ব্রিটেনের রাজনীতি এখন এক অস্বস্তিকর সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন বাড়ছে, স্থানীয় নির্বাচনে তাঁর দলের বড় ক্ষতির পর ক্ষমতায় টিকে থাকা নিয়েও চাপ তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশটির সাধারণ মানুষের মনেও এক ধরনের হতাশা জমছে। অনেকেই ভাবতে শুরু করেছেন, যুক্তরাজ্য কি এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে, যেখান থেকে কার্যকরভাবে দেশ চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে?
এই প্রশ্ন শুধু রাজনৈতিক নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন সংকট, পেনশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা এবং আঞ্চলিক বৈষম্যের মতো বড় বড় বিষয়। জিম ও’নিলের ১৯ মে ২০২৬ তারিখের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রিটেনের সামনে এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ আছে, তবে তার জন্য দরকার সাহসী নেতৃত্ব এবং দীর্ঘদিন ধরে এড়িয়ে যাওয়া কিছু “পবিত্র গরু” বা অস্বস্তিকর নীতিগত সমস্যাকে সরাসরি মোকাবিলা করা।
ব্রিটেনের মূল সংকট হলো, দেশটি অনেকদিন ধরে কঠিন প্রশ্নগুলোকে পাশ কাটিয়ে এসেছে। ভোট হারানোর ভয়, জনমত জরিপের চাপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া এবং দলীয় রাজনীতির হিসাব—এসবের কারণে নীতিনির্ধারকেরা এমন সিদ্ধান্ত নিতে চান না, যা স্বল্পমেয়াদে অজনপ্রিয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে। কিন্তু অর্থনীতির স্থবিরতা ভাঙতে হলে জনপ্রিয় স্লোগানের বাইরে গিয়ে বাস্তব সংস্কার দরকার।
প্রথম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আঞ্চলিক ক্ষমতায়ন। ব্রিটেনের অর্থনৈতিক আলোচনায় দীর্ঘদিন ধরে লন্ডনকে কেন্দ্র করে ভাবা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে গ্রেটার ম্যানচেস্টার একটি ভিন্ন উদাহরণ তৈরি করেছে। গত ১৫ বছরে অঞ্চলটি অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য উন্নতি করেছে। শুধু ম্যানচেস্টার শহর নয়, পুরো গ্রেটার ম্যানচেস্টার যুক্তরাজ্যের সামগ্রিক অর্থনীতির তুলনায় ভালো করেছে এবং লন্ডনের তুলনায় প্রায় তিন গুণ হারে এগিয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানে অ্যান্ডি বার্নহামের নেতৃত্বকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তিনি সব উদ্যোগের সূচনাকারী না হলেও, তৈরি হওয়া সুযোগকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতা দেখায়, কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে সব ক্ষমতা রেখে দিলে আঞ্চলিক সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগে না। স্থানীয় সরকারকে যদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ, পরিবহন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক কৌশলের ক্ষেত্রে বেশি ক্ষমতা দেওয়া যায়, তাহলে লন্ডনের বাইরে অন্য অঞ্চলও উন্নতির শক্তিশালী কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।
দ্বিতীয় বিষয়টি আবাসন বাজার। ব্রিটেনে বাড়ির দাম, বিশেষ করে লন্ডন ও আশপাশের এলাকায়, বহু মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এর ফলে তরুণদের মধ্যে সম্পত্তির মালিক হওয়ার স্বপ্ন দুর্বল হচ্ছে, কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকলেও বাসস্থান ব্যয়ের কারণে অনেকেই স্থানান্তর হতে পারছেন না। সামাজিক ও ভৌগোলিক চলাচলের পথে আবাসন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জিম ও’নিলের যুক্তি হলো, ভূমির ওপর কর ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনা দরকার। বর্তমানে জমির ওপর নয়, জমির ওপর তৈরি কাঠামো বা সম্পত্তির ওপর করের ব্যবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জমির প্রকৃত মূল্যকে করের আওতায় আনলে আবাসন বাজারের কাঠামো বদলাতে পারে। এতে জমি আটকে রেখে মুনাফা করার প্রবণতা কমবে, নির্মাণ খাত সক্রিয় হবে, নতুন বাড়ি তৈরি বাড়বে এবং অর্থনীতিতে আস্থার পরিবেশ তৈরি হতে পারে। আবাসন শুধু মানুষের মাথা গোঁজার জায়গা নয়; এটি উৎপাদনশীলতা, শ্রমবাজার এবং সামাজিক ন্যায়ের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
তৃতীয় বড় প্রশ্ন হলো ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক। ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে থাকলেও বাস্তবতা হলো, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিকভাবে ইউরোপকে পাশ কাটিয়ে ব্রিটেনের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। ইউরোপের সঙ্গে যতটা সম্ভব ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক তৈরি করা যুক্তরাজ্যের জন্য বাস্তববাদী পথ হতে পারে। বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ব্রেক্সিটের নেতিবাচক প্রভাব বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রম সরবরাহ এবং আরও কিছু ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়েছে।
