মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার পর শুরু হওয়া সংঘাতের জেরে হরমুজ প্রণালি আবারও বিশ্ববাণিজ্যের কেন্দ্রীয় আলোচনায় উঠে এসেছে। গত বুধবার ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি শুরু হলেও এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে এখনো স্বাভাবিক অবস্থা ফেরেনি। কাগজে-কলমে পথ খোলা হলেও বাস্তবে জাহাজ চলাচল এখনও খুব সীমিত, আর পারস্য উপসাগরে শত শত জাহাজ ও হাজারো নাবিক অনিশ্চয়তার মধ্যে আটকে আছেন।
হরমুজ প্রণালি শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতিরও একটি স্পর্শকাতর ধমনি। বিশ্বের অপরিশোধিত তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে যায়। শুধু তাই নয়, বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সারও পরিবাহিত হয় এই প্রণালি ব্যবহার করে। ফলে এখানে সামান্য বিঘ্নও জ্বালানি বাজার, কৃষি সরবরাহব্যবস্থা, শিপিং খরচ এবং খাদ্যনিরাপত্তা—সবকিছুর ওপর একসঙ্গে চাপ তৈরি করে।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন, দ্রুতই হয়তো জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হয়ে আসবে। কিন্তু বাস্তবতা এখনো সে রকম নয়। শুক্রবারও হরমুজ প্রণালি দিয়ে সীমিত সংখ্যক জাহাজ চলাচল করেছে। সমুদ্র তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা কেপলারের তথ্য বলছে, বুধবার যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে মাত্র ১৬টি পণ্যবাহী জাহাজ এই প্রণালি অতিক্রম করেছে। শান্তিকালীন সময়ের তুলনায় এই সংখ্যা অত্যন্ত কম; জাহাজ চলাচল কমে গেছে প্রায় ৯০ শতাংশ।
এই পরিসংখ্যানের ভেতরেই বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি লুকিয়ে আছে। অর্থাৎ যুদ্ধবিরতি হয়েছে ঠিকই, কিন্তু আস্থা ফেরেনি। শিপিং কোম্পানি, জাহাজমালিক, বীমা প্রতিষ্ঠান এবং নৌ-নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এখনো এই জলপথকে পুরোপুরি নিরাপদ মনে করছে না। যুদ্ধবিরতি মানে যে তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা—বাস্তবে তা নয়। সমুদ্রপথে একটি ভুল হিসাব, একটি মাইন, একটি ভুল সংকেত বা একটি অঘোষিত হামলাই পরিস্থিতি আবার অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।
কেপলারের বিশ্লেষক আনা সুবাসিচের মতে, যুদ্ধবিরতি বহাল থাকলেও হরমুজ দিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০-১৫টি জাহাজ চলাচল করতে পারে। এই বক্তব্যও দেখিয়ে দেয় যে পরিস্থিতি “খোলা” হলেও এখনো “স্বাভাবিক” নয়। ১ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ৩২৮টি পণ্যবাহী জাহাজের চলাচলের মধ্যে ২০৮টি ছিল তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাংকার, যার বেশিরভাগই পূর্বদিকে ওমান উপসাগরের দিকে গেছে। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, সংঘাতের মধ্যেও জ্বালানিবাহী জাহাজকে অগ্রাধিকার দিয়ে কিছু চলাচল বজায় রাখা হয়েছে, কিন্তু সামগ্রিক বাণিজ্যিক প্রবাহ তবু থমকে আছে।
শিপিং জার্নাল লয়েডস লিস্ট-এর হিসাব অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির শেষ থেকে এখনো প্রায় ৮০০টি জাহাজ উপসাগরে আটকে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০০টি মাঝারি থেকে বড় আকারের পণ্যবাহী জাহাজ, যাদের ধারণক্ষমতা ১০ হাজার ডেডওয়েট টনের বেশি। এর মানে শুধু জাহাজ থেমে আছে তা নয়; এর সঙ্গে থেমে আছে পণ্য সরবরাহের সময়সূচি, শিল্পকারখানার কাঁচামাল, খাদ্যশস্য উৎপাদনের প্রস্তুতি, এমনকি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের অনেক সূক্ষ্ম সংযোগও।
