নাইজেরিয়ায় জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও নাইজেরিয়ার বাহিনী। গত তিন দিনে পরিচালিত বিমান ও স্থল অভিযানে অন্তত ১৭৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে নাইজেরিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী।
দেশটির সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল সামাইলা উবা এক বিবৃতিতে জানান, ১৬ মে থেকে ১৯ মে পর্যন্ত পরিচালিত এই অভিযানে একাধিক জঙ্গি ঘাঁটি, অস্ত্রাগার এবং লজিস্টিক কেন্দ্র ধ্বংস করা হয়েছে।
তার ভাষায়, শুধু জঙ্গিদের হত্যা নয়, তাদের যোগাযোগ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে সংগঠিত হওয়ার সক্ষমতা কমে যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আফ্রিকায় ইসলামিক স্টেটের কার্যক্রম যেভাবে বিস্তৃত হয়েছে, তার প্রেক্ষাপটে এই অভিযান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের পরাজয়ের পর আইএস আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন ঘাঁটি গড়ে তোলে। বিশেষ করে পশ্চিম আফ্রিকায় “ইসলামিক স্টেট ওয়েস্ট আফ্রিকা প্রভিন্স” বা আইএসডব্লিউএপি নামে সংগঠনটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
সংঘাত বিশ্লেষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসে বিশ্বজুড়ে আইএস-সংক্রান্ত সহিংস ঘটনার বড় অংশই ঘটেছে আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে। এর মধ্যে নাইজেরিয়া অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।
দেশটিতে শুধু আইএস নয়, আল-কায়দা-ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠী এবং বোকো হারামও দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। এসব গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বহু বছর ধরেই লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে নাইজেরিয়ার সরকার। কিন্তু হত্যা, অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় ও হামলার ঘটনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি।
এই বাস্তবতায় চলতি বছর যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চায় নাইজেরিয়া। পরে ট্রাম্প প্রশাসন দেশটিতে প্রায় ১০০ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা পাঠায়। তাদের মূল দায়িত্ব ছিল নাইজেরীয় বাহিনীকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, তবে বড় ধরনের অভিযানে তারা সরাসরি অংশও নিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—এতে আইএসের কয়েকজন শীর্ষ নেতাও নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
১৬ মে পরিচালিত অভিযানে নিহত হন আবু বিলাল আল-মিনুকি, যাকে আইএসের বৈশ্বিক পর্যায়ের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা বা “সেকেন্ড ইন কমান্ড” হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
এরপর ১৭ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত অভিযানে আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা নিহত হন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আইএসডব্লিউএপি-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা আবদ-আল ওয়াহাব, আবু মুসা আল-মাঙ্গাউই এবং আল-মিনুকির ঘনিষ্ঠ সহকারী আবু আল মুথান্না আল মুহাজির।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এত স্বল্প সময়ে একাধিক শীর্ষ নেতার নিহত হওয়া আইএসের পশ্চিম আফ্রিকা নেটওয়ার্কের জন্য বড় ধাক্কা হতে পারে। তবে একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেছেন, এসব গোষ্ঠী প্রায়ই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ইউনিটে কাজ করে, ফলে নেতৃত্ব হারালেও পুরো সংগঠন দ্রুত ভেঙে পড়ে না।
নাইজেরিয়ার প্রতিরক্ষা বাহিনী জানিয়েছে, সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে সম্পূর্ণ নির্মূল না করা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে যাওয়া হবে।
অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, জঙ্গিবিরোধী অভিযানের পাশাপাশি বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা জরুরি। কারণ অতীতে নাইজেরিয়ার বিভিন্ন সামরিক অভিযানে সাধারণ মানুষের হতাহতের অভিযোগও উঠেছিল।
সব মিলিয়ে, এই অভিযান আফ্রিকায় জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে চলমান লড়াইয়ে একটি বড় সামরিক সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও, দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট মোকাবিলাও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

