা, রক্তক্ষরণের লক্ষণ ও অন্যান্য চিকিৎসাগত বিষয় বিবেচনা করে চিকিৎসকেরা সিদ্ধান্ত নেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. শাহনূর সারমিন জানান, বর্তমানে ডেঙ্গু চিকিৎসায় প্লাটিলেট ব্যবহারের প্রবণতা কমেছে। এবার তাঁদের হাসপাতালের তিনটি ইউনিটে খুব কম রোগীকে প্লাটিলেট দিতে হয়েছে। যেসব রোগীর ডায়ালাইসিস লাগে বা অন্য জটিলতা থাকে, তাঁদের ক্ষেত্রেই এটি ব্যবহার করা হয়।
এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ৪ নভেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গুতে আরও ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৬৬ জন। এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৪৫ জনে। হাসপাতালে মোট ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৭৭৫ জন। অক্টোবরে ডেঙ্গুতে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে। বর্ষা শেষ হলেও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নভেম্বরজুড়ে সংক্রমণের ঝুঁকি থাকবে। তাই হাসপাতালগুলোতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও রক্তের উপাদানের পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, শুধু ডেঙ্গু নয়, অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসাতেও এই কিট প্রয়োজন। দুর্ঘটনাজনিত রক্তক্ষরণ, ডিসেমিনেটেড ইন্ট্রাভাসকুলার কোয়াগুলেশন, ক্যানসার, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, রক্তের ক্যানসার ও কেমোথেরাপিজনিত প্লাটিলেটস্বল্পতায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য প্লাটিলেট লাগতে পারে।
কাস্টমস সূত্র বলছে, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশে এ ধরনের কিটের ২১টি আমদানি চালান এসেছে। চালানগুলো এসেছে নেদারল্যান্ডস, ডোমিনিকান রিপাবলিক, মালয়েশিয়া, জার্মানি ও ভিয়েতনাম থেকে। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট ফেডারেশনের বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল গত সেপ্টেম্বরে ১০০টি কিট কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করেছে। এর আগে জানুয়ারিতেও সংস্থাটি ৫০টি কিট কেনার দরপত্র প্রকাশ করেছিল।
সংকটের পেছনে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ব্যয়ের দুর্বলতাও উঠে এসেছে। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দের মাত্র ১ দশমিক ৭৮ শতাংশ ব্যয় করেছে। ৬ হাজার ১৪ কোটি টাকার বরাদ্দের বিপরীতে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত খরচ হয়েছে মাত্র ১০৭ কোটি টাকা। মন্ত্রণালয়ের দুই বিভাগের উন্নয়ন প্রকল্পের পাশাপাশি বড় অঙ্কের থোক বরাদ্দও অব্যবহৃত পড়ে আছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনার ক্ষেত্রে আগেভাগে চাহিদা নিরূপণ, সময়মতো দরপত্র আহ্বান ও সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে ডেঙ্গুর মতো মৌসুমি রোগের ক্ষেত্রে সংক্রমণ বাড়ার পর কেনাকাটার উদ্যোগ নিলে রোগীদের ভোগান্তি ও চিকিৎসার ব্যয় দুটোই বাড়ে। বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও যদি তা সময়মতো কাজে না লাগে, তবে এর খেসারত দিতে হয় সাধারণ রোগী ও তাঁদের পরিবারকেই।

