১৩ এপ্রিল ২০২৬-এর ঘটনাপ্রবাহ বিশ্ব রাজনীতিকে আবারও মনে করিয়ে দিল—কিছু ভূ-রাজনৈতিক সংকট শুধু সীমান্তের মধ্যে আটকে থাকে না, তা মুহূর্তেই জ্বালানি বাজার, শেয়ারবাজার, খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন ব্যয়, এমনকি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন খরচ পর্যন্ত প্রভাবিত করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সাম্প্রতিক উত্তেজনা এখন ঠিক সেই পর্যায়েই পৌঁছেছে, যেখানে একটি সরু জলপথের প্রশ্নও বৈশ্বিক অর্থনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনায় উঠে এসেছে।
সম্প্রতি পাকিস্তানের ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত শান্তি আলোচনা কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি পুরোপুরি বন্ধ করার মার্কিন দাবি মেনে নেয়নি, এবং সেখান থেকেই আলোচনার ভাঙন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আলোচনার ব্যর্থতার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে সর্বাত্মক নৌ-অবরোধ বা ব্লকেড আরোপের ঘোষণা দেন। ঘোষণাটিকে কেবল সামরিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে ভুল হবে; এটি আসলে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের এক কঠোর কৌশল, যার মূল উদ্দেশ্য ইরানের তেল রপ্তানি থেকে আসা আয় আটকে দেওয়া এবং তাদের অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে দুর্বল করা।
কিন্তু এই সিদ্ধান্তের ধাক্কা প্রথমে লাগে বাজারে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম তাৎক্ষণিকভাবে ৮ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম ১৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়। সিএনএন জানায়, ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়, আর তার প্রভাব পড়ে বৈশ্বিক শেয়ারবাজারে। অর্থাৎ, হরমুজে উত্তেজনা এখন আর কেবল উপসাগরীয় অঞ্চলের সংকট নয়; এটি বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মুদ্রাস্ফীতির প্রশ্নে রূপ নিয়েছে।
সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার জায়গা হলো সরবরাহ। এই অবরোধ পুরোপুরি কার্যকর হলে প্রতিদিন প্রায় দুই মিলিয়ন ব্যারেল ইরানি তেল বিশ্ববাজার থেকে হারিয়ে যেতে পারে। আগে থেকেই চাপের মধ্যে থাকা বৈশ্বিক জ্বালানি ব্যবস্থার জন্য এটি হবে নতুন এক বড় ধাক্কা। জ্বালানির বাজারে সমস্যা তৈরি হলেই তার অভিঘাত ছড়িয়ে পড়ে পরিবহন, উৎপাদন, খাদ্য, সার, ওষুধ, প্যাকেজিং—প্রায় সব খাতে। ফলে হরমুজের খবর মানে শুধু তেলের খবর নয়; এটি গোটা অর্থনৈতিক শৃঙ্খলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন।
কেন হরমুজ এত গুরুত্বপূর্ণ?
হরমুজ প্রণালি ইরান ও ওমানের মধ্যবর্তী একটি কৌশলগত জলপথ, যা পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে যুক্ত করেছে। দ্য স্ট্রেইট টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, এর সবচেয়ে সরু অংশ মাত্র ২৪ মাইল, এবং দুই দিকের জাহাজ চলাচলের জন্য কার্যত দুই মাইল চওড়া নেভিগেশন লেন রয়েছে। এই অস্বাভাবিক ভৌগোলিক সংকীর্ণতাই একে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অথচ সবচেয়ে নাজুক সামুদ্রিক পথগুলোর একটি করে তুলেছে।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস এই পথ দিয়ে যেত। এর বড় অংশই যেত এশিয়ার বাজারে। নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১৩৫ থেকে ১৫০টি জাহাজ এই প্রণালি ব্যবহার করত। কিন্তু সংঘাত বাড়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে গেছে। গার্ডিয়ানের তথ্য অনুযায়ী, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত শুরুর পর মার্চ মাসে মাত্র ১৫০টির মতো জাহাজ এই পথ অতিক্রম করতে পেরেছে। আল জাজিরা জানায়, বর্তমানে হরমুজ প্রণালির পশ্চিম প্রান্তে প্রায় ৩ হাজার ২০০টি জাহাজ আটকে আছে। এই সংখ্যাটি শুধু সামরিক উত্তেজনার পরিচয় নয়; এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থার শিরা-উপশিরায় জমে থাকা চাপের প্রতীক।
‘ব্লকেড’ আসলে কী?
