বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাধারণত যুদ্ধ, সরবরাহ সংকট, নিষেধাজ্ঞা কিংবা বড় কোনো বাণিজ্যপথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার খবরেই দ্রুত লাফিয়ে ওঠে। কিন্তু সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি ঘিরে অনিশ্চয়তার মধ্যেও তেলের দাম যতটা বাড়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা হয়নি। এর পেছনে বড় একটি কারণ হিসেবে বিশ্লেষকেরা বারবার একটি দেশের দিকে ইঙ্গিত করছেন—চীন।
চীন সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনার টেবিলে নেই। কিন্তু তেলের বাজারে দেশটির প্রভাব এতটাই বড় যে, হরমুজ প্রণালি কত দ্রুত খুলবে বা মধ্যপ্রাচ্যের তেল সরবরাহ কত দ্রুত স্বাভাবিক হবে—তার পাশাপাশি চীনের সিদ্ধান্তও এখন দামের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চীন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেল ভোক্তা। ফলে দেশটি কত তেল কিনছে, কতটা মজুত ব্যবহার করছে, কতটা আমদানি কমাচ্ছে এবং কত দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে এগোচ্ছে—এসব প্রশ্ন এখন শুধু চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির বিষয় নয়; এগুলো পুরো বৈশ্বিক তেলবাজারের হিসাব বদলে দিতে পারে।
ইরান যুদ্ধের কারণে দিনে ১১ মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেলের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে বলে বলা হচ্ছে। সাধারণ পরিস্থিতিতে এমন সরবরাহ ধাক্কা তেলের দামকে ভয়াবহভাবে বাড়িয়ে দিতে পারত। কিছু বিশ্লেষক এমনও আশঙ্কা করেছিলেন যে, এ বছর তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার পর্যন্ত ছুঁতে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্র তুলনামূলকভাবে শান্ত। তিন মাসের বেশি যুদ্ধ চলার পরও মোট আনুমানিক সরবরাহ ক্ষতি ১ বিলিয়ন ব্যারেল ছাড়িয়ে গেলেও বাজারে সেই মাত্রার আতঙ্ক দেখা যায়নি।
সোমবার বৈশ্বিক মানদণ্ড ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারের নিচে নেমে আসে। এর পেছনে বড় কারণ ছিল এই প্রত্যাশা যে, বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল যেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করে, তা শিগগিরই স্বাভাবিক বাণিজ্যের জন্য খুলে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলার আগের সপ্তাহগুলোতে ব্রেন্ট তেল ব্যারেলপ্রতি ৭০ ডলারের নিচে ছিল। আবার মে মাসের শুরুর দিকে এটি চার বছরের সর্বোচ্চ ১১৪ ডলারে স্থির হয়েছিল।
এই ওঠানামার মাঝেও বাজার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণের বাইরে যায়নি। অনেক বিশ্লেষকের মতে, চীন একধরনের ভারসাম্য রক্ষাকারী শক্তি হিসেবে কাজ করেছে।
চীনের এই ভূমিকা বোঝার জন্য ১৯৭৩ সালের আরব তেল নিষেধাজ্ঞার সঙ্গে তুলনা করা যায়। সোসিয়েতে জেনেরালের বিশ্লেষকেরা চলতি মাসের শুরুর দিকে এক গবেষণা নোটে উল্লেখ করেছেন, ১৯৭৩ সালে বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে ৭% ক্ষতি তেলের দাম ১৩৪% বাড়িয়ে দিয়েছিল। অথচ বর্তমান ইরান যুদ্ধ ১৪% বৈশ্বিক সরবরাহে প্রভাব ফেললেও দাম সেই মাত্রায় বাড়েনি। এই পার্থক্যের পেছনে চীনের ভূমিকা বড় বলে তাঁদের ধারণা।
চীন আমদানি প্রায় দিনে ৩ মিলিয়ন ব্যারেল পর্যন্ত কমাতে সক্ষম হয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা বলছেন। এই পরিমাণ প্রায় জাপানের মোট অপরিশোধিত তেলের চাহিদার সমান। অর্থাৎ চীন বাজার থেকে কম তেল কিনে বৈশ্বিক চাহিদার ওপর চাপ কমিয়েছে। এর ফলে সরবরাহ কমলেও দাম আরও বেশি ওঠার জায়গা পায়নি।
