মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে কখনো স্থায়ী বন্ধু নেই, আবার স্থায়ী শত্রুও নেই—এই কথাটি তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্কের দিকে তাকালে নতুন করে বোঝা যায়। একসময় যে দুই দেশ সামরিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার মাধ্যমে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, আজ সেই সম্পর্ক গভীর সন্দেহ, তীব্র বাকযুদ্ধ এবং সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কায় ঘেরা।
সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকদের আলোচনায় একটি প্রশ্ন বারবার ফিরে আসছে—ইরান ও লেবাননের পর ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য কি তুরস্ক হতে পারে? প্রশ্নটি অনেকের কাছে অবাক করার মতো শোনালেও মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি, ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, গাজা যুদ্ধ, সিরিয়া ও লেবাননে হামলা, তুরস্কের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং এরদোয়ান-নেতানিয়াহু দ্বন্দ্ব মিলিয়ে বিষয়টি আর একেবারে অমূলক বলে উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষ করে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হওয়ার খবর সামনে আসার পর এই আশঙ্কা আরও আলোচিত হচ্ছে। জরিপ তথ্য অনুযায়ী, মাত্র ৫০ দিন আগেও নেতানিয়াহুর প্রতি জনসমর্থন ছিল প্রায় ৫১ শতাংশ। এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৩ শতাংশে। গত ১১ জুন সিএনএনের এক প্রতিবেদনে এমন জরিপ তুলে ধরে মন্তব্য করা হয় যে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভাগ্য যেন গভীর সংকটে পড়েছে। এর আগে ৯ জুন টাইমস অব ইসরায়েলের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, ৬১ শতাংশ ইসরায়েলি নেতানিয়াহুকে আগামী নির্বাচনে দেখতে চায় না। একই সংখ্যক ইসরায়েলি মনে করে, কেউ দুইবারের বেশি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী হওয়া উচিত নয়।
এই রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকেই বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, নিজের ক্ষমতা ও রাজনৈতিক অবস্থান ধরে রাখতে নেতানিয়াহু নতুন সংঘাতের পথ বেছে নিতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে ইসরায়েল যে একাধিক ফ্রন্টে সক্রিয়, তা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ১৪ জুন ইসরায়েলের প্রাচীন দৈনিক হারেৎজের এক সংবাদ শিরোনামে এমন আশঙ্কাই প্রতিফলিত হয়। সেখানে বলা হয়, নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যে নতুন আগুন জ্বালিয়ে দিতে পারেন।
ইসরায়েলের রাজনীতিতে নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে শক্তিশালী নেতা হিসেবে পরিচিত। প্রায় ২০ বছর ধরে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা এই কট্টর ডানপন্থি নেতা নিরাপত্তা, সামরিক শক্তি এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত। কিন্তু গাজা যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক চাপ, অভ্যন্তরীণ ক্ষোভ এবং যুদ্ধ-পরবর্তী ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তার জনপ্রিয়তাকে বড়ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
ইসরায়েলের ভেতরে এখন প্রশ্ন উঠছে, নেতানিয়াহু কি দেশের নিরাপত্তা রক্ষার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন, নাকি নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য সংঘাত দীর্ঘায়িত করছেন? এই প্রশ্নের সরল উত্তর নেই। তবে ইতিহাস বলছে, রাজনৈতিক সংকটে থাকা নেতারা কখনো কখনো বাইরের সংঘাতকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। নেতানিয়াহুর ক্ষেত্রেও এমন আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার খবরও নেতানিয়াহুর জন্য স্বস্তিকর নয় বলে অনেকে মনে করছেন। কারণ তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইরানকে ইসরায়েলের প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরেছেন। যদি ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতা এগোয়, তাহলে নেতানিয়াহুর কঠোর নিরাপত্তা বয়ানের একটি অংশ দুর্বল হয়ে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন শত্রু বা নতুন সংঘাতের প্রশ্ন সামনে আসা অস্বাভাবিক নয়।
প্রশ্ন হলো, ইসরায়েলের সম্ভাব্য সংঘাতের আলোচনায় তুরস্কের নাম কেন আসছে? তুরস্ক তো ন্যাটোর সদস্য। আবার ইতিহাসে দেখা যায়, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে তুরস্কই প্রথম ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। দীর্ঘদিন তুরস্ক ও ইসরায়েল পশ্চিমা নিরাপত্তা কাঠামোর অংশীদার হিসেবেও বিবেচিত হয়েছে। তাহলে আজ কেন দুই দেশের সম্পর্ক এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে?