আন্তর্জাতিক নৌ-আইন বা ‘নিউপোর্ট ম্যানুয়াল’ অনুযায়ী, ব্লকেড হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে শত্রুপক্ষের সম্পদ, সরবরাহ বা চোরাচালান সমুদ্রে থামিয়ে দেওয়া, আটক করা বা ধ্বংস করা যায়। এর উদ্দেশ্য সরাসরি সামরিক আঘাত নয়; বরং প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া এবং যুদ্ধ পরিচালনার শক্তি ক্ষয় করা।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কোনো ব্লকেড কার্যকর হতে হলে সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করতে হয়, বাস্তবায়নের মতো সামরিক সক্ষমতা থাকতে হয় এবং নিরপেক্ষ দেশের জাহাজের ক্ষেত্রেও তা বৈষম্যহীনভাবে প্রয়োগ করতে হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সামরিক কমান্ড বা সেন্টকম জানিয়েছে, সোমবার ইস্টার্ন টাইম সকাল ১০টা থেকে এই অবরোধ কার্যকর হবে। তাদের দাবি, এটি শুধু ইরানি বন্দর ও উপকূলীয় অঞ্চলে যাতায়াতকারী জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে; নিরপেক্ষ বা অন্য দেশের বন্দরগামী জাহাজের চলাচলে বাধা দেওয়া হবে না।
তবে বাস্তবে এখানেই জটিলতা। আন্তর্জাতিক মেরিটাইম আইন বিশেষজ্ঞ জেমস ক্রাসকা নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, এই অবরোধের আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ‘পরিদর্শন ও তল্লাশি’ নীতির অধীনে জাহাজ থামিয়ে পরীক্ষা করতে পারবে। বিশ্লেষক জেনিফার পার্কারের মতে, ‘প্রাইজ ল’ ব্যবস্থার অধীনে এমনকি শত্রুর যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সাহায্যকারী নিরপেক্ষ বাণিজ্য জাহাজও আটকের ঝুঁকিতে পড়তে পারে। অর্থাৎ, কাগজে-কলমে সীমিত অবরোধের কথা বলা হলেও বাস্তবে এর পরিধি অনেক বেশি জটিল ও বিতর্কিত হতে পারে।
সামরিকভাবে এই অবরোধ কতটা বাস্তবসম্মত?
কাগজে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ, কিন্তু হরমুজের মতো ঘন জাহাজ চলাচলপূর্ণ, সংঘাতপ্রবণ এবং মাইন-ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে সেটি কার্যকর করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। সামরিক বিশ্লেষক কার্ল শুস্টারের মতে, মার্কিন নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ারগুলোতে ১০ থেকে ১৪ সদস্যের বিশেষ বোর্ডিং টিম থাকে, যারা বাণিজ্য জাহাজে উঠে নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং সেগুলোকে নির্দিষ্ট বন্দরে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া স্বভাবতই ধীর। যদি জাহাজের সংখ্যা অনেক বেশি হয়, তাহলে প্রতিটি জাহাজ থামানো, তল্লাশি করা, যাচাই করা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া—সব মিলিয়ে পুরো অভিযান অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ হয়ে দাঁড়াবে।
