ইরানকে কেন্দ্র করে নতুন জ্বালানি সংকট ইউরোপকে আবারও কঠিন বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছে। ৬ মে ২০২৬ তারিখে ড্যানিয়েল গ্রোসের বিশ্লেষণে যে মূল প্রশ্নটি উঠে এসেছে, তা শুধু জ্বালানির দাম নিয়ে নয়; বরং ইউরোপ ভবিষ্যতে কোন পথে হাঁটবে, সেই প্রশ্নও এর সঙ্গে জড়িত। তেলের দামের ধাক্কা সাময়িকভাবে ভোক্তাদের কষ্ট বাড়ালেও, এটি ইউরোপের জন্য সবুজ জ্বালানির দিকে দ্রুত এগোনোর বড় সুযোগ হতে পারত। কিন্তু বাস্তবে বহু সরকার সেই সুযোগ কাজে লাগানোর বদলে জ্বালানি কর কমিয়ে স্বল্পমেয়াদি জনপ্রিয়তার পথে হাঁটছে।
ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার পর বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় অস্থিরতা তৈরি হয়। চলতি মাসের শুরুতে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় $১১৫ প্রতি ব্যারেলে পৌঁছে যায়। এই মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর ওপর। তবে উচ্চ আয়ের ইউরোপও এর বাইরে নয়। শিল্প, পরিবহন, গৃহস্থালি ব্যয়—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি খরচ বাড়ার প্রভাব পড়ছে। ফলে সাধারণ মানুষ যেমন ব্যয় বৃদ্ধিতে ক্ষুব্ধ, তেমনি সরকারগুলোও রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়েছে।
কিন্তু এখানেই নীতিগত প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তেলের দাম বাড়লে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি আরও স্পষ্ট হয়। একই সঙ্গে নবায়নযোগ্য জ্বালানি তুলনামূলকভাবে বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সংকটটি ইউরোপকে বুঝিয়ে দিচ্ছে, বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরতা কমানো শুধু পরিবেশগত প্রয়োজন নয়; এটি অর্থনৈতিক নিরাপত্তারও প্রশ্ন। তবু ইউরোপের অনেক সরকার দীর্ঘমেয়াদি নীতি শক্তিশালী করার বদলে জ্বালানির কর কমিয়ে দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে।
এই নীতি দেখতে জনপ্রিয় মনে হলেও এর বড় সমস্যা আছে। জ্বালানির কর কমালে সাধারণ মানুষ তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেতে পারে, কিন্তু এতে জ্বালানি ব্যবহার কমানোর প্রণোদনা দুর্বল হয়। মানুষ যখন কম দামে জ্বালানি পায়, তখন গাড়ি ব্যবহার বা জ্বালানি সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে আচরণগত পরিবর্তন কম হয়। ফলে আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির চাহিদা থেকে যায়, কার্বন নিঃসরণও কমে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি ইউরোপের সবুজ রূপান্তরকে ধীর করে দেয়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলও এমন কর ছাড়ের পথকে মৌলিকভাবে দুর্বল বলে মনে করেছে। ইউরোপে পাম্পে জ্বালানির যে দাম দেখা যায়, তার বড় অংশই করের কারণে তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি কর মোট দামের অর্ধেক পর্যন্ত হতে পারে। তাই বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম যতটা বেড়েছে, ইউরোপের পাম্পে দাম ততটা বাড়েনি। উদাহরণ হিসেবে জার্মানির কথা বলা যায়। সেখানে জানুয়ারিতে সীসামুক্ত জ্বালানির দাম ছিল প্রায় €১.৮০ বা $২.১১ প্রতি লিটার। এপ্রিলে তা বেড়ে €২.২০ হয়। অর্থাৎ বৃদ্ধি ছিল ২৫%–এর কম। একই সময়ে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় $৬০ থেকে $১১০–এর বেশি হয়ে ৮০%–এর বেশি বেড়েছে।