এর উত্তর খুঁজতে হলে ইতিহাসে ফিরে তাকাতে হয়। তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্ক কখনো সরলরেখায় চলেনি। কখনো ছিল সহযোগিতা, কখনো সন্দেহ, কখনো উত্তেজনা, আবার কখনো পুনর্মিলনের চেষ্টা। কিন্তু গাজা, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, আঞ্চলিক প্রভাব এবং এরদোয়ানের রাজনৈতিক অবস্থান এই সম্পর্ককে ধীরে ধীরে তিক্ত করে তুলেছে।
১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর আরব ও মুসলিম বিশ্বের বড় অংশ এর বিরোধিতা করে। কিন্তু তুরস্ক ভিন্ন পথ নেয়। ১৯৪৯ সালে তুরস্ক প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে ছিল তৎকালীন আঞ্চলিক বাস্তবতা, পশ্চিমা জোটের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক এবং আরব রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে ঐতিহাসিক দূরত্ব।
স্বীকৃতির পরের বছর তুরস্ক তেল আবিবে কূটনৈতিক কার্যালয় খোলে। ১৯৫৬ সালে সুয়েজ খাল সংকট বা দ্বিতীয় আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় তুরস্ক সেই কার্যালয়ের গুরুত্ব কমালেও সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করেনি। ১৯৫৮ সালের আগস্টে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেন গুরিয়ন তুরস্ক সফর করেন। তিনি তৎকালীন তুর্কি প্রধানমন্ত্রী আদনান মেনদেরেসের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেই বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতার পথ আরও পরিষ্কার হয়।
১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে তুরস্ক ইসরায়েলের সমালোচনা করলেও সম্পর্ক ভাঙেনি। আরব দেশগুলোর অনুরোধ সত্ত্বেও আঙ্কারা ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। ১৯৮০ সালে তুরস্ক তেল আবিবে তাদের কূটনৈতিক কার্যালয়কে পূর্ণ মর্যাদার দূতাবাসে উন্নীত করে। তবে ইসরায়েল জেরুসালেমকে তাদের চিরন্তন রাজধানী ঘোষণা করলে তুরস্ক সেই দূতাবাস মর্যাদা প্রত্যাহার করে নেয়।
১৯৯০-এর দশকে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি প্রক্রিয়া শুরু হলে সম্পর্ক আবার উষ্ণ হতে থাকে। তুরস্ক তেল আবিবে রাষ্ট্রদূত পাঠায়। ১৯৯৩ সালে তুর্কি প্রধানমন্ত্রী তানসু জিলার ইসরায়েল সফর করেন। তিন বছর পর তুরস্কের রাষ্ট্রপতি সুলেমান ডেমিরেলও ইসরায়েল সফরে যান। ১৯৯৬ সালে তুরস্ক ও ইসরায়েলের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা ও বাণিজ্য চুক্তি হয়। এই সময় দুই দেশের সম্পর্ক সামরিক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার দিক থেকে যথেষ্ট ঘনিষ্ঠ ছিল।
২০০২ সালে একে পার্টি ক্ষমতায় আসার পর অনেকে ধারণা করেছিলেন, ইসলামপন্থি ভাবধারার কারণে তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্ক দ্রুত খারাপ হবে। কিন্তু শুরুতে তা হয়নি। বরং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তাইয়েব এরদোয়ান ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি গ্রহণ করেন।
২০০৫ সালে এরদোয়ান ইসরায়েল সফর করেন। তিনি ইসরায়েলের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারনের সঙ্গে বৈঠক করেন এবং ইহুদি-বিদ্বেষকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে দেখার কথা বলেন। এমনকি তিনি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ইসরায়েলের সংলাপের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা রাখার আগ্রহও প্রকাশ করেন।
২০০৭ সালের নভেম্বরে ইসরায়েলের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শিমন পেরেস তুরস্ক সফর করেন এবং তুরস্কের পার্লামেন্টে বক্তব্য দেন। সেটি ছিল প্রতীকীভাবে খুব গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কারণ একজন ইসরায়েলি নেতা তুরস্কের সংসদে বক্তব্য রাখছেন—এটি দুই দেশের সম্পর্কের গভীরতা বোঝাত।
কিন্তু একই সময়ের কাছাকাছি গাজা ইস্যু ক্রমেই তুরস্কের জনমত ও এরদোয়ানের রাজনীতিতে বড় জায়গা নিতে শুরু করে। এখান থেকেই সম্পর্কের ভাঙন শুরু হয়।
