বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট আরও গভীর হওয়ায় শেষ পর্যন্ত রাশিয়ার তেল নিয়ে আগের কঠোর অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহে ধাক্কা খাওয়া দেশগুলোকে সহায়তা দিতে রুশ সমুদ্রবাহী তেল কেনার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞায় আরও ৩০ দিনের ছাড় দিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
সোমবার মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এই সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেন। এর মাধ্যমে এমন এক সময় যুক্তরাষ্ট্র নীতিতে নমনীয়তা দেখাল, যখন মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ ও দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে স্কট বেসেন্ট জানান, আগের ছাড়ের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন করে ৩০ দিনের সাধারণ লাইসেন্স ইস্যু করা হচ্ছে। এই লাইসেন্সের আওতায় ট্যাঙ্কারে আটকে থাকা রুশ তেল ও জ্বালানি পণ্য ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। তবে এটি এমনভাবে কার্যকর করা হবে যাতে রাশিয়ার বড় তেল কোম্পানিগুলোর ওপর আরোপিত মূল নিষেধাজ্ঞা আনুষ্ঠানিকভাবে লঙ্ঘিত না হয়।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মূলত দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর অনুরোধেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কারণ ইরানকে ঘিরে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতার কারণে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল সরবরাহে বড় ধরনের ব্যাঘাত তৈরি হয়েছে। ফলে যেসব দেশ জ্বালানি আমদানির ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারা মারাত্মক চাপে পড়েছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দ্রুত বাড়তে শুরু করে। এর প্রভাব পড়েছে বিশেষ করে এশিয়া ও আফ্রিকার নিম্নআয়ের দেশগুলোতে। অনেক দেশ ইতোমধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন, পরিবহন ও শিল্প খাতে চাপের মুখে পড়েছে।
স্কট বেসেন্ট বলেন, এই বাড়তি সময় জ্বালানি-ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর জন্য কিছুটা নমনীয়তা তৈরি করবে। তার মতে, এই পদক্ষেপ বৈশ্বিক তেলের বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে এবং সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করবে।
মজার বিষয় হলো, কয়েক সপ্তাহ আগেও স্কট বেসেন্ট স্পষ্টভাবে বলেছিলেন যে রুশ তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞার আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। এমনকি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, ওয়াশিংটন রাশিয়ার জ্বালানি খাতের ওপর চাপ আরও বাড়াতে চায়।
কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ কমে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকেও নতুন করে হিসাব কষতে হয়েছে। ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ছিল, তেলের দাম আরও বেড়ে গেলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ডেমোক্র্যাট দলের দুই জ্যেষ্ঠ সিনেটর জ্যঁ শাহীন ও এলিজাবেথ ওয়ারেন ট্রাম্প প্রশাসনের পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেন, এই সিদ্ধান্ত কার্যত রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের জন্য একটি “অন্যায় উপহার”। তাদের অভিযোগ, এই ছাড়ের ফলে রাশিয়া অতিরিক্ত অর্থ আয় করবে এবং সেই অর্থ ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহার করবে।
তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যে উদ্দেশ্যে রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল, এই নতুন ছাড় সেই চাপকে দুর্বল করে দেবে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে মার্কিন বাজারে জ্বালানির দামও কমছে না, আবার বৈশ্বিক বাজারেও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আসছে না।
উল্লেখ্য, ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলো ধারাবাহিকভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। গত বছর ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার তেল জায়ান্ট ‘রোসনেফট’ ও ‘লুকঅয়েল’-এর ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেয়।
তবে চলতি বছরের মার্চে প্রথমবারের মতো সাময়িক ছাড় দেওয়া হয়। কারণ তখন থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে।
এই ছাড়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্তও রয়েছে। এটি কেবল সমুদ্রে ট্যাঙ্কারে আটকে থাকা রুশ তেল ও জ্বালানি পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। রাশিয়ার নতুন উত্তোলিত তেল এর আওতায় পড়বে না। অর্থাৎ ওয়াশিংটন এখনো চায়, রাশিয়ার নতুন তেল রপ্তানি থেকে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা না পাক মস্কো।