এখানে আরেকটি বড় সামাজিক সমস্যা আছে। জ্বালানি কর কমানো সাধারণত ধনীদের বেশি সুবিধা দেয়। উচ্চ আয়ের পরিবারগুলো বেশি গাড়ি চালায়, বড় গাড়ি ব্যবহার করে এবং জ্বালানি ব্যয় তাদের মোট আয়ের তুলনায় কম চাপ তৈরি করে। তাই কর ছাড়ের বড় অংশ তাদের কাছেই যায়। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো হয়তো গাড়ি কম ব্যবহার করে, কিন্তু খাদ্য, বাসস্থান ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচের চাপ তাদের ওপর বেশি পড়ে। ফলে সবার নামে দেওয়া জ্বালানি সহায়তা বাস্তবে সমানভাবে ন্যায্য হয় না।
তবু রাজনীতির বাস্তবতা সরকারকে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে। পাম্পে জ্বালানির দাম মানুষ প্রতিদিন চোখে দেখে। কিন্তু জ্বালানির কারণে গরমের বিল বা অন্যান্য খরচ বাড়ার প্রভাব অনেক সময় পরে আসে এবং তা ধীরে ধীরে ছড়ায়। ফলে পাম্পের দাম রাজনৈতিক ক্ষোভের তাৎক্ষণিক প্রতীক হয়ে ওঠে। জার্মান সরকার তাই দাম €২ প্রতি লিটারের নিচে রাখার চেষ্টা করেছে। কারণ এই সীমাটি মনস্তাত্ত্বিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ; এর ওপরে দাম গেলে জনরোষ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। ইউরোপের অন্য দেশগুলোও একই ধরনের কর ছাড় দিয়েছে বা দেওয়ার কথা ভাবছে।
কিছু সরকার বিদ্যুৎ উৎপাদনের ওপর কর কমানোর পথেও হাঁটছে। স্পেনের মতো দেশে এমন পদক্ষেপ দেখা গেছে। কিন্তু এটিও একইভাবে সমস্যাজনক। বিদ্যুৎ সস্তা করলে ব্যবহার বাড়তে পারে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির সক্ষমতা এখনো সীমিত হওয়ায় অতিরিক্ত চাহিদা পূরণে আবারও জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি বাড়তে পারে। এতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমার বদলে বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও এর প্রভাব সীমিত হতে পারে।
নীতিগত অসংগতি এখানেই সবচেয়ে স্পষ্ট। একই সরকার একদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির জন্য ভর্তুকি দিচ্ছে, অন্যদিকে জ্বালানি কর কমিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারকে তুলনামূলকভাবে সস্তা রাখছে। জার্মানি এ বছর বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির ভর্তুকির জন্য €৩ বিলিয়ন বরাদ্দ করেছে। একই সঙ্গে জ্বালানি কর কমানোর জন্য €১.৬ বিলিয়ন রাজস্ব ছাড় দিয়েছে। কিন্তু এই কর ছাড় সরাসরি বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি কেনার প্রণোদনা কমিয়ে দেয়। অর্থাৎ সরকার এক হাতে সবুজ প্রযুক্তিকে উৎসাহ দিচ্ছে, আরেক হাতে সেই উৎসাহকে দুর্বল করছে।
তবে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ছাদের সৌরবিদ্যুতের ভর্তুকিও সবসময় সবচেয়ে কার্যকর সমাধান নয়। এগুলোতে প্রতি ইউনিট নিঃসরণ কমাতে বড় সরকারি ব্যয় প্রয়োজন হয়। আবার এগুলোও অনেক সময় ধনী পরিবারকে বেশি সুবিধা দেয়। কারণ উচ্চ আয়ের মানুষ বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি কিনতে বেশি সক্ষম এবং নিজস্ব বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ বসানোর সুযোগও তাদের বেশি থাকে। ভাড়াটিয়া বা নিম্ন আয়ের পরিবার এসব সুবিধা সহজে পায় না।