২০০৭ সালের পর গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্ককে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে থাকে। ইসরায়েল গাজায় নৌ অবরোধ জোরদার করলে খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট তীব্র হয়। তুরস্কের জনমত ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনিদের পক্ষে এবং ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আরও জোরালো হয়ে ওঠে।
২০০৮ সালের ডিসেম্বরে ইসরায়েল গাজায় নতুন করে হামলা শুরু করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের হিসেবে, তিন সপ্তাহের হামলায় শিশুসহ এক হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হন। এই ঘটনা তুরস্কে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
২০০৯ সালে সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক অনুষ্ঠানে এরদোয়ান ও শিমন পেরেসের প্রকাশ্য বাগবিতণ্ডা দুই দেশের সম্পর্কে মোড় ঘুরিয়ে দেয়। গাজায় ইসরায়েলি হামলার প্রতিবাদে এরদোয়ান কঠোর ভাষায় প্রতিক্রিয়া জানান। পরে দাভোস থেকে ইস্তানবুলে ফিরে গেলে তাকে তুরস্কে বীরের সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সমর্থকেরা তুরস্ক ও ফিলিস্তিনের পতাকা নিয়ে তাকে স্বাগত জানায়।
এই ঘটনা এরদোয়ানের অভ্যন্তরীণ জনপ্রিয়তাকে বাড়ায় এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে তাকে মুসলিম বিশ্বের একজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ হিসেবে তুলে ধরে। কিন্তু একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের ভাঙন আরও দৃশ্যমান হয়।
২০১০ সালে আন্তর্জাতিক জলসীমায় গাজা ফ্রিডম ফ্লোটিলায় ইসরায়েলি সেনাদের হামলায় ১০ তুর্কি নিহত হন। এই ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কে বড় ধাক্কা দেয়। তুরস্ক তেল আবিব থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত ফিরিয়ে আনে। এরদোয়ান এই হামলাকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যা দেন।
পরের বছর তুরস্ক ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে। ফলে কূটনৈতিক সম্পর্ক কার্যত তলানিতে নেমে যায়। যদিও পরে তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রপতি বারাক ওবামার মধ্যস্থতায় নেতানিয়াহু ফোনে এরদোয়ানের কাছে ক্ষমা চান এবং ক্ষতিপূরণ হিসেবে ২০ মিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করেন। গাজার ওপর নিষেধাজ্ঞা কিছুটা শিথিল করতেও ইসরায়েল রাজি হয়।
এর ফলে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পথ তৈরি হলেও আস্থার সংকট কাটেনি। ২০১৫ সালে তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইতালির রোমে ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে গোপন বৈঠকের কথা স্বীকার করেন। ২০১৬ সালে দুই দেশ সম্পর্ক উন্নয়নের নতুন চুক্তির ঘোষণা দেয়। কিন্তু সেই স্বাভাবিকতা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র জেরুসালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিলে তুরস্ক কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। একই সময় ইসরায়েল গাজায় নতুন করে হামলা শুরু করলে আঙ্কারা আরও ক্ষুব্ধ হয়। তুরস্ক তেল আবিব থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত ফিরিয়ে আনে এবং আঙ্কারা থেকে ইসরায়েলের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করে।
২০২২ সালের মার্চে ইসরায়েলের রাষ্ট্রপতি ইসাক হারগজ তুরস্ক সফর করলে সম্পর্ক আবার কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করে। সে বছর দুই দেশ আবার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করে। রাষ্ট্রদূতরা নিজ নিজ রাজধানীতে ফিরে যান। কিন্তু ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের রক্তক্ষয়ী হামলার পর ইসরায়েল গাজায় সর্বাত্মক হামলা শুরু করলে তুরস্ক-ইসরায়েল সম্পর্ক আবার ভেঙে পড়ে।
