প্রশান্ত মহাসাগরের ছোট ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে অনেক সময় বিশ্বরাজনীতির প্রান্তিক অংশ বলে মনে করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা একেবারেই ভিন্ন। সামরিক নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ, বাণিজ্য, জলবায়ু ঝুঁকি এবং চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল আজ আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত ছিল প্রশান্ত দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক আরও যত্নের সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু পদক্ষেপ ও অবহেলা উল্টো সেই সম্পর্ককেই দুর্বল করে তুলছে।
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি জবাবদিহি দপ্তর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে মুক্তভাবে সংযুক্ত রাষ্ট্রসমূহ—মাইক্রোনেশিয়ার ফেডারেটেড স্টেটস, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জ এবং পালাউ—এর জন্য দেওয়া সহায়তার বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে দেখা যায়, ট্রাম্প প্রশাসন প্রয়োজনীয় এবং আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক কিছু পদে সময়মতো লোক নিয়োগ দিতে ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোও নিজেদের প্রতিবেদন জমা দেওয়ার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারেনি। বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক বিলম্ব নয়; এটি বৃহত্তর কূটনৈতিক অবহেলার লক্ষণ।
প্রশান্ত অঞ্চলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নেতৃত্ব দীর্ঘদিন ধরেই অগ্রাধিকারপূর্ণ এলাকা হিসেবে দেখে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো–প্রশান্ত কমান্ডের কমান্ডার অ্যাডমিরাল স্যামুয়েল জে পাপারো এই অঞ্চলকে প্রতিরক্ষা দপ্তরের অগ্রাধিকারপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কিন্তু কথা ও কাজের মধ্যে যদি বড় ফারাক থাকে, তবে কৌশলগত ঘোষণা বিশ্বাসযোগ্যতা হারায়। দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এখন সেই সমস্যাই স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস দেখলেই বোঝা যায়, প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলো কখনোই ছোট বিষয় ছিল না। জাপানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অগ্রযাত্রায় এসব দ্বীপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আজও এই দ্বীপগুলো সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ২০টি স্বাধীন দেশ ও অঞ্চল প্রশান্ত মহাসাগরের বিস্তৃত অংশে ভূমি ও সমুদ্রসীমার ওপর আইনগত নিয়ন্ত্রণ রাখে। তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সামুদ্রিক এলাকা ৭০ লাখ বর্গমাইলের বেশি, যা যুক্তরাষ্ট্রের আয়তনের প্রায় দ্বিগুণ। এই বিশাল সমুদ্রপথ দিয়ে প্রতিবছর শত শত বিলিয়ন ডলারের পণ্য পরিবহন হয়, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি ও রপ্তানির বড় অংশও রয়েছে।
অর্থাৎ, প্রশান্ত দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর গুরুত্ব শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিকও। সমুদ্রপথের নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক প্রবাহ, সামুদ্রিক সম্পদ এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—সব ক্ষেত্রেই এসব রাষ্ট্রের ভূমিকা বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিতে ধারাবাহিকতা, সম্মান ও বাস্তব সহায়তা থাকা জরুরি ছিল। কিন্তু গত এক বছরে ট্রাম্প প্রশাসনের কিছু সিদ্ধান্ত সেই ইতিবাচক ধারাকে দুর্বল করেছে।
সরকারি জবাবদিহি দপ্তরের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা সবচেয়ে গুরুতর উদাহরণগুলোর একটি হলো যৌথ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক জবাবদিহি কমিটি এবং যৌথ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা কমিটিতে সদস্য নিয়োগে দীর্ঘ বিলম্ব। নির্ধারিত সময়ের এক বছরেরও বেশি সময় পর, আগস্ট ২০২৫ সালে এই নিয়োগ দেওয়া হয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, কমিটিগুলোর বার্ষিক বৈঠকের মাত্র এক সপ্তাহ আগে নিয়োগ সম্পন্ন করা হয়। এমন বিলম্ব ছোটখাটো প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; এটি অংশীদার রাষ্ট্রগুলোর কাছে বার্তা দেয় যে তাদের প্রয়োজন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না।
প্রশান্ত দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক শুধু অর্থ সহায়তার ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এর সঙ্গে জড়িত আস্থা, সম্মান, নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতা। কিন্তু যখন একটি শক্তিশালী দেশ প্রয়োজনীয় পদে সময়মতো লোক নিয়োগ দিতেও ব্যর্থ হয়, তখন ছোট রাষ্ট্রগুলো স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করতে শুরু করে—ওয়াশিংটন সত্যিই কি তাদের গুরুত্ব দেয়?
