মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মাঝেই ইউরোপে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে একটি ঘটনা। যুক্তরাজ্য থেকে ইসরাইলের উদ্দেশে পাঠানো সামরিক সরঞ্জামের দুটি চালান জব্দ করেছে বেলজিয়াম। ঘটনাটি শুধু একটি আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্য, কূটনীতি এবং নীতিগত অবস্থানের জটিল সম্পর্ককেও সামনে নিয়ে এসেছে।
বেলজিয়াম সরকার আগেই ঘোষণা দিয়েছিল—ইসরাইলগামী কোনো সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী বিমান তাদের আকাশসীমা ব্যবহার করতে পারবে না বা সেখানে যাত্রাবিরতি করতে পারবে না। সেই নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষিতেই মার্চ মাসে যুক্তরাজ্য থেকে পাঠানো দুটি চালান লিঁয়জ বিমানবন্দরে আটকে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে বিশেষজ্ঞদের পরীক্ষা-নিরীক্ষায় দেখা যায়, ওই চালানগুলোতে ছিল ফায়ার কন্ট্রোল সিস্টেম এবং সামরিক বিমানের খুচরা যন্ত্রাংশ—যেগুলো যথাযথভাবে ঘোষণা করা হয়নি। এখানেই মূল প্রশ্নটি সামনে আসে: এগুলো কি ইচ্ছাকৃতভাবে গোপন রাখা হয়েছিল?
তদন্তে উঠে এসেছে, এই পণ্যগুলো ‘এয়ারক্রাফট কম্পোনেন্ট’ বা সাধারণ উড়োজাহাজের যন্ত্রাংশ হিসেবে রপ্তানি করা হচ্ছিল। কিন্তু বাস্তবে এগুলোর ব্যবহার ছিল সামরিক ক্ষেত্রে।
এই ধরনের কৌশল নতুন নয়। আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্যে অনেক সময় সরাসরি ‘অস্ত্র’ হিসেবে নয়, বরং ‘ডুয়াল-ইউজ’ বা দ্বৈত ব্যবহারের সরঞ্জাম হিসেবে পণ্য রপ্তানি করা হয়। এতে আইনি নজরদারি কিছুটা এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। তবে বেলজিয়ামের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ দেখাচ্ছে, ইউরোপ এখন এই ধরনের ফাঁকফোকর আরও কঠোরভাবে বন্ধ করতে চাইছে।
যদিও বেলজিয়ামের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেনি, তবে আঞ্চলিক সরকার একটি মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করেছে, যার যুক্তরাজ্যে কারখানা রয়েছে। জানা গেছে, এই প্রতিষ্ঠানটি ইসরাইলি সামরিক প্রশিক্ষণে ব্যবহৃত বিমানের যন্ত্রাংশ তৈরি করে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, তদন্তে দেখা গেছে—এর আগে একই রুট ব্যবহার করে অন্তত ১৭টি চালান ইসরাইলে পাঠানো হয়েছে। অর্থাৎ, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি ধারাবাহিক সরবরাহ ব্যবস্থার অংশ হতে পারে।
এই ঘটনায় বেলজিয়াম একটি ফৌজদারি তদন্ত শুরু করেছে। তাদের বক্তব্য স্পষ্ট—এই ধরনের চালানের জন্য ট্রানজিট লাইসেন্স প্রয়োজন ছিল, যা নেওয়া হয়নি। এমনকি আবেদন করা হলেও তা অনুমোদন দেওয়া হতো না।
অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বেলজিয়াম হয়ে ইসরাইলে সামরিক সরঞ্জাম পাঠানোর বিষয়ে তাদের কাছে কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নেই। এই অবস্থান দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক দূরত্বও তৈরি করতে পারে।
এই ঘটনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। গাজায় চলমান পরিস্থিতির কারণে ইতোমধ্যেই ইসরাইলের কাছে অস্ত্র রপ্তানি নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যও আগে কিছু লাইসেন্স স্থগিত করেছিল, যেখানে ‘আন্তর্জাতিক মানবিক আইন লঙ্ঘনের ঝুঁকি’ উল্লেখ করা হয়েছিল।
ফলে বেলজিয়ামের এই পদক্ষেপকে অনেকেই শুধু আইনি নয়, রাজনৈতিক অবস্থান হিসেবেও দেখছেন—বিশেষ করে যখন ইউরোপের ভেতরেই ইসরাইল ইস্যুতে মতভেদ বাড়ছে।
এই ঘটনাটি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। আন্তর্জাতিক অস্ত্র বাণিজ্যে স্বচ্ছতা কতটা আছে? ‘সাধারণ যন্ত্রাংশ’ নামে কত কিছুই বা গোপনে চলাচল করছে? আর সবচেয়ে বড় কথা—যুদ্ধের সময় কোন দেশ কতটা নৈতিক অবস্থান নিতে প্রস্তুত?

