ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে টানা ২১ ঘণ্টার উচ্চপর্যায়ের আলোচনা শেষ হয়েছে, তবে প্রত্যাশিত কোনো সমঝোতা ছাড়াই। এই দীর্ঘ বৈঠকের পর ইরান নিজেই সামনে এনেছে—কোন কোন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে ঘিরে এত দীর্ঘ আলোচনা চলেছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাঈল বাঘাই এক বিবৃতিতে জানান, পুরো দিনজুড়ে অত্যন্ত ব্যস্ত ও নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে এই আলোচনা হয়েছে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শনিবার সকাল থেকে শুরু হওয়া এই বৈঠক প্রায় বিরতিহীনভাবেই চলে। দুই পক্ষের মধ্যে বারবার বার্তা ও নথি আদান-প্রদান হয়েছে, যা থেকে বোঝা যায়—আলোচনা ছিল গভীর, কিন্তু সমাধান ছিল জটিল।
এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল পাঁচটি বড় ও সংবেদনশীল বিষয়। প্রথমত, হরমুজ প্রণালি—যা বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি পথ। এই প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা বহুদিন ধরেই বৈশ্বিক রাজনীতির একটি বড় উদ্বেগের কারণ, আর এই বৈঠকেও সেটি ছিল অন্যতম প্রধান আলোচ্য।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। এই ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। ওয়াশিংটন যেখানে ইরানের কর্মসূচি সীমিত করতে চায়, সেখানে তেহরান তাদের ‘ন্যায্য অধিকার’ হিসেবে এটিকে রক্ষা করতে চায়।
তৃতীয়ত, আলোচনায় উঠে এসেছে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণের প্রশ্ন। সাম্প্রতিক উত্তেজনা ও সংঘাতের প্রেক্ষাপটে কে কতটা ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং তার দায় কে নেবে—এই বিষয়টিও দুই পক্ষের মধ্যে বড় ধরনের মতবিরোধ তৈরি করেছে।
চতুর্থত, যুক্তরাষ্ট্রের আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে এসব নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে, তাই এই ইস্যুতে তারা স্পষ্ট অগ্রগতি চায়। তবে এই প্রশ্নেই সবচেয়ে বেশি অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
সবশেষে, ইরান ও বৃহত্তর অঞ্চলে চলমান যুদ্ধ ও উত্তেজনার সম্পূর্ণ অবসান নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এই বিষয়টি শুধু দুই দেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি জড়িত।
তবে এত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলেও ফলাফল নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে তেহরান। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার সাফল্য পুরোপুরি নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সত্যিকারের আন্তরিকতা’ ও ‘বাস্তবসম্মত অবস্থান’-এর ওপর। ইরান স্পষ্ট করে বলেছে, অতিরিক্ত দাবি ও অযৌক্তিক শর্ত থেকে সরে না এলে কোনো অগ্রগতি সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে ইসলামাবাদের এই বৈঠক দেখিয়ে দিল—আলোচনার টেবিলে বিষয় যতই স্পষ্ট হোক, সমাধানের পথ এখনো জটিল এবং দীর্ঘ। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার এই টানাপোড়েন আপাতত কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, বরং গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোতেই মতপার্থক্য আরও দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।

