১৯৬৭ সালের ৮ জুন। মধ্যপ্রাচ্যে তখন ছয় দিনের যুদ্ধ চলছে। ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে সংঘাত দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। যুদ্ধের উত্তাপ, কূটনৈতিক উত্তেজনা এবং সামরিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই ভূমধ্যসাগরের আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছিল মার্কিন নৌবাহিনীর গোয়েন্দা জাহাজ ইউএসএস লিবার্টি। জাহাজটির কাজ ছিল যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করা।
কিন্তু সেদিন যা ঘটেছিল, তা যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্কের ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি হয়ে আছে। ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ও টর্পেডো নৌযানের হামলায় জাহাজটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এতে ৩৪ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত হন এবং আরও ১৭১ জন আহত হন। এত বড় ক্ষয়ক্ষতির পরও ঘটনাটি নিয়ে পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জবাবদিহি হয়নি—এমন অভিযোগ বহু বছর ধরে করে আসছেন বেঁচে যাওয়া নাবিকেরা, তাদের পরিবার এবং কয়েকজন সমালোচক।
দীর্ঘ ৫৯ বছর পর, ২০২৬ সালের ৮ জুন, সেই ঘটনার বার্ষিকীতে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে নতুন করে বিষয়টি তুলেছেন রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য থমাস ম্যাসি। তিনি শুধু নিহতদের স্মরণ করেননি, বরং সরাসরি নতুন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের সময় হামলা থেকে বেঁচে যাওয়া কয়েকজন নাবিকও উপস্থিত ছিলেন। ম্যাসির মতে, সরকারি ব্যাখ্যা এখনো অনেক প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেনি। তার বক্তব্যে মূল বার্তাটি ছিল স্পষ্ট—যারা বেঁচে আছেন, তাদের জীবদ্দশাতেই সত্য জানার অধিকার নিশ্চিত করা উচিত।
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, ইউএসএস লিবার্টিতে হামলা ছিল ভুল শনাক্তকরণের ফল। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে জাহাজটিকে শত্রুপক্ষের জাহাজ মনে করা হয়েছিল। এই ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে কিছু মার্কিন সরকারি তদন্তও ঘটনাটিকে দুর্ঘটনাজনিত বা যুদ্ধকালীন ভুল হিসেবে দেখেছে। তবে বেঁচে যাওয়া নাবিকদের একটি অংশ এই ব্যাখ্যা কখনো মেনে নেননি। তাদের দাবি, জাহাজটিতে মার্কিন পতাকা দৃশ্যমান ছিল এবং হামলার আগে ইসরায়েলি বিমান জাহাজটির ওপর নজরদারি চালিয়েছিল।
এখানেই বিতর্কের মূল জায়গা। যদি জাহাজটির পরিচয় স্পষ্ট ছিল, তাহলে কেন হামলা হলো? যদি ভুল হয়ে থাকে, তাহলে কেন হামলা এত দীর্ঘ সময় ধরে চলল? কেন বিমান হামলার পর টর্পেডো নৌযানও ব্যবহার করা হলো? এসব প্রশ্নই দশকের পর দশক ধরে ইউএসএস লিবার্টি ঘটনাকে অমীমাংসিত রেখেছে।
থমাস ম্যাসি প্রতিনিধি পরিষদে বলেন, সেদিন আবহাওয়া পরিষ্কার ছিল এবং মার্কিন পতাকা স্পষ্টভাবে উড়ছিল। তিনি বেঁচে যাওয়া নাবিকদের বক্তব্য তুলে ধরে দাবি করেন, হামলাটি শুধু ভুল ছিল না; বরং জাহাজটি ডুবিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল। তার বক্তব্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা যেন কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বেঁচে না থাকে—এমন মনোভাব নিয়েই আক্রমণ চালিয়েছিল। যদিও এটি ম্যাসির দাবি এবং ইসরায়েলপন্থী