হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নৌ-অবরোধ শুধু ইরানকে চাপে ফেলার কৌশল নয়, এর অভিঘাত আরও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে এশিয়ার দুই বড় শক্তি ভারত ও চীনের জন্য এই পরিস্থিতি একসঙ্গে অর্থনৈতিক, কৌশলগত ও কূটনৈতিক সংকট তৈরি করছে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, এই পদক্ষেপের লক্ষ্য কেবল তেহরান। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব গিয়ে পড়ছে সেই দেশগুলোর ওপর, যারা ইরানের জ্বালানি, আঞ্চলিক স্থিতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
এই সংকটকে বোঝার জন্য প্রথমে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে—ইরানের তেল রপ্তানির প্রায় ৯৮ শতাংশই যায় চীনে। অর্থাৎ, ইরানের ওপর যে চাপ বাড়ানো হচ্ছে, তার বড় অংশ এসে পড়ছে বেইজিংয়ের জ্বালানি হিসাবের ওপরও। আবার অন্যদিকে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যকার শীর্ষ সম্মেলনের আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। ফলে প্রশ্ন হচ্ছে, ওয়াশিংটন কি একদিকে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চাইছে, আর অন্যদিকে এমন এক পদক্ষেপ নিচ্ছে, যা সেই স্থিতিশীলতাকেই দুর্বল করে দিতে পারে? এই দ্বৈততা থেকেই বর্তমান সংকটের আসল জটিলতা শুরু।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের কথা রয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মার্কিন প্রশাসন ইঙ্গিত দিচ্ছিল, তারা এই বৈঠককে সফল করতে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখতে চায়। কিন্তু ইরান ঘিরে ‘চরম চাপ প্রয়োগের নীতি’ এবং বিশেষ করে হরমুজে নৌ-অবরোধ সেই প্রচেষ্টাকেই দুর্বল করে দিতে পারে। এশিয়া সোসাইটি পলিসি ইনস্টিটিউটের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং সাবেক মার্কিন বাণিজ্য আলোচক ওয়েন্ডি কাটলারের মন্তব্যও সেই আশঙ্কাকেই জোরালো করে—ইরান সংকট, বিশেষ করে এই নৌ-অবরোধ, যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে নস্যাৎ করে দিতে পারে।
চীনের প্রতিক্রিয়াও সে কারণেই গুরুত্ব পেয়েছে। বেইজিং এতদিন তুলনামূলক সংযত থাকলেও মঙ্গলবার তাদের সুর কঠোর হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র গুও জিয়াকুন এই পদক্ষেপকে ‘বিপজ্জনক এবং দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং সতর্ক করেছেন, এতে উত্তেজনা আরও বাড়বে। এরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হলো, ট্রাম্প যখন হুমকি দিলেন—বেইজিং যদি ইরানকে অস্ত্র সরবরাহ করে, তবে চীনা পণ্যের ওপর ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে—তখন সেটি কেবল সামরিক প্রশ্নে চাপ তৈরি করেনি, বরং বাণিজ্য সম্পর্ককেও একই সংঘাতের মধ্যে টেনে এনেছে। চীন এই অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন অপবাদ এবং বিদ্বেষমূলক যোগসূত্র’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে এবং পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছে। অর্থাৎ, বিষয়টি আর শুধু ইরানকে ঘিরে নেই; এটি এখন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কে নতুন অবিশ্বাসের উৎস হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই সংকটের সবচেয়ে সংবেদনশীল দিকটি সম্ভবত ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে। কারণ চীনের মতো বড় মজুত ও বহুমুখী সরবরাহভিত্তি ভারতের নেই। ভারতের অর্থনীতি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল। তার ওপর সাত বছরের বিরতির পর চলতি মাসের শুরুর দিকে ভারত ইরান থেকে তেল ও গ্যাস কেনা পুনরায় শুরু করে। এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল মার্কিন প্রশাসনের একটি সাময়িক ছাড়ের আওতায়, যখন তেহরানের কাছ থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিজেদের জাহাজের নিরাপদ চলাচলের নিশ্চয়তা পেয়েছিল দিল্লি। কিন্তু এখন পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ায় ভারত আবারও অনিশ্চয়তার মুখে।