সরকারি ভর্তুকির আরেকটি ঝুঁকি হলো রাষ্ট্রীয় অর্থভাণ্ডার দুর্বল হয়ে পড়া। ভালো সময়ে বেশি ঋণ টেকসই মনে হতে পারে। কিন্তু সংকট এলে পরিস্থিতি পাল্টে যায়। ঝুঁকি বাড়লে ঋণ পুনঃঅর্থায়নের খরচ দ্রুত বাড়ে। তখন সরকারকে ব্যয় কমাতে হয় ঠিক সেই সময়, যখন অর্থনৈতিক সহায়তা সবচেয়ে বেশি দরকার। তাই অকার্যকর ভর্তুকি শুধু পরিবেশ নীতিকে দুর্বল করে না, ভবিষ্যৎ সংকট মোকাবিলার সক্ষমতাও কমিয়ে দেয়।
ড্যানিয়েল গ্রোসের যুক্তি অনুযায়ী, ইউরোপের উচিত কর ছাড় ও ভর্তুকির বদলে ইউরোপীয় নিঃসরণ বাণিজ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। এই ব্যবস্থা দূষণকারী কার্যক্রমকে ব্যয়বহুল করে এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর অর্থনৈতিক প্রণোদনা তৈরি করে। এর বড় সুবিধা হলো, এটি সরকারকে বিপুল ব্যয় চাপায় না; বরং রাজস্ব তৈরি করতে পারে। সেই রাজস্ব দরিদ্র পরিবারকে সহায়তা দিতে ব্যবহার করা সম্ভব। ফলে জ্বালানি রূপান্তর শুধু দ্রুত নয়, ন্যায্যও হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে এই ব্যবস্থাও দুর্বল করা হয়েছে। শিল্প খাতের চাপের মুখে ইউরোপীয় কমিশন অনেক বিনামূল্যের নিঃসরণ অনুমতি বজায় রেখেছে। এর ফলে যারা বেশি দূষণ করে, তাদের ওপর চাপ কম থাকে। পাশাপাশি এই ব্যবস্থার বিস্তৃত সংস্করণ, যা ভবন ও সড়ক পরিবহনের মতো খাতকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা, সেটিও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। এটি আগামী বছরের বদলে এখন ২০২৮ সালে পুরোপুরি চালু হওয়ার কথা।
এখানে ইউরোপের জন্য মূল শিক্ষা হলো, সংকটের সময় শুধু দাম কমানোই সমাধান নয়। বরং এমন নীতি দরকার, যা একদিকে জ্বালানি ব্যবহারকে দায়িত্বশীল করে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলে। জ্বালানি কর কমালে আজ কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়, কিন্তু আগামী সংকটের জন্য ইউরোপ আরও অরক্ষিত থেকে যায়। বিপরীতে শক্তিশালী নিঃসরণ বাণিজ্য ব্যবস্থা, লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা এবং সবুজ বিনিয়োগ ইউরোপকে দীর্ঘমেয়াদে বেশি নিরাপদ করতে পারে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জ্বালানি সংকটকে শুধু ভোক্তার বিলের সমস্যা হিসেবে দেখা যাবে না। এটি ভূরাজনীতি, অর্থনীতি, পরিবেশ এবং সামাজিক ন্যায্যতার মিলিত সংকট। বিদেশি তেলের ওপর নির্ভরতা যত বেশি থাকবে, ইউরোপ তত বেশি বহিরাগত সংঘাত ও বাজারের অস্থিরতার কাছে জিম্মি হয়ে থাকবে। তাই আজকের সামান্য বেশি জ্বালানি দাম যদি ভবিষ্যতের বড় ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে, তাহলে সেটিকে শুধু বোঝা হিসেবে নয়, বিনিয়োগ হিসেবেও দেখতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউরোপের সামনে দুটি পথ আছে। প্রথম পথ হলো রাজনৈতিক চাপ সামাল দিতে কর ছাড় দিয়ে সাময়িক স্বস্তি দেওয়া। দ্বিতীয় পথ হলো সংকটকে কাজে লাগিয়ে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা কমানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং দরিদ্র পরিবারকে সরাসরি সহায়তা দেওয়া। প্রথমটি জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্তু দুর্বল। দ্বিতীয়টি কঠিন, কিন্তু ভবিষ্যৎমুখী। ইউরোপ যদি সত্যিই জ্বালানি নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতি ও জলবায়ু লক্ষ্য একসঙ্গে অর্জন করতে চায়, তাহলে দ্বিতীয় পথই বেশি যুক্তিযুক্ত।