গাজায় ইসরায়েলি হামলার বিরুদ্ধে এরদোয়ান কঠোর অবস্থান নেন। তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করে দেয়। পরের বছর তেল আবিবের সঙ্গে সব ধরনের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণাও আসে। ফলে পুরোনো বন্ধুত্ব আবারও গভীর বৈরিতায় পরিণত হয়।
২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি জেরুসালেম ইনস্টিটিউট অব জাস্টিসের এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়—তুরস্ক কি ইসরায়েলের পরবর্তী শীর্ষ শত্রু হয়ে উঠছে? প্রতিবেদনে সিরিয়ার ঘটনাপ্রবাহ, তুরস্ক-সমর্থিত বিদ্রোহীদের ভূমিকা এবং এরদোয়ানের আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রসঙ্গ আনা হয়।
সিরিয়ায় বাশার আল আসাদ সরকারের পতনের পর তুরস্কের প্রভাব বেড়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। আঙ্কারা সিরিয়া, ককেশাস, ভূমধ্যসাগর, লিবিয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে চাইছে। ইসরায়েলের নীতিনির্ধারকদের একাংশের চোখে এই তুর্কি প্রভাব ভবিষ্যতের নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিতে পারে।
ইরানের মতো তুরস্কও মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করতে চায়—এমন ধারণা ইসরায়েলি নিরাপত্তা মহলের একাংশে শক্তিশালী হচ্ছে। তবে পার্থক্য হলো, তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য, শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর অধিকারী এবং আঞ্চলিক রাজনীতিতে বহুস্তরীয় সম্পর্কের খেলোয়াড়। ফলে তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত ইসরায়েলের জন্য সহজ বা কম ঝুঁকির বিষয় হবে না।
গত ২৫ মার্চ রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরটির এক প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়, ইরানের পর তুরস্ক কি ইসরায়েলের পরবর্তী লক্ষ্য হতে পারে? প্রতিবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়, ইরানে বড় আঘাত এলে মধ্যপ্রাচ্যের ভারসাম্য আরও অস্থির হয়ে উঠবে এবং সেই অস্থিরতার পরবর্তী কেন্দ্র হতে পারে আঙ্কারা।
এর আগে ৪ মার্চ একই সংবাদমাধ্যমে বলা হয়, তুরস্ক ইসরায়েলের হুমকির আওতায় পড়েছে। সেখানে প্রশ্ন ছিল, ইরানকে করায়ত্ত করার পর ইসরায়েল কি তুরস্ককে নিশানা করবে?
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটও তুরস্ককে নতুন হুমকি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার অভিযোগ, তুরস্ক শুধু ইরানকে সমর্থন করছে না, মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের চোখে সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচিত বিভিন্ন গোষ্ঠীকেও সমর্থন দিচ্ছে। তিনি তুরস্কের বিষয়ে ইসরায়েল ও তার মিত্রদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
এই ধরনের বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত মত নয়; এগুলো ইসরায়েলি নিরাপত্তা চিন্তার এক নতুন ধারা বোঝায়। সেখানে তুরস্ককে আর শুধু পুরোনো মিত্র হিসেবে দেখা হচ্ছে না, বরং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
তুরস্কও ইসরায়েলের কার্যক্রমকে সরাসরি নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। গত ১০ জুন রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এরদোয়ান বলেছেন, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা তুরস্কের জন্যও হুমকি তৈরি করছে।
এরদোয়ানের মতে, ইসরায়েলের আগ্রাসন শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক। তিনি ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। একই দিনে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড এরদোয়ানের বক্তব্য তুলে ধরে জানায়, তুরস্ক ও ভূমধ্যসাগরে তুর্কি-অধ্যুষিত উত্তর সাইপ্রাসের স্বার্থে কোনো হামলা হলে আঙ্কারা কঠোর ব্যবস্থা নেবে।