এই অঞ্চলে ইউএসএস ত্রিপোলি নামে একটি উন্নত মার্কিন যুদ্ধজাহাজ রয়েছে, যেখানে ৩ হাজার ৫০০ নাবিক ও মেরিন সেনা, স্টিলথ ফাইটার এবং পরিবহন উড়োজাহাজ মোতায়েন আছে। দেখলে মনে হতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে যথেষ্ট শক্তি রয়েছে। কিন্তু আসল সমস্যাটি পানির ওপরে নয়, অনেকাংশে পানির নিচে। কারণ ইরান হরমুজ প্রণালিতে বিভিন্ন ধরনের মাইন পুঁতে রেখেছে বলে মার্কিন গোয়েন্দারা দাবি করেছে—স্পাইকড কন্টাক্ট মাইন, ম্যাগনেটিক মাইন, অ্যাকোস্টিক মাইন এবং প্রেসার মাইন। এগুলো অপসারণ করা অত্যন্ত কঠিন এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র গত বছর বাহরাইন থেকে তাদের চারটি বিশেষায়িত মাইনসুইপার সরিয়ে নেয়। ফলে এখন তাদের নির্ভর করতে হচ্ছে আন্ডারওয়াটার ড্রোন, লিটোরাল কমব্যাট শিপ এবং হেলিকপ্টারের ওপর। এর মানে, সামরিক সক্ষমতা থাকলেও অপারেশনটি হবে শ্রমসাধ্য, ব্যয়বহুল এবং দীর্ঘমেয়াদি। তেলবাহী ট্যাংকারে সরাসরি হামলা না চালিয়ে জোর করে গতিপথ বদলানোর কৌশল নেওয়ার কথাও বলা হচ্ছে, কারণ সরাসরি আঘাত পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কোথায়?
সামরিক বিশেষজ্ঞদের বড় উদ্বেগ হলো—এই অবরোধ একতরফা চাপ সৃষ্টি করলেও, সেটি দ্রুত পাল্টা সংঘাতে গড়াতে পারে। ইরানের হাতে রয়েছে মাইন, ড্রোন, ছোট মিসাইলবাহী নৌকা, ক্রুজ মিসাইল এবং অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট মিসাইল। দক্ষিণ কোরিয়ার সাবেক সাবমেরিন অফিসার ইউ জিহুন এই পদক্ষেপকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ বলেছেন, কারণ এটি নতুন স্থানীয় যুদ্ধের জন্ম দিতে পারে।
ইরানের বিপ্লবী গার্ড ইতোমধ্যেই সতর্ক করেছে, অবরোধ কার্যকর করতে আসা যেকোনো সামরিক জাহাজকে তারা যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হিসেবে দেখবে এবং কঠোরভাবে প্রতিরোধ করবে। পাল্টা হুঁশিয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেছেন, মার্কিন বাহিনী বা শান্তিপূর্ণ জাহাজের ওপর গুলি চালালে আক্রমণকারীদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া হবে। এই ধরনের ভাষা সাধারণত কূটনৈতিক উত্তেজনা কমায় না; বরং ভুল হিসাব, ভুল সনাক্তকরণ এবং দ্রুত সংঘর্ষের সম্ভাবনা বাড়ায়।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররাও এই পদক্ষেপে এককাট্টা নয়। এবিসি নিউজ জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার স্পষ্ট করে বলেছেন—ব্রিটিশ বাহিনী এই ব্লকেডে অংশ নেবে না। অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজও জানিয়েছেন, তাদের এই অভিযানে ডাকা হয়নি। অর্থাৎ, ওয়াশিংটন যদি এই অভিযান চালায়ও, সেটি শক্তিশালী বহুপাক্ষিক সমর্থন ছাড়া অনেকটাই একক ঝুঁকির অভিযান হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ধাক্কা কতটা বড় হতে পারে?
