মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই বদলে যাচ্ছে ইউরোপের ভেতরের রাজনৈতিক ভাষা, কূটনৈতিক অবস্থান এবং নৈতিক বিতর্কের তীব্রতা। সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন স্পেন। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ প্রকাশ্যে বলেছেন, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে ইসরায়েলের সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহযোগিতা চুক্তি বাতিল বা অন্তত তা থেকে সরে আসার বিষয়টি সামনে আনা জরুরি।
এই বক্তব্য কেবল আরেকটি রাজনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি ইউরোপীয় কূটনীতির ভিতরে জমে ওঠা ক্ষোভ, নৈতিক অস্বস্তি এবং নীতিগত টানাপোড়েনের স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ। বিশেষ করে গাজায় যুদ্ধ, লেবানন ও সিরিয়ায় হামলা, ইয়েমেনে আক্রমণ এবং সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরুর প্রেক্ষাপটে স্পেনের এই অবস্থান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
কেন এখন এত সরব স্পেন
সাম্প্রতিক সময়ে সবচেয়ে বেশি সামরিক উত্তেজনা ও সংঘাতের সঙ্গে জড়িত রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইসরায়েলের নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। গাজায় যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে বহুদিন ধরেই তীব্র সমালোচনা হচ্ছে। স্পেন সেই সমালোচনাকে শুধু মৌখিক পর্যায়ে রাখেনি, বরং ধীরে ধীরে তা নীতিগত অবস্থানে রূপ দিয়েছে।
আন্দালুসিয়ায় এক রাজনৈতিক সমাবেশে পেদ্রো সানচেজ ঘোষণা করেন, মঙ্গলবার স্পেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে একটি প্রস্তাব দেবে, যাতে ইসরায়েলের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তি থেকে সরে আসার আহ্বান থাকবে। তার বক্তব্যের মূল কথা ছিল স্পষ্ট: যে রাষ্ট্র আন্তর্জাতিক আইন মানে না, মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতা দেখায় না, সে ইউরোপীয় অংশীদারিত্বের নৈতিক ভিত্তি হারায়।
এই কথার ভেতরে কেবল রাজনৈতিক অসন্তোষ নেই; আছে একটি বড় বার্তা। স্পেন বলতে চাচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন যদি নিজেকে মানবাধিকার, আইন এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়ানো একটি জোট হিসেবে তুলে ধরতে চায়, তাহলে তাকে তার অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করতে হবে।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর সম্পর্কের মোড়
ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত নতুন করে বিস্ফোরিত হয় ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর, যখন হামাস ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে হামলা চালায়। এর জবাবে গাজায় ইসরায়েলের বড় পরিসরের সামরিক অভিযান শুরু হয়। সেই সময় থেকে গাজায় বিপুল সংখ্যক বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির খবর বিশ্বজুড়ে ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে।
এই পর্যায় থেকেই মাদ্রিদ ক্রমশ আরও কঠোর অবস্থান নিতে শুরু করে। স্পেনের সরকার শুধু গাজা নয়, প্রতিবেশী লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক তৎপরতারও কঠোর সমালোচনা করে। এর ফলে তেলআবিব ও মাদ্রিদের সম্পর্ক দ্রুত শীতল হয়ে পড়ে। জবাবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু স্পেনের বিরুদ্ধে ‘ভণ্ডামি’ ও ‘শত্রুতার’ অভিযোগও তোলেন।
অর্থাৎ বিরোধ এখন আর কেবল নীতিগত নয়; এটি রাজনৈতিক ভাষা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক মিত্রতার দিক থেকেও একটি খোলামেলা দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে।
সহযোগিতা চুক্তি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ
ইসরায়েল ২০০০ সালের জুনে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতা চুক্তিতে সই করে। এই চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিভিন্ন ধরনের সহযোগিতার একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে ওঠে।
