প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় সব দেশই জাতীয় বাজেট ঘোষণা করে। সাধারণভাবে বাজেটকে আমরা সরকারের আয়-ব্যয়ের হিসাব হিসেবে দেখি। কিন্তু বাস্তবে এটি শুধু সংখ্যার খাতা নয়। একটি দেশের বাজেট বলে দেয় সেই রাষ্ট্র কোন খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে এবং ভবিষ্যতের জন্য কী ধরনের অর্থনৈতিক পথ বেছে নিচ্ছে।
কোনো দেশ যদি স্বাস্থ্যসেবা ও পেনশনে বেশি ব্যয় করে, তাহলে বোঝা যায় সেখানে জনকল্যাণ ও প্রবীণ জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বড় অগ্রাধিকার। কোনো দেশ যদি প্রতিরক্ষায় বিপুল অর্থ বরাদ্দ করে, তাহলে তার নিরাপত্তা ভাবনা ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট হয়। আবার কোনো দেশ যদি অবকাঠামো, শিল্প ও প্রযুক্তিতে বেশি বিনিয়োগ করে, তাহলে বোঝা যায় তারা দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নজর দিচ্ছে।
বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শুধু বাজেটের আকারে নয়, ব্যয়ের চরিত্রেও বিরাট পার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট সবচেয়ে বড় হলেও তার সবচেয়ে বড় খরচ যুদ্ধ নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবা। চীন বিশাল অর্থ ব্যয় করছে অবকাঠামো, শিল্প ও প্রযুক্তিতে। জাপানকে সামলাতে হচ্ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বাড়তি চাপ। ইউরোপের অনেক দেশ কল্যাণমূলক ব্যয়ে এগিয়ে। ভারত উন্নয়ন ও অবকাঠামোকে সামনে রেখে বাজেট সাজাচ্ছে। আর মধ্যপ্রাচ্যের তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো ভবিষ্যতের অর্থনীতির জন্য নতুন খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র: সবচেয়ে বড় বাজেট, সবচেয়ে বড় দায়িত্ব
বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জাতীয় বাজেটের দেশ যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ অর্থবছরে দেশটির ফেডারেল সরকারের মোট ব্যয় ছিল প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর পরিমাণ ৮৫০ লাখ কোটি টাকারও বেশি। এই অঙ্ক বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের তুলনায় কয়েক ডজন গুণ বড়।
অনেকের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ যায় সামরিক খাতে। কিন্তু বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ব্যয় খাত হলো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। এই খাতে অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং বিভিন্ন ধরনের সুবিধাভোগীদের জন্য বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়।
এরপর রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা। মেডিকেয়ার ও মেডিকেইড কর্মসূচির মাধ্যমে প্রবীণ, নিম্নআয়ের মানুষ ও অসহায় জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা ব্যয়ের বড় অংশ বহন করা হয়। স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় যুক্তরাষ্ট্রের বাজেটে ক্রমাগত বড় চাপ তৈরি করছে, কারণ দেশটির চিকিৎসা ব্যয় অত্যন্ত বেশি এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যাও বাড়ছে।
তবে সামরিক ব্যয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বিশ্বের সবচেয়ে বড় শক্তি। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় ছিল প্রায় ৯২১ বিলিয়ন ডলার। এটি বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের প্রায় ৩৭ শতাংশ।
যুক্তরাষ্ট্র কেন এত বেশি সামরিক ব্যয় করে, তার পেছনে কয়েকটি বড় কারণ আছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়ায় সামরিক উপস্থিতি, মিত্র দেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, আধুনিক অস্ত্র প্রযুক্তি, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখার কৌশল—সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাজেট বিশাল আকার ধারণ করেছে।
চীন: অবকাঠামো, শিল্প ও প্রযুক্তিতে বড় বিনিয়োগ