এই বক্তব্যে দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, তুরস্ক ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রমকে শুধু ফিলিস্তিন বা সিরিয়ার বিষয় হিসেবে দেখছে না। দ্বিতীয়ত, আঙ্কারা ভূমধ্যসাগর ও উত্তর সাইপ্রাসের নিরাপত্তাকেও সরাসরি জাতীয় স্বার্থের অংশ হিসেবে সামনে আনছে।
হারেৎজের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এরদোয়ান তুরস্কের নেতৃত্বে নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা বা শাসন কাঠামোর স্বপ্ন দেখছেন। তুরস্ক চায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিরাপত্তার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসুক।
এই অবস্থান ইসরায়েলের জন্য অস্বস্তিকর হতে পারে। কারণ মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ভেতরেই ইসরায়েলের কৌশলগত সুবিধা দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে। যদি তুরস্ক আরব ও মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে নতুন নেতৃত্বের অবস্থান তৈরি করতে পারে, তাহলে তা ইসরায়েলের আঞ্চলিক অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।
তবে বাস্তবতা হলো, তুরস্কের এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা সহজ নয়। আরব বিশ্বে তুরস্কের প্রতি আস্থা সর্বত্র সমান নয়। সৌদি আরব, মিসর, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে তুরস্কের সম্পর্ক বহুবার ওঠানামা করেছে। কিন্তু গাজা ইস্যুতে এরদোয়ানের উচ্চকণ্ঠ অবস্থান তাকে মুসলিম বিশ্বের একাংশে জনপ্রিয়তা দিয়েছে।
এখন বড় প্রশ্ন—তুরস্ক ও ইসরায়েল কি সত্যিই সরাসরি সামরিক সংঘর্ষে জড়াতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর জটিল।
একদিকে দুই দেশের মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক শত্রুতা তৈরি হয়েছে। গাজা, সিরিয়া, লেবানন, উত্তর সাইপ্রাস, ভূমধ্যসাগর এবং আঞ্চলিক প্রভাবের প্রশ্নে তাদের অবস্থান ক্রমেই বিপরীত দিকে যাচ্ছে। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক সংকট এবং এরদোয়ানের শক্তিশালী আঞ্চলিক ভাষণ পরিস্থিতিকে আরও উত্তেজনাপূর্ণ করছে।
অন্যদিকে সরাসরি যুদ্ধের ঝুঁকি অত্যন্ত বড়। তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য। তুরস্কের সামরিক বাহিনী শক্তিশালী। দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল যদি তুরস্কের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়ায়, তাহলে তা শুধু দুই দেশের যুদ্ধ থাকবে না; তা ন্যাটো, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ইরান, আরব দেশ এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোকেও নতুন হিসাব-নিকাশে বাধ্য করবে।
তাই পূর্ণমাত্রার সরাসরি যুদ্ধ এখনো কম সম্ভাব্য বলে মনে হলেও সীমিত সংঘাত, গোয়েন্দা অভিযান, সাইবার আক্রমণ, আঞ্চলিক মিত্রদের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি, সিরিয়া বা লেবাননের মাটিতে পরোক্ষ সংঘর্ষ—এসব ঝুঁকি একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
১০ জুন দ্য জেরুসালেম পোস্টের এক বিশ্লেষণে প্রশ্ন তোলা হয়—তুরস্ক ও ইসরায়েলের বাকযুদ্ধ কি নতুন সংকট তৈরি করছে? এই প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সংঘাত সরাসরি যুদ্ধ দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় ভাষা, অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, নিরাপত্তা শঙ্কা এবং ভুল বোঝাবুঝি দিয়ে।
যখন দুই পক্ষই একে অপরকে নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে তুলে ধরে, তখন সামরিক প্রস্তুতি বাড়ে। সামরিক প্রস্তুতি বাড়লে ভুল হিসাবের ঝুঁকি বাড়ে। আর ভুল হিসাব বড় সংঘাত ডেকে আনতে পারে। তুরস্ক ও ইসরায়েলের বর্তমান অবস্থান সেই ঝুঁকির দিকেই ইঙ্গিত করছে।