কিন্তু এই চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি ছিল মানবাধিকারের প্রতি সম্মান। অর্থাৎ এটি শুধু অর্থনৈতিক বা কৌশলগত সম্পর্কের দলিল নয়; এর মধ্যে মূল্যবোধের শর্তও রয়েছে। স্পেন এখন মূলত সেই জায়গাটিকেই সামনে আনছে। তাদের বক্তব্য হলো, যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ এতটাই প্রবল হয় যে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উদ্বেগের বিষয় হয়ে ওঠে, তাহলে এই চুক্তির নৈতিক ও আইনি ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে।
এ কারণেই স্পেনের দাবি কেবল আবেগপ্রসূত নয়; বরং তারা এমন একটি চুক্তির দিকেই আঙুল তুলছে, যার ভেতরেই দায়বদ্ধতার ভাষা আগে থেকেই লেখা আছে।
২০২৪ সালেই শুরু হয়েছিল চাপ
এই অবস্থান হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০২৪ সালে স্পেন ও আয়ারল্যান্ড দাবি করে, ইসরায়েল চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করেছে। সে কারণেই ওই দুই দেশ চুক্তিটি পুনর্বিবেচনার অনুরোধ জানায়। পরে এই প্রশ্নে স্লোভেনিয়াও স্পেনের পাশে এসে দাঁড়ায়।
একই বছরে স্পেন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। পূর্ব জেরুজালেমকে রাজধানী ধরে ফিলিস্তিনকে এই স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা ইসরায়েলের কাছে অত্যন্ত অস্বস্তিকর বার্তা ছিল। কিন্তু তাতেও স্পেন পিছু হটেনি। বরং বোঝা যায়, সানচেজ সরকার এই প্রশ্নে ধাপে ধাপে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে।
ইসরায়েলের পাল্টা প্রতিক্রিয়া
স্পেনের অবস্থানে ইসরায়েলের অসন্তোষ প্রকাশ্যে এসেছে। সানচেজের সাম্প্রতিক ভাষণের পর ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদেওন সাআর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্প্যানিশ ভাষায় ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া জানান।
তিনি অভিযোগ করেন, তাদের দেশ এমন কারও কাছ থেকে ভণ্ডামির ভাষণ শুনতে চায় না, যিনি নিজেই স্বৈরাচারী শাসকদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি তুরস্ক ও ভেনেজুয়েলার সাবেক নেতা নিকোলাস মাদুরোর প্রসঙ্গ তোলেন।
এই পাল্টা আক্রমণ থেকে বোঝা যায়, বিষয়টি এখন কেবল নীতি ও মানবাধিকারের বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি আন্তর্জাতিক কূটনীতির ভাষা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও সংঘর্ষে রূপ নিচ্ছে।
স্পেনের পদক্ষেপ শুধু কথায় সীমাবদ্ধ নয়
পেদ্রো সানচেজের রাজনৈতিক অবস্থানকে অনেকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছেন আরেকটি কারণে: তিনি শুধু বিবৃতি দেননি, কিছু বাস্তব পদক্ষেপও নিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে মাদ্রিদ ইসরায়েল থেকে অস্ত্র আমদানি-রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ রেখেছে।
এর পাশাপাশি গাজার যুদ্ধের প্রতিবাদে আরও নয়টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- ইসরায়েলি সেনাদের ব্যবহারের জন্য তেল বহনকারী কোনো জাহাজকে স্পেনের বন্দরে ভিড়তে না দেওয়া,
- স্পেনের আকাশসীমা দিয়ে ইসরায়েলি সেনাদের জন্য অস্ত্র পরিবহন নিষিদ্ধ করা,
- অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অবৈধভাবে বসতি স্থাপনকারী ইসরায়েলিদের কাছ থেকে কোনো পণ্য আমদানি না করা।
এই পদক্ষেপগুলো দেখায়, স্পেন কেবল প্রতীকী প্রতিবাদ করছে না; বরং তাদের কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থানকে বাস্তব নীতিতে রূপ দিচ্ছে। ইউরোপীয় রাজনীতিতে এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অধিকাংশ দেশ দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েল প্রশ্নে সতর্ক, দ্বিধাগ্রস্ত বা নীরব অবস্থান নিয়েছে।
২১ এপ্রিলের বৈঠক কেন গুরুত্বপূর্ণ
আগামী ২১ এপ্রিল লুক্সেমবার্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা একটি বিশেষ বৈঠকে বসবেন। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও স্লোভেনিয়া ইতিমধ্যে ইউরোপীয় কমিশনকে চিঠি দিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি পর্যালোচনার প্রস্তাব জানিয়েছে।
এই বৈঠক তাই নিছক আনুষ্ঠানিক নয়। এখানে তিনটি বড় প্রশ্ন সামনে আসতে পারে—
প্রথমত, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কি মানবাধিকার প্রশ্নে একই মানদণ্ড সব ক্ষেত্রে প্রয়োগ করবে?
দ্বিতীয়ত, ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতির চেয়ে নৈতিকতা কতখানি গুরুত্ব পাবে?