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীনের সরকারি ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের সরকারি ব্যয় প্রায় ২৮ দশমিক ৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ান, অর্থাৎ প্রায় ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
চীনের বাজেটের চরিত্র যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে আলাদা। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে সামাজিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিশাল ব্যয় করে, চীন সেখানে অবকাঠামো, শিল্পায়ন, প্রযুক্তি এবং আঞ্চলিক উন্নয়নে বড় বিনিয়োগ করে। উচ্চগতির রেলপথ, সমুদ্রবন্দর, বিমানবন্দর, সড়ক, বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে চীনের বিনিয়োগ বিশ্বের মধ্যে অন্যতম বড়।
চীনের উন্নয়ন মডেলের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও সরকারি বিনিয়োগের ওপর জোর। দেশটি দীর্ঘদিন ধরে অবকাঠামোকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে। এর ফলে উৎপাদন, রপ্তানি, অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগ—সব ক্ষেত্রেই সরকার বড় ভূমিকা রাখছে।
তবে চীনের সামনে নতুন চাপও তৈরি হচ্ছে। দেশটির জনসংখ্যা দ্রুত বার্ধক্যের দিকে যাচ্ছে। কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর অনুপাত কমলে ভবিষ্যতে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয় বাড়বে। তাই চীনের বাজেটে এখন উন্নয়ন ব্যয়ের পাশাপাশি সামাজিক ব্যয়ের চাপও বাড়ছে।
প্রতিরক্ষায়ও চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ব্যয়কারী দেশ। ২০২৫ সালে দেশটির সামরিক ব্যয় প্রায় ২৫১ বিলিয়ন ডলার ছিল। দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ান, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে অবস্থান জোরদারের কারণে চীনের প্রতিরক্ষা ব্যয় ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
জাপান: প্রবীণ জনগোষ্ঠীর খরচ সামলানোর লড়াই
বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি জাপানের বাজেটের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হলো বার্ধক্য। দেশটির প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষের বয়স ৬৫ বছরের বেশি। এর ফলে পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
জাপানের জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশ যায় সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। প্রবীণদের চিকিৎসা, পেনশন ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা ব্যয় বছর বছর বাড়ছে। কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা কমে যাওয়া এবং বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া জাপানের অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করছে।
তবে শুধু সামাজিক ব্যয় নয়, প্রতিরক্ষা ব্যয়ও সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের বাজেটে বড় জায়গা পাচ্ছে। চীনের সামরিক উত্থান, উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি জাপানকে প্রতিরক্ষা খাতে বেশি বিনিয়োগে বাধ্য করছে।
জাপানের বাজেট তাই একদিকে প্রবীণ নাগরিকদের কল্যাণ রক্ষার লড়াই, অন্যদিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা।
জার্মানি: শৃঙ্খলাপূর্ণ ব্যয় থেকে নতুন বিনিয়োগে
ইউরোপের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি জার্মানি দীর্ঘদিন ধরে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও আর্থিক শৃঙ্খলার জন্য পরিচিত ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট, প্রতিরক্ষা দুর্বলতা এবং অবকাঠামোর পুরোনো সমস্যার কারণে জার্মানির বাজেট নীতি বদলাতে শুরু করেছে।
২০২৬ সালের প্রস্তাবিত বাজেট অনুযায়ী, জার্মানির সরকারি ব্যয় প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ইউরো। দেশটি এখন রেলপথ, সড়ক, ডিজিটাল অবকাঠামো, সবুজ জ্বালানি এবং প্রতিরক্ষা খাতে বড় বিনিয়োগের পথে হাঁটছে।