মহল এই বক্তব্যকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মার্কিন অভ্যন্তরীণ নীরবতা। যুক্তরাষ্ট্রে নিজস্ব সেনাসদস্য নিহত হওয়ার পরও কংগ্রেসে এ নিয়ে বড় পরিসরে প্রশ্ন ওঠেনি। কোনো পূর্ণাঙ্গ কংগ্রেসীয় তদন্ত কমিটি গঠন হয়নি। বেঁচে যাওয়া নাবিকদের অভিযোগ, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিষয়টি দ্রুত বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র নিজের নাগরিকদের ন্যায়বিচারের চেয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলপন্থী বিশ্লেষকেরা বলেন, ছয় দিনের যুদ্ধ ছিল অত্যন্ত দ্রুতগতির, উত্তেজনাপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর সংঘাত। এমন পরিস্থিতিতে ভুল শনাক্তকরণ অস্বাভাবিক নয়। তাদের মতে, ইসরায়েল পরে দুঃখ প্রকাশ করেছে এবং ক্ষতিপূরণও দিয়েছে। তাই ঘটনাটিকে পরিকল্পিত হামলা হিসেবে দেখার চেষ্টা রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তারা আরও মনে করেন, এই ঘটনা বহু সময় ইসরায়েলবিরোধী প্রচারণায় ব্যবহার করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো, ক্ষতিপূরণ কি সত্য অনুসন্ধানের বিকল্প হতে পারে? কোনো রাষ্ট্র দুঃখ প্রকাশ করলেই কি সব সন্দেহ শেষ হয়ে যায়? বিশেষ করে যখন নিহতের সংখ্যা ৩৪ এবং আহতের সংখ্যা ১৭১, তখন বেঁচে যাওয়া নাবিকদের বক্তব্য উপেক্ষা করা কি ন্যায়সঙ্গত? এই প্রশ্নগুলোই ম্যাসির দাবিকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে।
ঘটনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটও গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধের পর ইসরায়েল পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, গাজা এবং সিরিয়ার গোলান মালভূমি দখল করে। মধ্যপ্রাচ্যের পরবর্তী রাজনীতি, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং ইসরায়েল–আরব সম্পর্কের ওপর এই যুদ্ধের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। সেই যুদ্ধের সময়ই ইউএসএস লিবার্টি হামলার ঘটনা ঘটে। তাই এটি শুধু একটি সামরিক দুর্ঘটনা বা একটি বিচ্ছিন্ন আক্রমণ নয়; বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক ইতিহাসের অংশ।
ম্যাসি তার বক্তব্যে সাবেক শীর্ষ মার্কিন কর্মকর্তা ও সামরিক ব্যক্তিদের মতামতের কথাও উল্লেখ করেন। তার দাবি, কয়েকজন প্রভাবশালী মার্কিন কর্মকর্তা ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে মানতে পারেননি। তিনি এমন সম্ভাবনার কথাও বলেন যে, হামলাটি হয়তো এমন এক গোপন পরিকল্পনার অংশ ছিল, যেখানে দায় অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা থাকতে পারে, অথবা ইসরায়েল চাইছিল না যে ওই দিন তারা কী করছে তা মার্কিন জাহাজ পর্যবেক্ষণ করুক। তবে এসব দাবি এখনো বিতর্কিত এবং আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত নয়।
এই জায়গায় সাংবাদিকতা ও বিশ্লেষণের দায়িত্ব হলো দুই দিকই দেখা। একদিকে আছে সরকারি ব্যাখ্যা, যেখানে বলা হয় এটি ছিল যুদ্ধকালীন ভুল। অন্যদিকে আছে বেঁচে যাওয়া নাবিকদের সাক্ষ্য, যারা বলেন জাহাজের পরিচয় স্পষ্ট ছিল এবং হামলা ইচ্ছাকৃত। এই দুই অবস্থানের মাঝখানে পড়ে আছে বহু অপ্রকাশিত নথি, রাজনৈতিক বিব্রতকরতা এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সম্পর্কের সংবেদনশীল বাস্তবতা।