তৃতীয়ত, স্পেনের মতো দেশগুলোর উদ্যোগ কি ইইউর সামগ্রিক নীতি বদলাতে পারবে, নাকি তা কেবল প্রতীকী চাপ হিসেবেই থেকে যাবে?
ইউরোপের নীরবতার বিরুদ্ধে স্পেনের অবস্থান
এই মুহূর্তে স্পেনের ভূমিকাকে অনেকে ব্যতিক্রমী বলছেন। কারণ ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ বছরের পর বছর ধরে ইসরায়েলি আগ্রাসনকে কার্যত নীরবে মেনে নিয়েছে—এমন অভিযোগ বহুদিনের। সেই জায়গা থেকে সানচেজের অবস্থান আলাদা। তিনি একদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক অবস্থান নিচ্ছেন, অন্যদিকে ইইউর অভ্যন্তরে প্রাতিষ্ঠানিক চাপে রূপ দিতে চাইছেন।
এখানে একটি বিষয় লক্ষণীয়: স্পেনের এই কূটনীতি শুধু মধ্যপ্রাচ্য নীতির প্রশ্ন নয়, এটি ইউরোপের নিজস্ব আত্মপরিচয়ের প্রশ্নও। ইউরোপ যদি নিজেকে নিয়মভিত্তিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার রক্ষক হিসেবে তুলে ধরে, তাহলে তার অংশীদারিত্ব নীতির ভেতরেও সেই একই নীতি প্রতিফলিত হওয়া দরকার। স্পেন ঠিক এই ভণ্ডামির জায়গাটিকেই প্রকাশ্যে নিয়ে আসছে।
নেতানিয়াহুর অভিযোগ ও বাস্তবতার টানাপোড়েন
চলতি মাসে নেতানিয়াহু অভিযোগ করেন, স্পেন তার দেশের বিরুদ্ধে ‘নেতিবাচক কূটনৈতিক প্রচারণা’ চালাচ্ছে। এই অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে ইসরায়েল বোঝাতে চাইছে যে স্পেনের অবস্থান নিরপেক্ষ নয়, বরং শত্রুতাপূর্ণ।
কিন্তু স্পেনের দিক থেকে যুক্তি হচ্ছে, যখন কোনো রাষ্ট্রের সামরিক কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে, তখন নীরব থাকা নিজেই এক ধরনের রাজনৈতিক অবস্থান। সুতরাং স্পেন নিজেদের সমালোচনাকে প্রচারণা নয়, বরং নীতিগত দায়বদ্ধতা হিসেবে তুলে ধরছে।
স্পেন কি ইউরোপের পথ বদলাতে পারবে
এই প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। কারণ ইউরোপীয় ইউনিয়ন একটি জটিল রাজনৈতিক জোট, যেখানে সদস্যরাষ্ট্রগুলোর অবস্থান এক নয়। অনেক দেশ কৌশলগত কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। আবার কেউ কেউ মানবাধিকার প্রশ্নে তুলনামূলক কঠোর অবস্থানে যেতে আগ্রহী।
তবে স্পেনের এই পদক্ষেপ অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করেছে: ইসরায়েলকে ঘিরে ইউরোপের ভেতরের দ্বিধা আর আগের মতো চাপা নেই। এখন খোলাখুলি বিতর্ক হচ্ছে—কোন রাষ্ট্রকে কোন মানদণ্ডে বিচার করা হবে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠলে ইইউ কী করবে, আর মানবাধিকারের ভাষা কি কেবল কাগজে থাকবে, নাকি বাস্তব কূটনীতিতেও তার প্রভাব পড়বে।
পেদ্রো সানচেজের সাম্প্রতিক অবস্থান মধ্যপ্রাচ্য সংকটের এক নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি শুধু ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সমালোচনা করেননি; বরং ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভেতরেই একটি বড় নীতিগত প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন। ২০০০ সালের জুনে হওয়া সহযোগিতা চুক্তি, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর-এর পর বদলে যাওয়া যুদ্ধ বাস্তবতা, ২০২৪ সালে চুক্তি পুনর্বিবেচনার দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান, এবং সামনে ২১ এপ্রিল-এর বৈঠক—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন ইউরোপীয় কূটনীতির কেন্দ্রীয় আলোচনায় উঠে এসেছে।
স্পেনের এই অবস্থান শেষ পর্যন্ত ইইউর নীতি বদলাবে কি না, তা সময়ই বলবে। তবে এটুকু স্পষ্ট, মাদ্রিদ এখন এমন এক প্রশ্ন তুলেছে, যা ইউরোপ আর সহজে এড়িয়ে যেতে পারবে না।