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বিশ্ব কি আরেকটি বড় জ্বালানি ধাক্কার মুখে? রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মার্চে ইরান প্রতিদিন প্রায় সাড়ে ১৮ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে। এই প্রবাহ যদি থেমে যায়, তাহলে সেটি শুধু ইরানের আয় কমাবে না; বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থাতেও বড় ফাঁক তৈরি করবে। যুদ্ধ শুরুর আগে ইরানের প্রায় ১৮ কোটি ব্যারেল তেল ভাসমান জাহাজে মজুত ছিল। সেটি বাজারে আসবে কি না, কীভাবে আসবে, আর কোন রুটে আসবে—এসব প্রশ্নের ওপর এখন অনেক কিছু নির্ভর করছে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক রবিন জে. ব্রুকস বলেছেন, তেল রপ্তানি ইরানের জিডিপির প্রায় ১৫ শতাংশের সমান। তাই রপ্তানি বন্ধ হলে ইরানের অর্থনীতি বড় ধাক্কা খাবে—এটি যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলের একটি কেন্দ্রীয় লক্ষ্যও বটে। কিন্তু বিপরীত দিকও আছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের বিশ্লেষক ত্রিতা পার্সি এবিসি নিউজকে বলেছেন, ইরানের মিত্র ইয়েমেনের হুতিরা যদি বিকল্প রুট বাব এল-মান্দেব প্রণালিও অচল করে দেয়, তাহলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ থেকে ২০০ ডলারে পৌঁছাতে পারে। সেই পরিস্থিতি শুধু বাজারের অস্থিরতা নয়, একেবারে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কায় রূপ নেবে।
নিত্যপণ্য থেকে খাদ্য—সবখানে চাপ
জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণ মানুষ প্রথমে পেট্রোলপাম্পে তার প্রভাব টের পেলেও, আসল অভিঘাত আসে কিছুটা পরে। সরবরাহ ব্যবস্থা বিশেষজ্ঞ ক্যামেরন জনসনের মতে, এই সংকট দীর্ঘায়িত হলে রাসায়নিক, সার এবং প্লাস্টিক তৈরির কাঁচামালের দাম হু-হু করে বাড়বে। ডেবোরাহ এলমসের বিশ্লেষণ আরও উদ্বেগজনক—প্যাকেজিং খরচ বাড়বে, ওষুধ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, আর আগামী বছর খাদ্য উৎপাদনেও সারের মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
এখানে বিষয়টি বোঝা জরুরি: তেলের দাম বাড়া মানে শুধু গাড়ির জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়া নয়। আধুনিক অর্থনীতিতে তেল ও গ্যাস হলো পরিবহন, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ ও সরবরাহের ভিত্তি। ফলে হরমুজে উত্তেজনা যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিমা খরচ বাড়বে, শিপিং চার্জ বাড়বে, বিলম্ব বাড়বে, আর শেষ পর্যন্ত বাড়তি খরচ ভোক্তার ঘাড়েই এসে পড়বে। অর্থাৎ, উপসাগরের সামরিক উত্তেজনা খুব দ্রুত রান্নাঘরের বাজারদরেও পৌঁছে যেতে পারে।
সবচেয়ে বেশি চাপে কারা?
এই সংকটে এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে পড়তে পারে। সিএনএনের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে চীন ছিল ইরানি তেলের সবচেয়ে বড় ক্রেতা। ভারতও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ছাড়ে দীর্ঘ সাত বছর পর ইরানি তেল আমদানি পুনরায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এখন সেই পরিকল্পনা অনিশ্চয়তায় পড়েছে। অর্থাৎ, হরমুজে জট শুধু তেল সরবরাহের প্রশ্ন নয়; এটি চীন-ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্প উৎপাদন এবং মূল্যস্ফীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে।
চীন ইতোমধ্যেই হরমুজে অবাধ জাহাজ চলাচলের আহ্বান জানিয়েছে। বিশ্লেষক এডওয়ার্ড ফিশম্যান সতর্ক করে বলেছেন, যদি মার্কিন বাহিনী ভুলবশত কোনো চীনা জাহাজ আটক করে, তাহলে পরিস্থিতি সরাসরি আরও বড় শক্তির সংঘাতে গড়াতে পারে। রাশিয়াও এই অবরোধের সমালোচনা করেছে এবং বিশ্ববাজারের ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তুরস্ক ও ওমান কূটনৈতিক আলোচনার ওপর জোর দিচ্ছে। এর মানে, প্রধান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক খেলোয়াড়েরা অন্তত প্রকাশ্যে এমন একটি পরিস্থিতি চাইছে না, যেখানে হরমুজ পুরোপুরি সামরিক সংঘর্ষের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
এটি কি সত্যিকারের যুদ্ধ-প্রস্তুতি, নাকি চাপের কৌশল?
