মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী উত্তেজনা ও সামরিক সংঘাত নিরসনে নতুন শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। যদিও এর আগের প্রস্তাবকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ‘আবর্জনা’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তবুও তেহরান নতুন করে আলোচনার পথ খোলা রাখার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকেরা।
নতুন প্রস্তাবে মূলত আগের দাবিগুলোকেই আরও সুসংগঠিতভাবে সামনে এনেছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এই প্রস্তাবে প্রথমেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতি এবং বৈরিতার অবসানের আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে লেবাননসহ সংঘাতপ্রবণ অঞ্চলগুলোতে দ্রুত শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ইরান দাবি করেছে, তাদের সীমান্তঘেঁষা অঞ্চলগুলো থেকে মার্কিন সেনা উপস্থিতি কমাতে হবে। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় যে অবকাঠামোগত ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণও চেয়েছে তেহরান। পাশাপাশি বহু বছর ধরে চলা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং বিদেশে আটকে থাকা ইরানের অর্থ ও সম্পদ অবমুক্ত করার বিষয়টিকেও প্রস্তাবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সংঘাতের সময় ইরানের ওপর আরোপ করা সামুদ্রিক অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়েও জোর দিয়েছে তেহরান। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে সাম্প্রতিক উত্তেজনার কারণে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। ফলে ইরান এই অবরোধকে শুধু রাজনৈতিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও ক্ষতিকর হিসেবে তুলে ধরছে।
ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার তত্ত্বাবধানে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তাও এই প্রস্তাবে রয়েছে। অর্থাৎ তেহরান এখনো তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে সম্পূর্ণ বেসামরিক ও শান্তিপূর্ণ বলেই দাবি করছে।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পের অবস্থানেও কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। স্থানীয় সময় গত সোমবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, ইরানের কাছ থেকে নতুন প্রস্তাব পাওয়ার পর পূর্বপরিকল্পিত বিমান হামলা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, আলোচনার মাধ্যমেই হয়তো সংকটের সমাধান সম্ভব হবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের চাপও এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং সৌদি আরবর নেতারা ওয়াশিংটনকে বড় ধরনের সামরিক অভিযান থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। কারণ নতুন যুদ্ধ শুরু হলে পুরো অঞ্চলজুড়ে অর্থনৈতিক ও মানবিক সংকট আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই সংকটের পেছনে সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো জ্বালানি নিরাপত্তা। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা তৈরি হলে বিশ্বের বড় অংশের তেল সরবরাহ হুমকির মুখে পড়ে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রও এখন সরাসরি সংঘাতে না গিয়ে কূটনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজছে।
এরই মধ্যে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় সামনে এসেছে। গত মাসে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা আয়োজন করা হয়েছিল বলে কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে। বর্তমান প্রস্তাবটিও পাকিস্তানের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছানো হয়েছে।
তবে পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। কারণ দুই পক্ষই বারবার নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। ফলে আলোচনার পথ খোলা থাকলেও যেকোনো মুহূর্তে উত্তেজনা আবারও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকেরা।

