মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে কয়েক মাস ধরে চলা সামরিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেই এবার সরাসরি ইরানের সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, তাদের একটি সামরিক হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার ঘটনার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।
মঙ্গলবার ভোরে শুরু হওয়া এই হামলার পর ইরানের উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর সংলগ্ন কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে হামলার খবর প্রকাশিত হওয়ার পর আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে অঞ্চলটি আরও বড় সংঘাতের দিকে এগোতে পারে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, অভিযানে অত্যন্ত নিখুঁত প্রযুক্তিনির্ভর অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের লক্ষ্য ছিল ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ভূমিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র এবং নজরদারি রাডার স্থাপনাগুলো। যুক্তরাষ্ট্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব স্থাপনা হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের জন্য হুমকি তৈরি করছিল।
ঘটনার সূত্রপাত কয়েক দিন আগে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়, হরমুজ প্রণালির আকাশে টহলরত একটি সামরিক হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়। পরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরানি বাহিনী সেটি ভূপাতিত করেছে। হেলিকপ্টারটি ওমান উপসাগরে পড়ে যায় এবং এর দুই সদস্যকে উদ্ধার করতে বিশেষ সামুদ্রিক ড্রোন ব্যবহার করা হয়।
পরবর্তীতে বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, হেলিকপ্টারটি একটি ড্রোনের আঘাতে ভূপাতিত হয়ে থাকতে পারে। তবে এটি ইচ্ছাকৃত হামলা ছিল নাকি দুর্ঘটনাজনিত ঘটনা, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তা সত্ত্বেও ওয়াশিংটন এটিকে শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়।
হামলার কয়েক ঘণ্টা আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প বলেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র ঘটনার জবাব দেবে। তার এই বক্তব্যের অল্প সময় পরই ইরানের উপকূলীয় এলাকায় বিস্ফোরণের খবর আসতে শুরু করে।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষা অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চল এবং গুরুত্বপূর্ণ নজরদারি কেন্দ্রগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে বলে জানা গেছে। যদিও হামলায় কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করেনি তেহরান।
অন্যদিকে ইরানও কঠোর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই হামলার জবাব দেওয়া হবে। তার ভাষায়, সামরিক চাপ বা হামলার মাধ্যমে ইরানকে নত করা সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, বহিরাগত শক্তিগুলো যদি নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়, তাহলে তাদের এই অঞ্চল থেকে সরে যেতে হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো কেবল একটি সামরিক অভিযানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর পেছনে রয়েছে হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্ব, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার এবং দীর্ঘদিনের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিশ্বের একটি বড় অংশের তেল পরিবহন এই জলপথ দিয়ে হওয়ায় এখানে যে কোনো সংঘাতের প্রভাব আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়ে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই হামলা কি সীমিত পর্যায়ে থাকবে, নাকি এর জেরে দুই দেশের মধ্যে আরও বড় সামরিক সংঘাত শুরু হবে? যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় পক্ষই কঠোর অবস্থানে থাকায় অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। তবে কূটনৈতিক মহল মনে করছে, পরিস্থিতি দ্রুত শান্ত না হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির ওপরও।