জার্মানির জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, কীভাবে অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রেখে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ বাড়ানো যায়। কারণ ইউরোপের শিল্পশক্তি হিসেবে টিকে থাকতে হলে জার্মানিকে প্রযুক্তি, জ্বালানি রূপান্তর এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতায় বড় পরিবর্তন আনতেই হবে।
যুক্তরাজ্য: স্বাস্থ্যসেবাই সবচেয়ে বড় চাপ
যুক্তরাজ্যের বাজেটে সবচেয়ে বড় ব্যয় খাত হলো জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা। এই স্বাস্থ্যব্যবস্থা দেশটির কল্যাণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ। নাগরিকদের জন্য সরকারি চিকিৎসা সুবিধা বজায় রাখতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা, স্থানীয় সরকার, আবাসন, পরিবহন এবং প্রতিরক্ষা খাতেও বড় বরাদ্দ থাকে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্বাস্থ্যসেবার ব্যয় বৃদ্ধি।
জনসংখ্যা ক্রমশ বয়স্ক হচ্ছে, চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে, অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা বেড়েছে এবং স্বাস্থ্যকর্মী সংকটও চাপ তৈরি করছে। ফলে যুক্তরাজ্যের বাজেট এখন অনেকটাই স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষার ওপর নির্ভরশীল।
ফ্রান্স: বড় কল্যাণ রাষ্ট্রের বড় খরচ
সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে ফ্রান্স ইউরোপের অন্যতম উদার রাষ্ট্র। দেশটি পেনশন, স্বাস্থ্যসেবা, বেকার ভাতা, আবাসন সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে।
ফ্রান্সের অর্থনীতিতে সরকারের ভূমিকা ইউরোপের অনেক দেশের তুলনায় বেশি। নাগরিক কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে সরকারি ব্যয় জিডিপির বড় অংশ দখল করে। আইএমএফ ও ওইসিডির তথ্য অনুযায়ী, ফ্রান্সের সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ৫৫ শতাংশ।
এর মানে হলো, দেশটির অর্থনীতিতে উৎপাদিত প্রতি ১০০ ইউরোর মধ্যে প্রায় ৫৫ ইউরো কোনো না কোনোভাবে সরকারি ব্যয়ের আওতায় আসে। এটি একদিকে ফ্রান্সের শক্তিশালী সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার পরিচয় দেয়, অন্যদিকে বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপও বাড়ায়।
ভারত: অবকাঠামো ও উন্নয়নমুখী বাজেট
বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশ ভারত সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অবকাঠামো উন্নয়নকে বাজেটের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। রেলপথ, এক্সপ্রেসওয়ে, বন্দর, বিমানবন্দর, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং উৎপাদনশীল শিল্পে বড় সরকারি বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
ভারতের বাজেটে উন্নয়ন ব্যয় একটি বড় রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। সরকার দেখাতে চায়, দ্রুত নগরায়ন, শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান এবং উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশকে উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে রাখা হবে।
তবে ভারতের বাজেট শুধু অবকাঠামোতে সীমাবদ্ধ নয়। কৃষি ভর্তুকি, খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি, গ্রামীণ উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা এবং প্রতিরক্ষায়ও বড় ব্যয় রয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেনাবাহিনী পরিচালনার কারণে ভারত বর্তমানে শীর্ষ সামরিক ব্যয়কারী দেশগুলোর একটি।
ভারতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিকে উন্নয়ন বিনিয়োগ বাড়ানো, অন্যদিকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ধরে রাখা। বিশাল জনসংখ্যার কারণে সামান্য নীতিগত পরিবর্তনও বাজেটে বড় প্রভাব ফেলে।
মধ্যপ্রাচ্য: তেল থেকে ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে
সৌদি আরব, কাতার এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোর বাজেট দীর্ঘদিন ধরে তেল ও গ্যাস আয়ের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তারা বুঝতে পেরেছে, শুধু তেলনির্ভর অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে নিরাপদ নয়।
এই কারণেই তারা অর্থনীতি বহুমুখী করার চেষ্টা করছে। পর্যটন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বন্দর, আর্থিক সেবা এবং নতুন শিল্প খাতে বড় বিনিয়োগ করা হচ্ছে।
সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ কর্মসূচি এই পরিবর্তনের বড় উদাহরণ। নিওম প্রকল্পসহ একাধিক বৃহৎ উন্নয়ন প্রকল্পে শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। লক্ষ্য হলো তেল-পরবর্তী যুগের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করা।
তবে এই ধরনের মেগা প্রকল্পের ঝুঁকিও আছে। তেলের দাম কমে গেলে রাজস্ব কমে যায়, আর বড় প্রকল্প চালিয়ে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। তাই মধ্যপ্রাচ্যের বাজেট এখন একদিকে বর্তমান তেল আয়ের ওপর দাঁড়িয়ে, অন্যদিকে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তার বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিচ্ছে।
শুধু বাজেটের আকার নয়, জিডিপির অনুপাতও গুরুত্বপূর্ণ
কোনো দেশের মোট বাজেট বড় হলেই যে সে অর্থনীতিতে সবচেয়ে বেশি হস্তক্ষেপ করছে, তা নয়। অর্থনীতিবিদরা তাই সরকারি ব্যয়-জিডিপি অনুপাত দেখে থাকেন। এতে বোঝা যায়, একটি দেশের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের কত অংশ সরকার ব্যয় করছে।
বড় অর্থনীতির মধ্যে ফ্রান্স এই ক্ষেত্রে শীর্ষে। দেশটির সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ৫৫ শতাংশ। ইতালিতে এই অনুপাত প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। বেলজিয়ামেও সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি।
জাপানে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৪০ শতাংশের বেশি। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর বাড়তি চাপ এর বড় কারণ। যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ৩৫ থেকে ৩৮ শতাংশের মধ্যে থাকলেও অর্থনীতির আকার এত বড় যে, প্রকৃত অর্থমূল্যে যুক্তরাষ্ট্রই বিশ্বের সবচেয়ে বড় সরকারি ব্যয়কারী।
এই তুলনা দেখায়, বাজেটের আকার ও অর্থনীতির অনুপাত—দুইটি আলাদা বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের বাজেট অঙ্কে সবচেয়ে বড়, কিন্তু ফ্রান্স বা ফিনল্যান্ডের মতো দেশে অর্থনীতির তুলনায় সরকারের ব্যয় অনেক বেশি।
ছোট অর্থনীতি, বড় কল্যাণ ব্যয়
বিশ্বের সর্বোচ্চ সরকারি ব্যয়কারী দেশগুলোর মধ্যে অনেক ছোট অর্থনীতিও আছে। ফিনল্যান্ড, ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, আইসল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গ এর ভালো উদাহরণ।
ফিনল্যান্ডে সরকারি ব্যয় জিডিপির ৫৫ শতাংশেরও বেশি। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, শিশু কল্যাণ এবং সামাজিক নিরাপত্তায় দেশটি বড় সরকারি সহায়তা দেয়। ডেনমার্কে সরকারি ব্যয় জিডিপির প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি। উচ্চ করের বিনিময়ে নাগরিকরা বিস্তৃত সামাজিক সুবিধা পান।
নরওয়ে তেল ও গ্যাস আয়কে ব্যবহার করে বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী কল্যাণ রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। সুইডেন স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, পরিবারকল্যাণ এবং শিশু পরিচর্যায় বড় ব্যয়ের জন্য পরিচিত। আইসল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গের জনসংখ্যা কম হলেও মাথাপিছু সরকারি ব্যয়ের দিক থেকে তারা বিশ্বের শীর্ষ পর্যায়ে রয়েছে।
এই দেশগুলো দেখায়, ছোট অর্থনীতি হলেও শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থা ও কার্যকর প্রশাসন থাকলে নাগরিক কল্যাণে বড় ব্যয় করা সম্ভব।
কারা উদ্বৃত্ত বাজেট ধরে রাখতে পারে
