ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার পর। ক্ষমতার শীর্ষে কে আসবেন, লেবার পার্টি কোন পথে যাবে, আর সাধারণ ভোটারদের আস্থা কীভাবে ফেরানো হবে—এসব প্রশ্ন এখন ব্রিটেনের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি অ্যান্ডি বার্নাম।
গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে বার্নাম বহুদিন ধরেই জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিত মুখ। তবে এবার তাকে ঘিরে আলোচনা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। কারণ তিনি শুধু একজন আঞ্চলিক নেতা নন; বরং এমন এক রাজনীতিক, যিনি লন্ডনকেন্দ্রিক ক্ষমতার সংস্কৃতির বাইরে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ, বঞ্চনা ও প্রত্যাশার ভাষা তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
অ্যান্ডি বার্নামের রাজনৈতিক যাত্রা সরলরেখায় এগোয়নি। তিনি একসময় ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ভেতরের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সরকারের সময় তিনি মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু তার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে গভীর পরিবর্তনের মুহূর্ত আসে ২০০৯ সালে।
সেই বছর লিভারপুলের অ্যানফিল্ড স্টেডিয়ামে ১৯৮৯ সালের হিলসবোরো বিপর্যয়ে নিহত ৯৭ জন মানুষের স্মরণে আয়োজিত অনুষ্ঠানে যোগ দেন বার্নাম। তৎকালীন লেবার সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন তিনি। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি মানুষের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়েন। নিহতদের পরিবার ও সমর্থকেরা বহু বছর ধরে বিচার ও সত্য প্রকাশের দাবিতে আন্দোলন করছিলেন। তাদের কাছে রাষ্ট্র ও রাজনীতি তখন অবিশ্বাসের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
এই ঘটনাই বার্নামের রাজনীতিকে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করে। পরে তিনি স্বীকার করেন, ওই দিনই পার্লামেন্টকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রতি তার বিশ্বাসে বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। তার উপলব্ধি ছিল, ক্ষমতার কেন্দ্রে বসে রাজনীতি করলে অনেক সময় মানুষের বাস্তব কষ্ট, অপমান ও বঞ্চনার গভীরতা বোঝা যায় না।
এই অভিজ্ঞতা বার্নামের রাজনৈতিক চরিত্র গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি নিজেকে এমন এক নেতা হিসেবে তুলে ধরেন, যিনি কেবল দলীয় নীতির মুখপাত্র নন, বরং স্থানীয় মানুষের অধিকার, আঞ্চলিক বৈষম্য এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলার বিরুদ্ধে কথা বলতে চান।
গত ৯ বছর ধরে তিনি গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই সময়ের মধ্যে তিনি নিজেকে জাতীয় রাজনীতির বাইরে থেকেও প্রভাবশালী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার সমর্থকেরা মনে করেন, বার্নামের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তিনি ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে দূরে থেকেও সাধারণ মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারেন।
করোনা মহামারির সময় তার জনপ্রিয়তা আরও বাড়ে। তখন বরিস জনসনের সরকারের নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তিনি ম্যানচেস্টারের মানুষের জন্য বেশি সহায়তা ও ন্যায্য ব্যবস্থার দাবি তোলেন। অনেকের চোখে সেই সময় বার্নাম হয়ে ওঠেন কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক অধিকার রক্ষার শক্ত কণ্ঠস্বর।
ম্যানচেস্টারের গণপরিবহনব্যবস্থাকে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আনার সিদ্ধান্তও তার ভাবমূর্তি শক্তিশালী করেছে। ব্রিটেনে দীর্ঘদিন ধরে গণপরিবহন নিয়ে মানুষের অসন্তোষ ছিল। বার্নাম এই খাতে পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়ে দেখাতে চেয়েছেন, রাজনীতি শুধু প্রতিশ্রুতির বিষয় নয়; সঠিক পরিকল্পনা থাকলে স্থানীয় জীবনযাত্রায় বাস্তব পরিবর্তন আনা সম্ভব।
স্থানীয় অর্থনীতিকে চাঙা করার প্রচেষ্টাও তাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। অনেকেই তাকে ‘উত্তরের রাজা’ বলে ডাকেন। এই উপাধি যেমন জনপ্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়, তেমনি ব্রিটেনের উত্তরাঞ্চল ও লন্ডনের মধ্যকার পুরোনো বৈষম্যের আলোচনাকেও সামনে আনে। বার্নামের রাজনীতির একটি বড় অংশ দাঁড়িয়ে আছে এই প্রশ্নের ওপর—ব্রিটেন কি শুধু লন্ডনকে ঘিরে চলবে, নাকি দেশের অন্যান্য অঞ্চলও সমান গুরুত্ব পাবে?