চীনের এমন সক্ষমতা হঠাৎ তৈরি হয়নি। যুদ্ধের আগে দেশটি তুলনামূলক কম দামে রাশিয়া ও ইরান থেকে নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন তেল কিনে মজুত বাড়াচ্ছিল। সস্তা সরবরাহের সুযোগ কাজে লাগিয়ে তারা বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মজুত শক্তিশালী করে। বর্তমানে চীনের হাতে ১ বিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল বাণিজ্যিক ও কৌশলগত মজুতে রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন। মে মাস থেকে দেশটি সেই মজুত ব্যবহার শুরু করে।
এখানেই চীনের কৌশল স্পষ্ট। যখন দাম কম ছিল, তারা মজুত করেছে। যখন যুদ্ধ ও সরবরাহ সংকটে দাম বাড়তে শুরু করেছে, তখন আমদানি কমিয়ে মজুত ব্যবহার করেছে। এতে একদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে চাপ কিছুটা কমেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি হয়নি।
চীনের সরকার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। তারা ডিজেল ও পেট্রলের মতো পরিশোধিত জ্বালানি পণ্যের রপ্তানি সীমিত করেছে, যাতে দেশের ভেতরের সরবরাহ নিশ্চিত থাকে। এর ফলে চীনা তেল শোধনাগারগুলোর জন্য বিদেশি বাজারে পণ্য বিক্রির সুযোগ কমে যায়। লাভের সম্ভাবনা কমে গেলে তারা বৈশ্বিক বাজার থেকে বেশি অপরিশোধিত তেল কেনার আগ্রহও হারায়। এভাবেও চীনের আমদানি কমে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে চাপ কমিয়েছে।
শুধু মজুত বা নীতিগত নিয়ন্ত্রণ নয়, চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুত বিস্তারও তেলের বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। চীনে এখন নতুন যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রির প্রায় প্রতি দুটির একটি নতুন জ্বালানি গাড়ি। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, গত বছর চীনের বৈদ্যুতিক গাড়ির বহর দিনে প্রায় ১ মিলিয়ন ব্যারেল তেলের ব্যবহার কমিয়েছে।
এর অর্থ হলো, চীনের ভেতরে পরিবহন খাতে তেলের ওপর নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমছে। আগে যেখানে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মানেই তেলের চাহিদা বাড়া—এখন সেখানে বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌরশক্তি, ব্যাটারি ও নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি চাহিদার চরিত্র বদলে দিচ্ছে। এই পরিবর্তন শুধু পরিবেশগত নয়, ভূরাজনৈতিকও। কারণ তেলের ওপর নির্ভরতা কমলে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের প্রভাবও তুলনামূলকভাবে কমে আসতে পারে।
তবে চীনের এই ভারসাম্য রক্ষার ক্ষমতা সীমাহীন নয়। মজুত থেকে তেল ব্যবহার করা যায়, কিন্তু মজুত চিরস্থায়ী নয়। যদি দাম আবার দুর্বল হয়, তাহলে চীন আবার মজুত বাড়াতে শুরু করতে পারে। এতে বাজারে নতুন চাহিদা তৈরি হবে। আবার যদি দাম বেশি থাকে, তাহলে তারা মজুত ব্যবহার করে আমদানি কমিয়ে যেতে পারে। ফলে চীনের ক্রয়নীতি এখন বাজারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
বর্তমান পরিস্থিতিতে আরেকটি বিপরীত ঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। কয়েক মাস আগেও বাজারে ভয় ছিল—তেলের ভয়াবহ ঘাটতি হবে। এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা সতর্ক করছে, হরমুজ প্রণালি খুলে গেলে আগামী বছর অতিরিক্ত সরবরাহ তৈরি হতে পারে। সংস্থার বুধবার প্রকাশিত মাসিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে উৎপাদন স্বাভাবিক হলে আগামী বছর সরবরাহ বৃদ্ধির হার চাহিদা বৃদ্ধিকে দিনে ৪.৭ মিলিয়ন ব্যারেল ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এই পূর্বাভাস বাজারের জন্য বড় বার্তা। অর্থাৎ একদিকে যুদ্ধের সময় ঘাটতির ভয়, অন্যদিকে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত সরবরাহের সম্ভাবনা—তেলের বাজার এখন দুই বিপরীত চাপে দাঁড়িয়ে আছে।