বর্তমান বিশ্বে অধিকাংশ দেশই ঘাটতি বাজেটে চলে। অর্থাৎ সরকার যত আয় করে, তার চেয়ে বেশি ব্যয় করে। তবে কিছু দেশ নিয়মিতভাবে উদ্বৃত্ত বাজেট ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে।
নরওয়ে এর সবচেয়ে সফল উদাহরণ। উত্তর সাগরের তেল ও গ্যাস থেকে অর্জিত রাজস্ব এবং বিশ্বের বৃহত্তম সার্বভৌম সম্পদ তহবিলের কারণে দেশটি প্রায়ই জিডিপির ১০ শতাংশেরও বেশি উদ্বৃত্ত অর্জন করে।
সিঙ্গাপুর দীর্ঘমেয়াদে ভারসাম্যপূর্ণ বাজেট পরিচালনার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা অনুসরণ করে। রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়ও দেশটির সরকারি অর্থনীতিকে শক্তিশালী করে।
সুইজারল্যান্ড কঠোর আর্থিক শৃঙ্খলা ও ডেবট ব্রেক নীতির কারণে সাধারণত বড় ঘাটতিতে পড়ে না। কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাত তেলের আন্তর্জাতিক মূল্য অনুকূলে থাকলে নিয়মিতভাবে উদ্বৃত্ত বাজেট অর্জন করতে পারে।
উদ্বৃত্ত বাজেট মানে শুধু আয় বেশি হওয়া নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদ বা বিনিয়োগ আয়ের সঠিক ব্যবস্থাপনার ফল।
কারা বড় ঘাটতির চাপে
বিশ্বের সবচেয়ে বড় বাজেট ঘাটতিগুলোর একটি যুক্তরাষ্ট্রের। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটির বার্ষিক ঘাটতি প্রায় ১ দশমিক ৫ থেকে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের মধ্যে ওঠানামা করছে। বিশাল সামাজিক ব্যয়, সামরিক ব্যয়, ঋণের সুদ এবং করনীতির কারণে এই ঘাটতি বড় হয়ে উঠেছে।
জাপান বহু বছর ধরে ঘাটতি বাজেট পরিচালনা করছে। বিশ্বের সর্বোচ্চ সরকারি ঋণ-জিডিপি অনুপাতের দেশ হিসেবে জাপানের ওপর ঋণের চাপ অত্যন্ত বেশি। তবে দেশটির ঋণের বড় অংশ অভ্যন্তরীণভাবে ধারণ করা হওয়ায় পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা।
ফ্রান্স ও ইতালিও দীর্ঘদিন ধরে ঘাটতির চাপে আছে। উচ্চ সামাজিক ব্যয়, ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং ঋণের সুদ পরিশোধ তাদের বাজেটকে ভারী করে তুলেছে।
ঘাটতি সবসময় খারাপ নয়। উন্নয়ন, যুদ্ধ, মহামারি বা অর্থনৈতিক মন্দার সময় সরকার ঘাটতি ব্যয় বাড়াতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আয় না বাড়লে এবং উৎপাদনশীল বিনিয়োগ না হলে ঘাটতি ঋণের বোঝা বাড়িয়ে দেয়।
বাজেট আসলে কী বলে
বিশ্বের বাজেট চিত্র বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—বড় বাজেট মানেই শুধু বড় অর্থনীতি নয়, বরং বড় দায়িত্বও। যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক সামরিক নেতৃত্ব ও সামাজিক নিরাপত্তা ধরে রাখতে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে। চীন শিল্প, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো দিয়ে ভবিষ্যতের শক্তি তৈরি করতে চাইছে। ইউরোপের দেশগুলো নাগরিক কল্যাণ ও সামাজিক নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে। জাপান বার্ধক্যের খরচ সামলাচ্ছে। ভারত উন্নয়ন ও অবকাঠামোকে প্রবৃদ্ধির চালিকা শক্তি বানাতে চাইছে। আর নরওয়ে, সিঙ্গাপুর ও সুইজারল্যান্ডের মতো দেশগুলো আর্থিক শৃঙ্খলার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ধরে রাখছে।
জাতীয় বাজেট তাই শুধু অর্থের হিসাব নয়। এটি একটি দেশের রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক চুক্তি, নিরাপত্তা ভাবনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার আয়না। কোথায় কত টাকা বরাদ্দ হলো, সেটি দেখলেই বোঝা যায়—একটি রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জন্য কী ভাবছে, নিজের নিরাপত্তা কীভাবে দেখছে এবং আগামী দিনের অর্থনীতি কোথায় নিয়ে যেতে চাইছে।
শেষ পর্যন্ত বাজেটের অঙ্ক যত বড়ই হোক, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেই অর্থ মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন আনছে। কারণ সফল বাজেট শুধু বড় খরচের নাম নয়; সফল বাজেট হলো এমন ব্যয়, যা নাগরিকের নিরাপত্তা, সুযোগ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং ভবিষ্যৎকে আরও শক্তিশালী করে।

