দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের অবিচল সমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ইসরায়েল এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। দেশটির এক শীর্ষ নিরাপত্তা বিশ্লেষণ সংস্থা সতর্ক করেছে, মার্কিন জনমতে দ্রুত পরিবর্তন ইসরায়েলের জন্য বড় ধরনের কৌশলগত ঝুঁকি তৈরি করছে, যা ভবিষ্যতে আর্থিক ও সামরিক সহায়তা হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
ইসরায়েলভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের প্রতি জনসমর্থন দ্রুত কমছে। এই পরিবর্তন যদি থামানো না যায়, তাহলে ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদী সমর্থন ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী প্রায় ৬০ শতাংশ মার্কিন প্রাপ্তবয়স্ক এখন ইসরায়েলকে নেতিবাচকভাবে দেখেন, যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি। বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে এই বিরূপ মনোভাব আরও তীব্র—১৮ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে প্রায় ৭৫ শতাংশ ইসরায়েল সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন।
রাজনৈতিক বিভাজনের দিক থেকেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। ডেমোক্র্যাটদের বড় একটি অংশ এবং রিপাবলিকানদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যাও এখন ইসরায়েলের বর্তমান নীতির সমালোচক। এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীর মধ্যেও সমর্থন কমতে শুরু করেছে।
এই পরিবর্তনের পেছনে বড় কারণ হিসেবে গাজায় চলমান পরিস্থিতি এবং ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনাকে দায়ী করা হচ্ছে। অনেক মার্কিন নাগরিক ও রাজনীতিবিদ মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু-এর নেতৃত্বে গৃহীত সিদ্ধান্তগুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি সম্প্রদায়ের মধ্যেও মতভেদ স্পষ্ট হচ্ছে। একটি জরিপে দেখা গেছে, উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মার্কিন ইহুদি এখন ইসরায়েলকে শর্তহীন সহায়তা দেওয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৮ সাল থেকে ইসরায়েলকে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে। এই দীর্ঘমেয়াদী সমর্থন ইসরায়েলের নিরাপত্তা কাঠামোর অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ছে।
যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন কংগ্রেসে ইসরায়েলের জন্য অস্ত্র বিক্রি বন্ধের প্রস্তাব পাস হয়নি, তবুও বিপুল সংখ্যক আইনপ্রণেতার বিরোধিতা ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, ইসরায়েলের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এখন সামরিক নয়—বরং কূটনৈতিক ও জনমতের লড়াই। যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী মিত্রের জনসমর্থন কমে গেলে, তা সরাসরি নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ইসরায়েল তার বর্তমান নীতিতে পরিবর্তন না আনে, তাহলে এই নেতিবাচক ভাবমূর্তি দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী হয়ে যেতে পারে। আর সেটি হলে শুধু অর্থনৈতিক সহায়তাই নয়, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও দেশটির অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে, এটি শুধু জনমতের পরিবর্তন নয়—বরং ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