২০২৬ সালে বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসার পেছনে আরেকটি কারণ হলো বর্তমান ভূরাজনীতি। গাজা যুদ্ধ, লেবানন ও ইরানকে ঘিরে সামরিক উত্তেজনা, এবং ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে মতবিরোধ বাড়ছে। অনেক মার্কিন নাগরিক এখন প্রশ্ন করছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি আসলে কতটা নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করছে। এই প্রশ্নের ভেতরেই ইউএসএস লিবার্টি ঘটনার পুরনো বিতর্ক আবার সামনে এসেছে।
থমাস ম্যাসি নিজেও মার্কিন–ইসরায়েল সম্পর্ক নিয়ে সমালোচনামূলক অবস্থানের জন্য পরিচিত। তিনি ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সামরিক কাঠামোকে আরও ঘনিষ্ঠ করার প্রচেষ্টার সমালোচনা করেছেন। ফলে তার ইউএসএস লিবার্টি পুনঃতদন্তের দাবি শুধু অতীতের একটি ঘটনা নিয়ে নয়; এটি বর্তমান মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ওপরও রাজনৈতিক মন্তব্য।
তবে তার বক্তব্যের সমালোচনাও হয়েছে। রিপাবলিকান কংগ্রেস সদস্য ড্যান ক্রেনশোসহ ইসরায়েলপন্থী রাজনীতিকেরা ম্যাসির অবস্থানকে ভুল ও বিভ্রান্তিকর বলে মনে করেন। তাদের মতে, ঘটনার ব্যাখ্যা বহু আগেই পাওয়া গেছে এবং এখন সেটিকে নতুন করে উসকে দেওয়া অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু বেঁচে যাওয়া নাবিকদের জন্য বিষয়টি এত সহজ নয়। তাদের কাছে এটি শুধু ইতিহাস নয়; এটি ব্যক্তিগত যন্ত্রণা, হারানো সহযোদ্ধাদের স্মৃতি এবং রাষ্ট্রের কাছে স্বীকৃতির দাবি।
এই কারণেই ম্যাসির বক্তব্য বেঁচে যাওয়া নাবিকদের মধ্যে সাড়া ফেলেছে। তারা মনে করেন, বহু বছর পর অন্তত কেউ প্রতিনিধি পরিষদের মেঝেতে দাঁড়িয়ে তাদের গল্প বলেছে। তাদের ভাষায়, কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্য যে গল্প শুনতে চান না, সেটিই ম্যাসি তুলে ধরেছেন। এই প্রতিক্রিয়া বুঝিয়ে দেয়, ঘটনাটি শুধু অতীতের সামরিক নথিতে আটকে নেই; এটি এখনো জীবিত মানুষের স্মৃতি ও ক্ষোভের অংশ।
ইউএসএস লিবার্টি ঘটনার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো মিত্রতার সম্পর্কেও জবাবদিহি প্রয়োজন। কোনো রাষ্ট্র অন্য রাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেই তার কর্মকাণ্ড প্রশ্নাতীত হয়ে যায় না। আবার কোনো বিতর্কিত ঘটনার পুনঃতদন্তের দাবি উঠলেই সেটিকে অন্ধভাবে সত্য ধরে নেওয়াও দায়িত্বশীল অবস্থান নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছতা, নথি উন্মুক্তকরণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য মূল্যায়ন এবং নিরপেক্ষভাবে পুরো ঘটনার পুনর্বিবেচনা।
যদি হামলাটি সত্যিই ভুল হয়ে থাকে, তাহলে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত সেই ব্যাখ্যাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। আর যদি সরকারি ব্যাখ্যার বাইরে কোনো সত্য লুকিয়ে থাকে, তবে তা জানার অধিকার নিহতদের পরিবার, আহত নাবিক এবং মার্কিন জনগণের রয়েছে। ৫৯ বছর পরও এই দাবি অযৌক্তিক নয়, কারণ ইতিহাসের অনেক সত্য দেরিতে হলেও সামনে আসে।
শেষ পর্যন্ত ইউএসএস লিবার্টি হামলা শুধু ১৯৬৭ সালের একটি সামরিক ঘটনা নয়। এটি রাষ্ট্রীয় নীরবতা, মিত্রতার সীমা, যুদ্ধকালীন ভুল, গোয়েন্দা রাজনীতি এবং ন্যায়বিচারের দীর্ঘ অপেক্ষার গল্প। ৩৪ জন নিহত ও ১৭১ জন আহত মানুষের স্মৃতি এই প্রশ্নকে এখনো জীবিত রেখেছে। থমাস ম্যাসির নতুন দাবি সেই পুরনো প্রশ্নকে আবার সামনে এনেছে—সেদিন আসলে কী ঘটেছিল, এবং কেন এত বছর পরও পূর্ণ সত্য জানা গেল না?