এই অবহেলার পাশাপাশি আরও কিছু নীতি প্রশান্ত অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।িগ্রস্ত করছে। পালাউয়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনিগ্রস্ত করছে। পালাউয়ের ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসন দেশটির প্রেসিডেন্টকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন তৃতীয় দেশে প্রত্যর্পণ পরিকল্পনায় অংশ নিতে রাজি করায়। অথচ এই নীতি পালাউয়ের সাধারণ মানুষের মধ্যে অত্যন্ত অজনপ্রিয়। ফলে স্থানীয় জনগণের চোখে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সহযোগীর বদলে চাপ প্রয়োগকারী শক্তি হিসেবে দেখা দিতে পারে।
টঙ্গা ও ফিজির নাগরিকদের ক্ষেত্রেও সমস্যা তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন অভিবাসী ভিসা প্রক্রিয়া স্থগিত করায় অনেক মানুষ অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে গেছে। অন্যদিকে টুভালু ও ভানুয়াটুর নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হলে ১০ হাজার ডলারের ভিসা জামানত দিতে হবে। বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় যখন জানা যায়, ২০২২ সালে টুভালুর একটি পরিবারের গড় মাসিক আয় ছিল প্রায় ১ হাজার ৫৪০ ডলার। এমন বাস্তবতায় ১০ হাজার ডলারের জামানত অনেক পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব বোঝা।
প্রশান্ত দ্বীপরাষ্ট্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি ঝুঁকির মুখে রয়েছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, উপকূল ক্ষয়, পানির নিরাপত্তা এবং বসতি সংকট তাদের জন্য ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানের সমস্যা। তাই যে কোনো বড় শক্তির সঙ্গে তাদের সম্পর্কের ক্ষেত্রে জলবায়ু সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার উদ্যোগ থেকে সরে আসা, বহু বহুপক্ষীয় সংস্থা থেকে দূরে থাকা এবং মার্কিন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাকে দুর্বল করার সিদ্ধান্ত প্রশান্ত অঞ্চলের কাছে নেতিবাচক বার্তা পাঠিয়েছে।
এখানেই চীনের জন্য সুযোগ তৈরি হচ্ছে। প্রশান্ত অঞ্চলে অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কাজ করতে আগ্রহী হলেও তারা বাস্তব সহায়তা, সম্মানজনক সম্পর্ক এবং ধারাবাহিক উপস্থিতি চায়। যদি যুক্তরাষ্ট্র সেই জায়গা খালি রাখে, চীন তা পূরণ করতে এগিয়ে আসবে—এটাই ভূরাজনীতির বাস্তব নিয়ম। ইতিমধ্যে একটি চীনা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান গুয়াম থেকে কয়েকশ মাইল দূরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন একটি রানওয়ে পুনর্নির্মাণের কাজ শেষ করছে। মাইক্রোনেশিয়ার ফেডারেটেড স্টেটসের কোসরাই উচ্চ বিদ্যালয়ও যুক্তরাষ্ট্রের পরিবর্তে চীনের অর্থায়নে সংস্কার করা হচ্ছে।
এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এগুলো দেখায়, প্রশান্ত অঞ্চলে প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এখন বাস্তব ও দৃশ্যমান। চীন শুধু সামরিক বা কূটনৈতিক উপস্থিতি বাড়াচ্ছে না; অবকাঠামো, শিক্ষা, উন্নয়ন সহায়তা এবং স্থানীয় প্রকল্পের মাধ্যমেও সম্পর্ক গড়ে তুলছে। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর জন্য এসব প্রকল্প তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তাই যুক্তরাষ্ট্র যদি শুধু বড় কৌশলগত ভাষণ দেয় কিন্তু স্থানীয় প্রয়োজনের জায়গায় অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তার প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে।
প্রশান্ত অঞ্চলের রাজনীতিতে বড় শক্তির অহংকার কাজ করে না। এখানে সম্পর্ক গড়ে ওঠে দীর্ঘমেয়াদি আস্থা, স্থানীয় সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং বাস্তব সহায়তার ওপর। ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে শুধুমাত্র সামরিক মানচিত্রের অংশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। তাদের নিজস্ব উদ্বেগ আছে—জলবায়ু নিরাপত্তা, উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অভিবাসন, কর্মসংস্থান এবং মর্যাদাপূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক। এই বাস্তবতা বুঝতে না পারলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বারবার ব্যর্থ হবে।
ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অবস্থান তাই যুক্তরাষ্ট্রের নিজের স্বার্থের জন্যও ক্ষতিকর। একদিকে তারা ইন্দো–প্রশান্ত অঞ্চলকে অগ্রাধিকার বলছে, অন্যদিকে প্রশান্ত অংশে প্রয়োজনীয় মনোযোগ ও সম্পদ দিচ্ছে না। এর ফলে শুধু দ্বীপরাষ্ট্রগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে না; যুক্তরাষ্ট্রও তার কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রশান্ত অঞ্চলে সামান্য সহায়তাও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। সময়মতো প্রশাসনিক নিয়োগ, উন্নয়ন প্রকল্পে ধারাবাহিকতা, জলবায়ু সহযোগিতা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহায়তা, সম্মানজনক ভিসা নীতি এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া—এসব পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আস্থা বাড়াতে পারে। কিন্তু উল্টোভাবে চাপ, অবহেলা ও অনিশ্চয়তা তৈরি করলে সেই আস্থা দ্রুত ক্ষয়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সতর্কবার্তা। প্রশান্ত দ্বীপরাষ্ট্রগুলোকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। তারা ছোট হতে পারে, কিন্তু তাদের ভৌগোলিক অবস্থান, সমুদ্রসীমা, জলবায়ু বাস্তবতা এবং কৌশলগত গুরুত্ব বিশাল। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই এই অঞ্চলকে নিরাপদ, উন্মুক্ত ও স্থিতিশীল রাখতে চায়, তাহলে তাকে কথার চেয়ে কাজে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু প্রশান্ত দ্বীপরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের নয়; এটি ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থায় আস্থা ও প্রভাবের প্রশ্ন। যেসব রাষ্ট্রকে আজ উপেক্ষা করা হচ্ছে, তারাই আগামী দিনের কৌশলগত ভারসাম্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ওয়াশিংটনের সামনে পথ স্পষ্ট—প্রশান্ত দ্বীপবাসীদের সমস্যা বাড়ানো নয়, তাদের পাশে দাঁড়ানো। সেটিই হবে মানবিক, কূটনৈতিক এবং কৌশলগতভাবে সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।