অ্যান্ডি বার্নামের ব্যক্তিগত পটভূমিও তাকে অনেক ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে। ১৪ বছর বয়সে তিনি লেবার পার্টিতে যোগ দেন। তার বাবা ছিলেন একজন ফোন প্রকৌশলী এবং মা কাজ করতেন অভ্যর্থনাকর্মী হিসেবে। অর্থাৎ তিনি কোনো অভিজাত রাজনৈতিক পরিবার থেকে উঠে আসেননি। পড়াশোনায় ভালো হওয়ায় তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পান। এই পটভূমি তাকে একদিকে সাধারণ পরিবারের প্রতিনিধি হিসেবে তুলে ধরে, অন্যদিকে রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য শিক্ষিত রাজনীতিক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে তার জাতীয় নেতৃত্বের পথ কখনো সহজ ছিল না। ২০১০ ও ২০১৫ সালে তিনি লেবার পার্টির নেতৃত্ব পাওয়ার দৌড়ে অংশ নেন। দুবারই তিনি ব্যর্থ হন। এই পরাজয় তার রাজনৈতিক যাত্রাকে থামিয়ে দিতে পারত। কিন্তু তিনি ভিন্ন পথ বেছে নেন। জাতীয় নেতৃত্বের কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে তিনি আঞ্চলিক নেতৃত্বে মন দেন।
২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের প্রথম মেয়র নির্বাচনে তিনি ৬০ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে জয়ী হন। এই জয়ের মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেন, লেবার পার্টির ভেতরে নেতৃত্বের দৌড়ে হারলেও জনগণের কাছে তার আবেদন শেষ হয়ে যায়নি। বরং স্থানীয় পর্যায়ে তিনি আরও শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হন। ২০২১ সালে তিনি আরও বড় ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হন, যা তার জনপ্রিয়তার ধারাবাহিকতা প্রমাণ করে।
এখন প্রশ্ন হলো, বার্নাম কি সত্যিই ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার মতো অবস্থানে আছেন? বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তার ওপর নির্ভর করে না। তাকে লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ সমীকরণ, সংসদীয় রাজনীতি, দলীয় নেতৃত্বের কাঠামো এবং জাতীয় ভোটারদের মনোভাব—সবকিছুর মধ্য দিয়ে এগোতে হবে। তবে তার পক্ষে একটি বড় যুক্তি হলো, তিনি বর্তমান রাজনৈতিক হতাশার সময়ে পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে নিজেকে তুলে ধরতে পারেন।
লেবার পার্টির ভেতরে অনেকেই মনে করছেন, দলটি বর্তমানে এক কঠিন চাপের মধ্যে আছে। একদিকে ডানপন্থী রিফর্ম ইউকে ভোটার টানছে, অন্যদিকে বামপন্থী গ্রিন পার্টিও তরুণ ও প্রগতিশীল ভোটারদের আকৃষ্ট করছে। ফলে লেবারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—কীভাবে মধ্যবিত্ত, শ্রমজীবী, তরুণ, আঞ্চলিকভাবে বঞ্চিত এবং আদর্শগতভাবে হতাশ ভোটারদের আবার এক প্ল্যাটফর্মে আনা যায়।
এই জায়গায় বার্নামকে অনেকে সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে দেখছেন। কারণ তিনি একদিকে লেবার পার্টির পুরোনো অভিজ্ঞ রাজনীতিক, অন্যদিকে লন্ডনের বাইরে স্থানীয় শাসন ব্যবস্থায় সফল নেতা। তিনি অভিজ্ঞতা ও পরিবর্তনের দাবি—দুইয়ের মিশ্রণ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে পারেন। তার রাজনৈতিক ভাষা তুলনামূলকভাবে সরাসরি, আবেগী এবং স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে যুক্ত। এটি তাকে প্রচলিত ওয়েস্টমিনস্টার রাজনীতির অনেক নেতার চেয়ে আলাদা করে।