এখানে আবেগের বদলে অর্থনৈতিক যুক্তি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপকে রাজনৈতিক শত্রু বানিয়ে রাখলে হয়তো কিছু ভোটব্যাংকে সাময়িক সাড়া পাওয়া যায়, কিন্তু উৎপাদন, রপ্তানি, আমদানি, শ্রমবাজার এবং বিনিয়োগের হিসাব আলাদা কথা বলে। যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে ফিরুক বা না ফিরুক, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ককে যতটা সম্ভব কার্যকর ও ঘনিষ্ঠ করা অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয়।
চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো রাষ্ট্রীয় পেনশনের তথাকথিত “ট্রিপল লক” ব্যবস্থা। এই নিয়মে পেনশন প্রতি বছর মূল্যস্ফীতি, মজুরি বৃদ্ধি অথবা ২.৫ শতাংশ—এর মধ্যে যেটি বেশি, তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাড়ে। শুনতে এটি নিরাপদ ও ন্যায্য মনে হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই এবং প্রজন্মগত ন্যায়ের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
রাজনীতিবিদেরা সাধারণত এই ব্যবস্থায় হাত দিতে ভয় পান। কারণ পেনশনভোগীরা নিয়মিত ভোট দেন এবং তাঁদের অসন্তুষ্ট করা রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম যখন বাড়ি কিনতে পারছে না, উচ্চ কর দিচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছে, তখন শুধু বয়স্ক ভোটারদের সুরক্ষা দিয়ে অর্থনৈতিক ভারসাম্য রাখা কঠিন। বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে, বয়স্ক ভোটারদের ৭৪ শতাংশ নিজের বাড়ির পুরো মালিক, অর্থাৎ তাঁদের বাড়ির ওপর কোনো বন্ধক নেই। ফলে প্রশ্ন ওঠে, রাষ্ট্রীয় সহায়তার ভার কতটা ন্যায্যভাবে ভাগ হচ্ছে?
পঞ্চম বড় বিষয় হলো সামাজিক বিমা ও কল্যাণ ব্যয়ের চাপ। ব্রিটেনে কল্যাণ সুবিধা এমনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে, যাতে বহু মানুষ একাধিক সুবিধা নিয়ে এমন আয় পাচ্ছেন, যা ন্যূনতম মজুরির চাকরির আয়ের চেয়েও বেশি হতে পারে। এখানে মূল সমস্যা শুধু ব্যয় নয়; কাজ করার প্রণোদনা দুর্বল হয়ে গেলে অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা কমে যায়। কল্যাণ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দুর্বল মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া, কিন্তু সেই ব্যবস্থা যদি স্থায়ী নির্ভরতা তৈরি করে, তাহলে তা সমাজ ও অর্থনীতির জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়ায়।
ষষ্ঠ দিকটি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা। যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা দীর্ঘদিন ধরে দেশের সামাজিক চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু সমস্যা হলো, স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় ক্রমাগত বাড়ছে, অথচ তার বিনিময়ে প্রত্যাশিত ফল মিলছে না বলে অভিযোগ বাড়ছে। মোট দেশজ উৎপাদনের ক্রমবর্ধমান অংশ স্বাস্থ্যসেবায় ব্যয় হলেও যদি অপেক্ষার সময়, সেবার মান, কর্মী সংকট এবং রোগীর সন্তুষ্টি উন্নত না হয়, তাহলে শুধু অর্থ বাড়ানো সমাধান নয়। এখানে কাঠামোগত সংস্কার দরকার—কীভাবে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, কোথায় অপচয় হচ্ছে, কোন ব্যবস্থায় সেবা দ্রুত ও কার্যকর করা যায়—এসব প্রশ্নের জবাব জরুরি।
ব্রিটেনের জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, অর্থনৈতিক পুনর্জাগরণ কেবল বাজেট ঘোষণা বা রাজনৈতিক বক্তৃতার মাধ্যমে আসবে না। দরকার আবাসন বাজারে গভীর সংস্কার, ইউরোপের সঙ্গে বাস্তববাদী সম্পর্ক, পেনশন ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা, কল্যাণ ব্যয়ের স্বচ্ছতা, স্বাস্থ্যসেবার কার্যকারিতা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতায়নের সমন্বিত রূপরেখা। এসব পদক্ষেপ একসঙ্গে নেওয়া গেলে দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের খরচ কমতে পারে, পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরতে পারে, নির্মাণ খাতে গতি আসতে পারে এবং ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয়ের মনোবল বাড়তে পারে।
তবে এর জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক সাহস। ব্রিটেনের নেতারা যদি প্রতিদিনের জনপ্রিয়তা, দলীয় চাপ এবং নির্বাচনী হিসাবের বাইরে গিয়ে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পারেন, তাহলে সংকটই নতুন সূচনার সুযোগ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যদি কঠিন সিদ্ধান্ত আবারও পিছিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে স্থবিরতা আরও গভীর হবে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের আশা আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
অতএব, ব্রিটেনের সামনে পথ বন্ধ নয়। বরং পথ আছে, কিন্তু সেটি সহজ নয়। যে নেতা আবাসন, পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা, কল্যাণ ব্যয়, ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক এবং আঞ্চলিক ক্ষমতায়নের মতো জটিল প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারবেন, তিনিই হয়তো ব্রিটেনের অর্থনীতিকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে পারবেন। এখন প্রশ্ন হলো—ব্রিটেন কি এমন নেতৃত্ব পাবে, যে জনপ্রিয়তার ভয় কাটিয়ে বাস্তব পরিবর্তনের পথে হাঁটতে সাহস করবে?