মঙ্গলবার ট্রাম্পের সঙ্গে প্রায় ৪০ মিনিটের এক ফোনালাপ শেষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিয়ে দুই নেতার মধ্যে ‘ফলপ্রসূ মতবিনিময়’ হয়েছে। তিনি আরও জানিয়েছেন, ভারত যত দ্রুত সম্ভব উত্তেজনা প্রশমন ও শান্তি ফিরিয়ে আনার পক্ষে। এই বক্তব্য কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ হলেও এর ভেতরে ভারতের অস্বস্তি স্পষ্ট। দিল্লি প্রকাশ্যে ওয়াশিংটনের বিপক্ষে যেতে চায় না, আবার নিজেদের জ্বালানি নিরাপত্তাকেও অবহেলা করার সুযোগ নেই। এ কারণেই ভারত এখন এমন এক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে কূটনীতি, অর্থনীতি ও বাস্তব প্রয়োজন—তিনটিকেই একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকি উপদেষ্টা অর্পিত চতুর্বেদির মূল্যায়ন থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ভারতের জন্য বিশেষ সুবিধা দিলেও তা দিল্লির মোট জ্বালানি চাহিদা মেটানোর জন্য যথেষ্ট হবে না। তার মতে, মার্কিন নৌ-অবরোধ আরও জোরদার হলে ভারত সম্ভবত ইরান থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি বন্ধ করে দেবে। তা না হলে দিল্লি ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কে অবনতি দেখা দিতে পারে। এখানেই ভারতের সংকট সবচেয়ে স্পষ্ট—তারা হয় ইরানের জ্বালানি থেকে সরে আসবে, নয়তো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ককে ঝুঁকিতে ফেলবে। আর আপাতত ভারতের এমন কোনো ইচ্ছা নেই, যাতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক এমন এক চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখান থেকে আর ফেরা সম্ভব হবে না।
চীন ও ভারতের মধ্যে মূল পার্থক্যটি তৈরি হয়েছে প্রস্তুতির জায়গায়। চীনের হাতে বিশাল তেল মজুত আছে এবং তাদের জ্বালানি উৎসও তুলনামূলকভাবে বহুমুখী। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমুদ্রপথে থাকা ইরানের তেলের প্রায় ৯৮ শতাংশই চীনের দিকে যাচ্ছে। ইউরেশিয়া গ্রুপের ড্যান ওয়াংয়ের মতে, ট্রানজিটে থাকা তেলসহ চীনের বর্তমান মজুত ১২০ দিনের বেশি চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এমনকি ইরান থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হলেও চীন কয়লার ব্যবহার বাড়িয়ে বা অন্য দেশ থেকে তেল সংগ্রহ করে পরিস্থিতি সামলে নিতে পারবে। অর্থাৎ, চাপ আছে, কিন্তু তাৎক্ষণিক ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম।
ভারতের ছবি একেবারেই আলাদা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের কোনো মজুত সুরক্ষা নেই। জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ নিট তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় ভারত এই অবরোধের ফলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। তেলের মজুত যেখানে ৬০ দিনেরও কম, সেখানে মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ ব্যাহত হলে নয়াদিল্লিকে বড় ধরনের সংকটে পড়তে হবে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, রান্নার গ্যাস বা এলপিজির ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও নাজুক। জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ সুমেধা দাশগুপ্তের মতে, ভারতের কোনো শক্তিশালী এলপিজি রিজার্ভ নেই; আমদানি বন্ধ হলে মজুত থাকা গ্যাসে বড়জোর দুই থেকে তিন সপ্তাহ চলবে। ভারতের এলপিজি চাহিদার ৬৬ শতাংশই পূরণ হয় মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এসব পরিসংখ্যান শুধু একটি অর্থনৈতিক ঝুঁকির কথা বলে না; এগুলো দেখায়, এই সংকট দীর্ঘ হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি, পরিবহন ব্যয় এবং শিল্প উৎপাদন—সবকিছুই চাপের মুখে পড়তে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গিও গুরুত্বপূর্ণ। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট চীনকে ‘অনির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক অংশীদার’ হিসেবে অভিযুক্ত করেছেন এবং বলেছেন, বৈশ্বিক সংকট দূর করতে সাহায্য না করে বেইজিং উল্টো তেল মজুত করছে। এই বক্তব্যের ভেতরে কেবল নৈতিক অবস্থান নেই; আছে কৌশলগত বার্তাও। ওয়াশিংটন আসলে বোঝাতে চাইছে, চীন শুধু নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষক নয়, বরং এই সংকটের আর্থিক সুবিধাভোগীও হতে পারে। কিন্তু এখানেই বিপদ—যখন এক পক্ষ অন্য পক্ষের আচরণকে কেবল নিরাপত্তা নয়, রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হিসেবেও ব্যাখ্যা করতে শুরু করে, তখন সম্পর্কের ভঙ্গুর ভারসাম্য দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, আপাতত বেইজিং বা নয়াদিল্লি কেউই এমন কোনো কঠোর পাল্টা পদক্ষেপ নেবে না, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক দ্রুত অবনতি ঘটে। ড্যান ওয়াংয়ের মতে, এই নৌ-অবরোধটি একতরফা নয়; নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ইরানি তেলের সব ক্রেতার জন্যই এটি সমানভাবে প্রযোজ্য। ফলে বেইজিং বড়জোর কূটনৈতিক প্রতিবাদে সীমিত থাকতে পারে। একইভাবে ভারতও, ওয়াশিংটনের দেওয়া ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর, সম্ভবত ইরান থেকে জ্বালানি আমদানি বন্ধ করে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া এবং অন্যান্য সরবরাহকারীর দিকে ঝুঁকবে। চতুর্বেদির ভাষ্য অনুযায়ী, মোদি সম্ভবত ট্রাম্পের টেনে দেওয়া কোনো রেড লাইন অতিক্রম করবেন না। এই হিসাব-নিকাশ থেকে বোঝা যায়, উভয় দেশই আপাতত সংঘাত নয়, ক্ষয়ক্ষতি কমানোর পথ বেছে নিতে চাইছে।
কিন্তু আন্তর্জাতিক সংকটে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি অনেক সময় পরিকল্পিত সিদ্ধান্তে নয়, বরং অনিচ্ছাকৃত ভুল পদক্ষেপে তৈরি হয়। প্রতিবেদনটি সেখানেই সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা দিয়েছে। সমুদ্রে যেকোনো ভুল হিসাব, ভুল সংকেত বা সরাসরি সংঘাত পরিস্থিতিকে মুহূর্তেই নাটকীয় মোড় দিতে পারে। ইউরেশিয়া গ্রুপের চীনবিষয়ক প্রধান ডেভিড মিলের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি চীনের কোনো জাহাজ পথরোধ বা আটক করে, তবে সেটি বড় সংঘাতের জন্ম দেবে। কারণ এমন পরিস্থিতিতে চীন যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোকেই নিজেদের সম্মানের লড়াই হিসেবে দেখবে। তখন আর বিষয়টি তেল, শুল্ক বা কূটনৈতিক বক্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; এটি দুই শক্তির সম্পর্ককে সম্পূর্ণ নতুন, আরও সংঘাতময় পর্যায়ে ঠেলে দিতে পারে।
সব মিলিয়ে হরমুজকে ঘিরে তৈরি হওয়া এই উত্তেজনা তিনটি স্তরে গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, এটি দেখাচ্ছে জ্বালানি নিরাপত্তা এখনো বৈশ্বিক কূটনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়। দ্বিতীয়ত, যুক্তরাষ্ট্রের ইরান নীতি কেবল মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই; তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে এশিয়ার দুই প্রধান অর্থনীতির ওপর। তৃতীয়ত, ভারত ও চীনের প্রতিক্রিয়ার পার্থক্য প্রমাণ করছে—জ্বালানি মজুত, সরবরাহ বৈচিত্র্য এবং কৌশলগত প্রস্তুতি আজকের বিশ্বে শুধু অর্থনৈতিক শক্তির প্রশ্ন নয়, বরং রাজনৈতিক স্থিতিরও নির্ধারক। হরমুজ প্রণালির এই টানাপোড়েন তাই শুধু একটি সামুদ্রিক উত্তেজনা নয়; এটি বড় শক্তিগুলোর পারস্পরিক নির্ভরতা, সন্দেহ এবং সীমাবদ্ধতার নগ্ন প্রকাশ। আর সেই কারণেই এই সংকটকে কেবল ইরান বনাম যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে দেখলে পুরো ছবিটিই ধরা পড়বে না। আসল গল্পটি হচ্ছে—একটি অবরোধ কীভাবে একই সঙ্গে জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক কূটনীতি এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যকে নাড়িয়ে দিতে পারে।