তবে বার্নামের সামনে ঝুঁকিও কম নয়। জাতীয় রাজনীতি আঞ্চলিক জনপ্রিয়তার চেয়ে অনেক কঠিন। গ্রেটার ম্যানচেস্টারে সফল হওয়া আর পুরো যুক্তরাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়া এক বিষয় নয়। বিদেশনীতি, অর্থনীতি, অভিবাসন, করনীতি, স্বাস্থ্যসেবা, প্রতিরক্ষা ও দলীয় ঐক্য—সব ক্ষেত্রে তাকে পরিষ্কার অবস্থান দেখাতে হবে। শুধু ‘লন্ডনের বাইরে মানুষের কণ্ঠস্বর’ হওয়া যথেষ্ট নয়; তাকে প্রমাণ করতে হবে, তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার জটিলতা সামলাতেও প্রস্তুত।
তার আরেকটি চ্যালেঞ্জ হলো লেবার পার্টির ভেতরের ক্ষমতার ভারসাম্য। দলের নেতৃত্বের প্রশ্নে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, সংসদ সদস্যদের সমর্থন, দলীয় সংগঠনের আস্থা এবং নীতিগত গ্রহণযোগ্যতাও গুরুত্বপূর্ণ। অতীতে ২০১০ ও ২০১৫ সালের পরাজয় দেখিয়েছে, দলের ভেতরে তার গ্রহণযোগ্যতা সবসময় অটুট ছিল না। তবে ২০১৭ ও ২০২১ সালের নির্বাচনী সাফল্য তার রাজনৈতিক অবস্থানকে নতুন শক্তি দিয়েছে।
বার্নামের উত্থান আসলে ব্রিটিশ রাজনীতির একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেয়। বহু বছর ধরে ব্রিটেনে অভিযোগ ছিল, ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া অতিরিক্তভাবে লন্ডনকেন্দ্রিক। উত্তর ইংল্যান্ড, শিল্পাঞ্চল, শ্রমজীবী এলাকা এবং স্থানীয় সরকারগুলো নিজেদের বঞ্চিত মনে করে। বার্নাম এই ক্ষোভকে রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছেন। তাই তাকে নিয়ে আলোচনা শুধু একজন ব্যক্তির নেতৃত্বের সম্ভাবনা নয়; এটি কেন্দ্র ও প্রান্তের সম্পর্ক নিয়েও নতুন বিতর্ক।
কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগের ঘোষণার পর লেবার পার্টি যদি নতুন নেতৃত্ব খোঁজে, তবে তাদের সামনে দুটি পথ থাকবে। একদিকে তারা প্রচলিত সংসদীয় নেতৃত্বের ভেতর থেকেই কাউকে বেছে নিতে পারে। অন্যদিকে তারা এমন একজনকে সামনে আনতে পারে, যিনি দলকে নতুনভাবে সাজানোর প্রতিশ্রুতি দেবেন। বার্নাম দ্বিতীয় পথের প্রতীক হতে পারেন।
তার সমর্থকেরা মনে করেন, তিনি দেশের জন্য এক নতুন মোড় ঘোরানোর মুহূর্ত তৈরি করতে পারবেন। তাদের মতে, বর্তমান রাজনৈতিক ক্লান্তি কাটাতে এমন একজন নেতা দরকার, যিনি শুধু নীতি ব্যাখ্যা করবেন না, বরং মানুষের ক্ষোভ বুঝবেন এবং আঞ্চলিক বৈষম্যকে জাতীয় অগ্রাধিকার বানাবেন।
তবে শেষ পর্যন্ত বার্নামের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে তিনি কত দ্রুত নিজেকে জাতীয় পর্যায়ের গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারেন তার ওপর। তিনি কি শুধু ম্যানচেস্টারের জনপ্রিয় মেয়র থাকবেন, নাকি লেবার পার্টির পুনর্গঠনের মুখ হয়ে উঠবেন—এ প্রশ্নের উত্তরই আগামী দিনের ব্রিটিশ রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মোড় নির্ধারণ করতে পারে।
অ্যান্ডি বার্নামের গল্প তাই শুধু একজন রাজনীতিকের উত্থানের গল্প নয়। এটি সেই রাজনীতির গল্প, যেখানে মানুষের ক্ষোভ, আঞ্চলিক বৈষম্য, দলীয় সংকট এবং নেতৃত্বের শূন্যতা এক জায়গায় এসে মিলেছে। ব্রিটেন যদি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক ভাষা খুঁজতে চায়, তবে বার্নাম সেই ভাষার একজন শক্তিশালী দাবিদার হয়ে উঠেছেন।