অনেক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মনে করেন, ট্রাম্পের ব্লকেড ঘোষণা সরাসরি পূর্ণাঙ্গ সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত নয়; বরং এটি ইরানকে আলোচনার টেবিলে বেশি ছাড় দিতে বাধ্য করার জন্য একটি ‘প্রেসার ট্যাকটিক’। অর্থাৎ, ঘোষণার লক্ষ্য হয়তো অবরোধ বাস্তবায়নের চেয়ে অবরোধের ভয় তৈরি করা। কিন্তু সমস্যা হলো, এ ধরনের চাপের রাজনীতি প্রায়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। কারণ প্রতিপক্ষ যদি এটিকে কৌশল নয়, সরাসরি আগ্রাসন হিসেবে ধরে নেয়, তাহলে প্রতিক্রিয়া খুব দ্রুত সামরিক হয়ে উঠতে পারে।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, আলোচনার অচলাবস্থা কাটাতে ট্রাম্প ইরানের মিসাইল কারখানায় নতুন করে বিমান হামলার কথাও বিবেচনা করছেন। যদি সেটি ঘটে, তাহলে বর্তমান নড়বড়ে যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি ভেঙে পড়তে পারে। অন্যদিকে, ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এই পদক্ষেপকে উপহাস করে বলেছেন, এর ফলে আমেরিকানদের গ্যালনপ্রতি ৪ থেকে ৫ ডলারের বেশি দাম গুনতে হবে। এই মন্তব্য কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; এটি একটি বাস্তব অর্থনৈতিক পাল্টা-বার্তাও—যে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধের মূল্য শেষ পর্যন্ত অন্য পক্ষকেও দিতে হয়।
সামনে কী হতে পারে?
এখন পরিস্থিতি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে তিনটি সম্ভাবনা সামনে রয়েছে।
প্রথমত, ব্লকেড ঘোষণাকে কৌশলগত চাপ হিসেবে ব্যবহার করে নতুন দরকষাকষির পথ খোলা হতে পারে। দ্বিতীয়ত, সীমিত সামরিক তল্লাশি ও বাধা দিয়ে উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী কিন্তু নিয়ন্ত্রিত অবস্থায় রাখা হতে পারে। তৃতীয়ত, কোনো ভুল হিসাব, ভুল সনাক্তকরণ বা পাল্টা হামলার ফলে এটি দ্রুত বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, হরমুজের সংকট কখনোই শুধু হরমুজে থাকে না। এখানে তেল আছে, গ্যাস আছে, সুপারপাওয়ারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা আছে, আঞ্চলিক প্রতিরোধ-অক্ষ আছে, বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রবাহ আছে, এবং আছে মূল্যস্ফীতিতে ভোগা বিশ্ব অর্থনীতির ভঙ্গুর বাস্তবতা। ফলে এই প্রণালির অচলাবস্থা যত দীর্ঘ হবে, তত বেশি বাড়বে বাজারের আতঙ্ক, সরবরাহের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক ঝুঁকি।
হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে বর্তমান উত্তেজনা আমাদের আবারও দেখাচ্ছে—আধুনিক বিশ্ব অর্থনীতি কতটা সংযুক্ত, এবং কতটা ভঙ্গুর। যুক্তরাষ্ট্র চাইছে অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে ইরানকে কোণঠাসা করতে। ইরান দেখাতে চাইছে, তাদের ওপর চাপ বাড়ালে সেই চাপের অভিঘাত পুরো বিশ্বকেই বইতে হবে। আর এই দুই শক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে জাহাজ, তেল, বাজার, মুদ্রাস্ফীতি, খাদ্য, বীমা, সরবরাহব্যবস্থা এবং কোটি কোটি সাধারণ মানুষ।
এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই ব্লকেড কি বাস্তবে পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হবে, নাকি এটি শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক দরকষাকষির একটি অস্ত্র হিসেবেই ব্যবহৃত হবে? উত্তর যা-ই হোক, একটি বিষয় স্পষ্ট—হরমুজে যেকোনো ভুল পদক্ষেপের মূল্য শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে নয়, বিশ্ববাজারেও গুনতে হবে।