হরমুজ প্রণালি দ্রুত খুলে গেলে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ব্যারেল আটকে থাকা তেল আবার বাজারে ঢুকতে পারে বলে কেপলারের জ্যেষ্ঠ অপরিশোধিত তেল গবেষণা বিশ্লেষক মুয়ু শু মনে করছেন। এতে দাম দ্রুত নিচে নামার ঝুঁকি থাকবে। একই সঙ্গে যদি যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়, তাহলে ইরানও উৎপাদন বাড়াতে চাইবে। কিন্তু এতে চীনের জন্য আরেকটি হিসাব তৈরি হবে। কারণ নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান এতদিন চীনকে ছাড় দিয়ে তেল বিক্রি করছিল। নিষেধাজ্ঞা উঠে গেলে ইরানি তেল আর আগের মতো সস্তা নাও থাকতে পারে।
তখন চীনের প্রশ্ন হবে—তারা কি বাজারে ফিরে বেশি তেল কিনবে, নাকি অপেক্ষা করবে? এই প্রশ্নের উত্তরই হয়তো আগামী কয়েক মাসে তেলের দামের দিক নির্ধারণ করবে।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক দেশ ইতিমধ্যে গ্রীষ্মের জন্য প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের চাহিদা পূরণ করে ফেলেছে। ফলে হঠাৎ করে অতিরিক্ত তেল বাজারে এলে তা শোষণ করার মতো বড় ক্রেতা খুব বেশি থাকবে না। এমন পরিস্থিতিতে আবার চীনের দিকে তাকাতে হবে। দেশটির মজুত ধারণক্ষমতা, আমদানি সিদ্ধান্ত এবং জ্বালানি নীতি বাজারকে স্থিতিশীল করতে পারে—অথবা দাম আরও নিচে নামিয়ে দিতে পারে।
চীন বর্তমানে এমন এক অবস্থানে আছে, যেখানে সংকটের সময় সে কম কিনে দাম নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে, আবার অতিরিক্ত সরবরাহের সময় বেশি কিনে বাজারকে সহায়তা করতে পারে। তবে সবকিছু নির্ভর করবে চীন কী দামে, কোন উৎস থেকে এবং কী পরিমাণ তেল কিনতে চায় তার ওপর।
এই সংকটের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হতে পারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার। যুদ্ধ ও সরবরাহ অনিশ্চয়তা অনেক দেশকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে—তেলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কতটা নিরাপদ? চীন বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি ও সৌরপ্রযুক্তিতে ইতিমধ্যে বিশ্বনেতা। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর মার্চ মাসে দেশটির পরিচ্ছন্ন জ্বালানি প্রযুক্তি পণ্যের রপ্তানি রেকর্ড ছুঁয়েছে। অর্থাৎ তেল সংকট একদিকে স্বল্পমেয়াদে বাজারকে অস্থির করেছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি রূপান্তরকে দ্রুততর করতে পারে।
সব মিলিয়ে তেলের বাজার এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, হরমুজ প্রণালি বা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার ওপর নির্ভর করছে না। চীনের মজুতনীতি, আমদানি কৌশল, বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানির অগ্রগতি—এসব মিলেই নতুন বাস্তবতা তৈরি করছে।
দুই মাস আগেও আলোচনার কেন্দ্র ছিল তেলের ভয়াবহ ঘাটতি। এখন আলোচনা ঘুরে যাচ্ছে সম্ভাব্য অতিরিক্ত সরবরাহের দিকে। এই দ্রুত বদলে যাওয়া ছবিই প্রমাণ করে, তেলের বাজার আগের মতো সরল নেই। এখানে যুদ্ধ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ কে কতটা কিনছে, কে মজুত করছে, আর কে তেলের বিকল্প তৈরি করছে।
এই মুহূর্তে সেই সমীকরণের সবচেয়ে বড় খেলোয়াড় চীন। হরমুজ প্রণালি খুললে বাজারে তেল ফিরবে, ইরান উৎপাদন বাড়াতে পারে, দাম কমতেও পারে। কিন্তু অতিরিক্ত সরবরাহ কে গ্রহণ করবে—এই প্রশ্নের উত্তর এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। চীন চাইলে বাজারের চাপ কমাতে পারে। আবার চীন অপেক্ষা করলে দাম আরও নরম হতে পারে।
তাই তেলের ভবিষ্যৎ বুঝতে এখন শুধু যুদ্ধের খবর দেখলেই হবে না। নজর রাখতে হবে বেইজিংয়ের দিকে—চীন কখন, কত, কোথা থেকে এবং কোন দামে তেল কিনতে চায়। কারণ বর্তমান তেলবাজারে চীনের সিদ্ধান্তই হয়তো পরবর্তী বড় মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

