আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় অঙ্কের বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব দিয়েছে সরকার। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য মোট ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচন আয়োজন, ভোটার তালিকা হালনাগাদ, জাতীয় পরিচয়পত্র কার্যক্রম এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্যেই এই বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী নির্বাচন কমিশনের জন্য এই বরাদ্দের প্রস্তাব তুলে ধরেন।
প্রস্তাবিত বাজেটের হিসাব অনুযায়ী, মোট বরাদ্দের মধ্যে পরিচালন ব্যয়ের জন্য রাখা হয়েছে ৩ হাজার ৬৪৩ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। অন্যদিকে উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৭৫৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ নির্বাচন আয়োজনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
গত কয়েক বছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের বরাদ্দ ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেট ছিল ৪ হাজার ৩৪৫ কোটি ৬৫ লাখ ৮০ হাজার টাকা। এর আগের অর্থবছরে পরিচালন খাতে ৭৯৩ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন খাতে ৪৩৭ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল। ফলে নতুন অর্থবছরের বরাদ্দ নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ও কর্মপরিধি বৃদ্ধির বিষয়টিকেই প্রতিফলিত করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার নির্বাচন দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হন। তাই এসব নির্বাচন সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্যভাবে আয়োজন করতে প্রয়োজন হয় ব্যাপক প্রশাসনিক প্রস্তুতি, জনবল, প্রযুক্তি এবং আর্থিক সহায়তা।
আগামী অর্থবছরে নির্বাচন কমিশনের সামনে বড় ধরনের কর্মযজ্ঞ অপেক্ষা করছে। কমিশনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশের ৪ হাজার ৫৮১টি ইউনিয়ন পরিষদ, ৪৯৫টি উপজেলা পরিষদ, ৩৩০টি পৌরসভা, ৬১টি জেলা পরিষদ এবং ১৩টি সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পদে নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের উপনির্বাচনও পরিচালনা করতে হবে।
নির্বাচনী কার্যক্রমের বাইরে ভোটার সেবার ক্ষেত্রেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ছবিসহ ভোটার তালিকা হালনাগাদ, কাগজভিত্তিক লেমিনেটেড জাতীয় পরিচয়পত্র প্রস্তুত ও বিতরণ, স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র বিতরণ এবং নতুন ভোটার নিবন্ধন কার্যক্রম।
বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে তরুণদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও। আঠারো বছরের কম বয়সীদের প্রাক-নিবন্ধন কার্যক্রম চালু রাখা হবে, যাতে তারা ভোটার হওয়ার উপযুক্ত বয়সে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে সহজে জাতীয় পরিচয়পত্র পেতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নিবন্ধন কার্যক্রমও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা এবং তথ্য সংরক্ষণেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত তথ্যের সুরক্ষার জন্য আধুনিক সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন, তথ্য সংরক্ষণের জন্য বিশেষ আর্কাইভ গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তিগত অবকাঠামো শক্তিশালী করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা ইতোমধ্যে জানিয়েছেন, অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়কে ভোট আয়োজনের জন্য সবচেয়ে উপযোগী ধরা হচ্ছে। তবে কোন নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে এবং কোনটি পরে, সে বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সামগ্রিকভাবে বলা যায়, নতুন অর্থবছরের বাজেটে নির্বাচন কমিশনের জন্য বরাদ্দকৃত ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা শুধু নির্বাচন আয়োজনের জন্য নয়; বরং ভোটার সেবা উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও আধুনিক করার একটি বড় উদ্যোগের অংশ। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে থাকায় এই বরাদ্দ আগামী বছর দেশের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