৭ এপ্রিল পর্যন্ত পারস্য উপসাগরে ১৮৭টি ট্যাংকারে মোট ১৭ কোটি ২০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত ও পরিশোধিত জ্বালানি পণ্য সমুদ্রে অবস্থান করছিল বলে কেপলার জানিয়েছে। এ পরিমাণ জ্বালানি পণ্য সমুদ্রে আটকে থাকা বিশ্ববাজারের জন্য বড় সতর্কবার্তা। কারণ বাজারে সরবরাহ ব্যাহত হলে কেবল দামের ওঠানামাই হয় না, বরং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জ্বালানি নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তবে এই অচলাবস্থার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি হচ্ছে সার পরিবহন। বিশ্বের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সার হরমুজ প্রণালি দিয়ে যায়। ফলে এখানে কোনো দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন কেবল শিপিং সংকট নয়, তা খাদ্য উৎপাদনের ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব থেকে পানামার পতাকাবাহী ‘প্রিক্স’ নামের ২৫ হাজার টন সারবাহী একটি জাহাজ শুক্রবার প্রণালি অতিক্রমের পথে রয়েছে। যুদ্ধবিরতির পর ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নেই এমন প্রথম সারবাহী জাহাজ হিসেবে এটি হরমুজ অতিক্রম করতে পারে। এই ঘটনাটি প্রতীকীভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি ইঙ্গিত দেয়—যুদ্ধবিরতির পর ধীরে ধীরে কিছু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক চলাচল পুনরায় শুরু করার চেষ্টা হচ্ছে।
কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো জটিল। উপসাগরে আরও ৪০টি জাহাজ সারবোঝাই বা সার লোডিংয়ের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি ১৪টি এলএনজি ট্যাংকার নিষ্ক্রিয় অবস্থায় আছে। অর্থাৎ শুধু তেল নয়, গ্যাস ও কৃষি-সম্পর্কিত বাণিজ্যও অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এই স্থবিরতা দীর্ঘ হলে এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে না।
এই সংকটের একটি মানবিক দিকও আছে, যা অনেক সময় সংখ্যার আড়ালে ঢাকা পড়ে যায়। জাহাজ আটকে থাকা মানে হাজারো নাবিকের দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, মানসিক চাপ, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং অপারেশনাল ঝুঁকি। সমুদ্রে দীর্ঘ সময় স্থির হয়ে থাকা কোনো জাহাজ শুধু বাণিজ্যিক ক্ষতির প্রশ্ন নয়; এটি ক্রুদের জীবনযাপন, নিরাপত্তা এবং জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি করে।
বাংলাদেশও এই পরিস্থিতির বাইরে নেই। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি পৌঁছেও তা অতিক্রম করতে পারেনি। বুধবার সকালে সৌদি আরবের দাম্মাম বন্দরের বহির্নোঙর এলাকা থেকে ছেড়ে আসা স্টিল কয়েলবাহী এই জাহাজটি বৃহস্পতিবার রাতে প্রণালির কাছে পৌঁছে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও অতিক্রমের অনুমতি পায়নি। বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, জাহাজটি হরমুজ প্রণালি থেকে প্রায় ২০ নটিক্যাল মাইল দূরে একটি নোঙরস্থলে অবস্থান করছে। এই একটি উদাহরণই দেখিয়ে দেয়, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও অনুমতি, রুট, নিরাপত্তা ও সমন্বয়ের প্রশ্নে বাস্তব জটিলতা কীভাবে রয়ে গেছে।
যুদ্ধ চলাকালে মাত্র একটি খালি এলএনজি ট্যাংকার এবং ছয়টি সারবাহী জাহাজ প্রণালি অতিক্রম করতে পেরেছে। এই সংখ্যাটি খুবই কম, এবং তা স্পষ্ট করে যে যুদ্ধবিরতির আগে হরমুজ কার্যত কঠোর নিয়ন্ত্রণ, ভয় এবং ঝুঁকির আওতায় ছিল। এখনো সেই পরিবেশ পুরোপুরি কাটেনি।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় জট হলো—নিরাপদ চলাচল কীভাবে নিশ্চিত হবে, তা নিয়ে এখনো পরিষ্কার কোনো কাঠামো নেই। বৃহস্পতিবার ইরান লারাক দ্বীপের কাছে বিকল্প পথ ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে, কারণ মূল পথে সমুদ্র মাইনের ঝুঁকি রয়েছে। অর্থাৎ পথ খোলা থাকলেও সেটি আগের পরিচিত পথ নয়; ঝুঁকি বিবেচনায় নতুন রুট, নতুন শর্ত ও নতুন সমন্বয় সামনে এসেছে।
নৌ নিরাপত্তাবিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থা ভ্যানগার্ড টেকের তথ্য অনুযায়ী, ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড (আইআরজিসি) জানিয়েছে, ইরানি নৌবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করেই কেবল জাহাজগুলো প্রণালি ব্যবহার করতে পারবে। এই ঘোষণার মধ্যেই বোঝা যায়, হরমুজে এখন শুধু সমুদ্রপথের প্রশ্ন নেই; এখানে সামরিক নজরদারি, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং কৌশলগত প্রভাব—সব একসঙ্গে কাজ করছে। গত সপ্তাহে ওমান উপকূল ঘেঁষে তিনটি ওমানি ট্যাংকার চলাচল ছাড়া সাম্প্রতিক বেশিরভাগ জাহাজই ইরান অনুমোদিত পথ ব্যবহার করেছে। কিছু ক্ষেত্রে এসব জাহাজ টোলও দিয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।
