বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে উত্তর কোরিয়ার এক সাংবিধানিক সিদ্ধান্তকে ঘিরে। দেশটি ঘোষণা দিয়েছে, সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনকে হত্যা করা হলে কোনো আলাদা নির্দেশ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারমাণবিক হামলা চালাবে তাদের সামরিক বাহিনী।
এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারণ, এমন নীতি কার্যকর হলে ভবিষ্যতে কোনো ভুল বোঝাবুঝি, প্রযুক্তিগত ত্রুটি কিংবা আকস্মিক সংঘাত থেকেও বড় ধরনের পারমাণবিক বিপর্যয় শুরু হতে পারে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি উত্তর কোরিয়া তাদের সংবিধানে গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী এনে এই নীতি যুক্ত করেছে। নতুন সংশোধনী অনুযায়ী, দেশের পারমাণবিক কমান্ড ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেলে কিংবা শীর্ষ নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত দেওয়ার অবস্থায় না থাকলে আগে থেকেই নির্ধারিত লক্ষ্যবস্তুতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারমাণবিক হামলা চালানো হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি মূলত “প্রতিশোধমূলক নিশ্চিত হামলা” নীতির আরও কঠোর সংস্করণ। অর্থাৎ, কিম জং উনের মৃত্যু বা নেতৃত্বব্যবস্থার পতন ঘটলেও উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক প্রতিক্রিয়া থেমে থাকবে না— এমন বার্তা বিশ্বকে দিতে চাইছে পিয়ংইয়ং।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরুতে তেহরানে মার্কিন-ইসরাইলি যৌথ অভিযানে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর থেকেই উত্তর কোরিয়া নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করে। সেই ঘটনাকে নিজেদের জন্য সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছেন কিম জং উন।
গত ২২ মার্চ পিয়ংইয়ংয়ে অনুষ্ঠিত সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলির অধিবেশনে এই সাংবিধানিক সংশোধনী অনুমোদন করা হয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা বিষয়টি সিউলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অবহিত করে।
সংশোধিত সংবিধানে বলা হয়েছে, “বৈরী শক্তির আক্রমণে রাষ্ট্রের পারমাণবিক বাহিনীর কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিপন্ন হলে তাৎক্ষণিক ও স্বয়ংক্রিয় পারমাণবিক হামলা চালানো হবে।”
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, উত্তর কোরিয়া এখন এমন একটি সামরিক কাঠামো গড়ে তুলতে চাইছে যেখানে শীর্ষ নেতৃত্ব অনুপস্থিত থাকলেও পারমাণবিক প্রতিশোধ কার্যকর হবে।
এর আগেও পিয়ংইয়ং দক্ষিণ কোরিয়াকে “প্রধান শত্রু রাষ্ট্র” হিসেবে ঘোষণা দিয়ে সংবিধান থেকে পুনরেকত্রীকরণের ধারণা বাদ দেয়। কিম জং উন স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এখন দুইটি পৃথক ও শত্রুভাবাপন্ন রাষ্ট্র।
গত মাসেও এক ভাষণে কিম দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা আরও বাড়ানোর অঙ্গীকার করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে “রাষ্ট্রীয় আগ্রাসন” ও “চাপ প্রয়োগের রাজনীতি”র অভিযোগ তুলে তিনি সতর্ক করেন, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের বিরোধিতায় উত্তর কোরিয়া আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তর কোরিয়ার এই নতুন নীতি শুধু পূর্ব এশিয়াতেই নয়, পুরো বিশ্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করল। কারণ, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সিদ্ধান্ত সাধারণত রাজনৈতিক নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু সেটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার হাতে চলে গেলে ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, কোনো সাইবার হামলা, ভুল তথ্য, প্রযুক্তিগত বিভ্রাট কিংবা সীমান্ত উত্তেজনাও ভবিষ্যতে ভয়াবহ সংঘাতের সূচনা করতে পারে। আর সেই কারণেই উত্তর কোরিয়ার এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক সামরিক ঘোষণাগুলোর একটি হিসেবে দেখছেন।