তবে সম্পর্ক যতই তিক্ত হোক, অর্থনীতি সবসময় সংঘাতের পথে বাধা হিসেবে কাজ করে। অতীতে দেখা গেছে, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যেও তুরস্ক ও ইসরায়েলের বাণিজ্য পুরোপুরি থেমে যায়নি। ২০১০ সালের তুলনায় ২০১১ সালে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ২৬ শতাংশ বেড়েছিল। ২০১৩ ও ২০১৪ সালেও বেশি সংখ্যক তুর্কি পর্যটক ইসরায়েলে গিয়েছিলেন।
এই ইতিহাস দেখায়, দুই দেশের সম্পর্ক শুধু আদর্শ বা রাজনীতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সেখানে কাজ করে। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে তুরস্ক ইসরায়েলের সঙ্গে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ করেছে, তবু দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বার্থ দুই দেশের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য এখন একাধিক সংকটে জর্জরিত। গাজা যুদ্ধ চলমান। লেবানন সীমান্তে উত্তেজনা আছে। ইরান ও ইসরায়েলের দ্বন্দ্ব ক্রমেই বিপজ্জনক আকার নিচ্ছে। সিরিয়ার রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলাচ্ছে। এই অবস্থায় তুরস্ক নিজেকে শুধু দর্শক হিসেবে রাখতে চায় না।
আঙ্কারা নিজেকে আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। অন্যদিকে ইসরায়েল চায়, তার নিরাপত্তা পরিধি ও সামরিক আধিপত্য বজায় থাকুক। এই দুই লক্ষ্য একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়াতে পারে। বিশেষ করে সিরিয়া, ভূমধ্যসাগর ও ফিলিস্তিন প্রশ্নে দুই দেশের স্বার্থ সরাসরি বিপরীতমুখী হয়ে উঠছে।
নেতানিয়াহু ও এরদোয়ান দুজনই নিজ নিজ দেশে শক্তিশালী, বিতর্কিত এবং দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক চরিত্র। দুজনই জাতীয়তাবাদী ভাষা ব্যবহার করেন। দুজনই নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক মর্যাদার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিতে পছন্দ করেন। এই ব্যক্তিত্বগত বৈশিষ্ট্যও দুই দেশের উত্তেজনাকে বাড়িয়ে তুলতে পারে।
নেতানিয়াহুর সামনে আছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ, জনপ্রিয়তা কমে যাওয়া এবং যুদ্ধের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন। এরদোয়ানের সামনে আছে তুরস্কের অর্থনৈতিক চাপ, আঞ্চলিক নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে জনমতের প্রত্যাশা। ফলে দুই নেতার রাজনৈতিক ভাষা অনেক সময় বাস্তব সংঘাতের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
তুরস্ক ও ইসরায়েলের সম্পর্ক একসময় কৌশলগত সহযোগিতার উদাহরণ ছিল। ১৯৪৯ সালে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়া থেকে শুরু করে ১৯৯৬ সালের কৌশলগত সহযোগিতা, ২০০৫ সালে এরদোয়ানের ইসরায়েল সফর, ২০০৭ সালে শিমন পেরেসের তুরস্ক সফর—সব মিলিয়ে দুই দেশ দীর্ঘ সময় ঘনিষ্ঠতার পথেই চলেছিল।
কিন্তু গাজা, ফ্লোটিলা হামলা, জেরুসালেম ইস্যু, সিরিয়া, লেবানন, ফিলিস্তিন প্রশ্ন এবং আঞ্চলিক নেতৃত্বের প্রতিদ্বন্দ্বিতা সেই সম্পর্ককে পাল্টে দিয়েছে। আজ দুই দেশ একে অপরকে সম্ভাব্য হুমকি হিসেবে দেখছে। ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং নেতানিয়াহুর দুর্বল অবস্থান এই উত্তেজনাকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
এখনও সরাসরি তুরস্ক-ইসরায়েল যুদ্ধ নিশ্চিত নয়। বরং তা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এবং জটিল। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, দুই দেশের সম্পর্ক বিপজ্জনক মাত্রায় তিক্ত হয়েছে। বাকযুদ্ধ, সামরিক সতর্কতা, আঞ্চলিক সংঘাত এবং ভুল হিসাবের মিশ্রণে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।
তাই প্রশ্নটি এখন শুধু “এরপর তুরস্ক?” নয়। বড় প্রশ্ন হলো—মধ্যপ্রাচ্য কি আরেকটি বড় সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে? আর যদি তা হয়, তবে সেটি শুধু তুরস্ক বা ইসরায়েলের জন্য নয়, পুরো অঞ্চল এবং বিশ্ব রাজনীতির জন্য নতুন অস্থিরতার দরজা খুলে দিতে পারে।