এখানে এসে সংকটটি আরও আন্তর্জাতিক রূপ নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বৃহস্পতিবার সতর্ক করে বলেছেন, জাহাজ চলাচলের জন্য ইরান যেন কোনো টোল আরোপ না করে। যদিও এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে যৌথভাবে টোল আরোপের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য দেশও বৃহস্পতিবার হরমুজে টোল আরোপের ধারণার সমালোচনা করেছে এবং বলেছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। অর্থাৎ এখন বিরোধ কেবল যুদ্ধবিরতি বা নিরাপত্তা নিয়ে নয়; সমুদ্রপথের বৈধ নিয়ন্ত্রণ ও আন্তর্জাতিক নৌ-আইনের প্রশ্নও সামনে চলে এসেছে।
এখানেই হরমুজ প্রণালির কৌশলগত বাস্তবতা সবচেয়ে স্পষ্ট। যে জলপথ দিয়ে বিশ্বজ্বালানি, সার ও গ্যাসের বড় অংশ যায়, সেই পথের ওপর কোনো একক পক্ষের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ বিশ্বরাজনীতিতে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবেই। কারণ হরমুজে যা ঘটে, তার অভিঘাত শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র বা উপসাগরীয় অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ইউরোপ, এশিয়া, খাদ্যবাজার, জ্বালানি বাজার, এমনকি উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতিতেও ছড়িয়ে পড়ে।
নিরাপত্তা পরিস্থিতিও পুরোপুরি আশ্বস্ত করার মতো নয়। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর নতুন করে কোনো জাহাজে হামলার খবর পাওয়া যায়নি—এটি অবশ্যই ইতিবাচক দিক। কিন্তু তার আগে পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক ছিল, সেই চিত্র এখনো উদ্বেগ বাড়ায়। গত শনিবার থেকে মঙ্গলবারের মধ্যে তিনটি হামলার দাবি করেছে আইআরজিসি। এর একটি ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অরগানাইজেশন (আইএমও)। ১ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত ১৩টি ট্যাংকারসহ মোট ৩০টি বাণিজ্যিক জাহাজ এ অঞ্চলে হামলার শিকার হয়েছে। আইএমও, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার এবং ভ্যানগার্ড টেক এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
এই সংখ্যাগুলো বোঝায়, যুদ্ধবিরতির পর হামলা না হলেও ভয় কাটার কারণ এখনো তৈরি হয়নি। কারণ শিপিং জগতে “ঝুঁকির স্মৃতি” খুব গুরুত্বপূর্ণ। একবার কোনো রুটে হামলা, মাইন বা জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণের আশঙ্কা দেখা দিলে সেই রুটে স্বাভাবিক আস্থা ফিরে আসতে সময় লাগে। শুধু রাজনৈতিক ঘোষণা যথেষ্ট নয়; দরকার ধারাবাহিক নিরাপত্তা, স্পষ্ট নৌ-সমন্বয়, এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নিশ্চয়তা।
সব মিলিয়ে হরমুজ প্রণালির বর্তমান অবস্থা এক ধরনের অদ্ভুত মধ্যবর্তী অবস্থান। যুদ্ধ থেমেছে, কিন্তু স্বস্তি ফেরেনি। পথ খোলা, কিন্তু চলাচল স্বাভাবিক নয়। জাহাজ চলছে, কিন্তু খুব কম। হামলা বন্ধ, কিন্তু ভয় রয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, বিশ্বের জ্বালানি ও পণ্য সরবরাহব্যবস্থা এখনো এই সংকটের ছায়া থেকে বের হতে পারেনি।
সামনের দিনগুলোতে পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে, তা অনেকটাই নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর—যুদ্ধবিরতি কতটা টেকসই হয়, ইরান কী ধরনের নৌ-শর্ত বজায় রাখে, এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় নিরাপদ ও বাধাহীন চলাচল নিশ্চিতে কতটা কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। আপাতত হরমুজে সবচেয়ে বড় সত্য হচ্ছে, যুদ্ধবিরতি হয়েছে বটে, কিন্তু এই জলপথে স্বাভাবিকতার পথ এখনো অনেকটাই দূরে।

