পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উত্তেজনা যখন ক্রমেই বাড়ছে, ঠিক সেই সময় রাশিয়া ও চীনের সম্পর্ককে “অভূতপূর্ব উচ্চতায়” পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। চীন সফরের আগে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, মস্কো ও বেইজিংয়ের সম্পর্ক এখন শুধু কূটনৈতিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিশ্ব রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত ওই ভিডিও বার্তায় পুতিন বলেন, রাশিয়া ও চীনের শীর্ষ পর্যায়ের নিয়মিত বৈঠক এবং পারস্পরিক সফর দুই দেশের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে। তার ভাষায়, এই সম্পর্কের সম্ভাবনা “প্রায় সীমাহীন”।
পুতিনের মতে, রাশিয়া-চীন সম্পর্কের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো পারস্পরিক আস্থা ও বোঝাপড়া। তিনি বলেন, দুই দেশ এমন একটি সম্পর্ক গড়ে তুলেছে যেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সমান সহযোগিতা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি সমর্থনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বিশেষ করে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা ও ভূরাজনৈতিক চাপে থাকা বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে মস্কো ও বেইজিং একে অপরের আরও কাছাকাছি এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর রাশিয়ার ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর চীনই মস্কোর সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অংশীদার হিসেবে সামনে আসে।
পুতিন স্মরণ করিয়ে দেন, ২৫ বছর আগে রাশিয়া ও চীন “সুপ্রতিবেশী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সহযোগিতা চুক্তি” স্বাক্ষর করেছিল। সেই চুক্তিই আজকের কৌশলগত অংশীদারত্বের ভিত্তি তৈরি করেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তিনি জানান, দুই দেশের মধ্যে শুধু রাজনৈতিক সম্পর্কই নয়, অর্থনীতি, সংস্কৃতি, শিক্ষা এবং মানবিক যোগাযোগও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। মানুষে মানুষে যোগাযোগ বাড়াতে দুই দেশ ভিসামুক্ত ব্যবস্থাও চালু করেছে, যা ব্যবসা ও পর্যটনে নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
পুতিন বলেন, রাশিয়া ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ইতোমধ্যে ২০০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুই দেশের লেনদেন এখন প্রায় পুরোপুরি রুবল ও ইউয়ানে সম্পন্ন হচ্ছে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানোর দিকেও দ্রুত এগোচ্ছে মস্কো ও বেইজিং।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থায় পশ্চিমা প্রভাব কমানোর একটি দীর্ঘমেয়াদি কৌশল। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে পাশ কাটাতে বিকল্প অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার চেষ্টা করছে রাশিয়া ও চীন।
পুতিন আরও বলেন, সংস্কৃতি ও শিক্ষা খাতেও দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পেয়েছে। রাশিয়া-চীন সাংস্কৃতিক বর্ষ সফলভাবে শেষ হওয়ার পর এবার শুরু হয়েছে “রাশিয়া-চীন শিক্ষা বর্ষ”। তিনি চীনের হাজার বছরের ইতিহাস, সংস্কৃতি, শিল্প ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতিরও প্রশংসা করেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট জানান, দুই দেশের জনগণের মধ্যে বোঝাপড়া ও বন্ধুত্ব আরও বাড়াতে মস্কো আগ্রহী। তার মতে, দুই দেশের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আরও গভীর সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব।
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ভূয়সী প্রশংসাও করেন পুতিন। তিনি বলেন, শি জিনপিং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতার বিষয়ে অত্যন্ত প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। দুই নেতার ব্যক্তিগত সম্পর্কও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ভূমিকা রাখছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিশ্ব রাজনীতির প্রসঙ্গ টেনে পুতিন বলেন, রাশিয়া ও চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সম্পর্ক বিশ্বে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সম্পর্ক “কাউকে লক্ষ্য করে” গড়ে ওঠেনি।
তার ভাষায়, মস্কো ও বেইজিং শান্তি, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের পক্ষে কাজ করছে। একই সঙ্গে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, ব্রিকস এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন বহুপাক্ষিক জোটে সক্রিয় সহযোগিতার মাধ্যমে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংকট মোকাবিলায় ভূমিকা রাখছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পুতিনের এই বক্তব্য শুধু দুই দেশের বন্ধুত্বের বার্তা নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বকে একটি রাজনৈতিক সংকেতও। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই রাশিয়া ও চীন এখন এমন এক জোট গড়ে তুলছে, যা ভবিষ্যতের বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

