মিয়ানমারে রাজনৈতিক সংকট ও সংঘাতের অবসান তো দূরের কথা, পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। সামরিক বাহিনীর আয়োজিত নির্বাচনের সময়কালকে কেন্দ্র করে দেশটিতে যে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছিল, তার ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বছর নির্বাচন ঘোষণার পর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারির শেষ পর্যন্ত মাত্র ছয় মাসে অন্তত ৭০২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন।
সোমবার (২৩ জুন) প্রকাশিত প্রতিবেদনে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর জানিয়েছে, গত বছরের আগস্টে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে ভোটগ্রহণ পর্ব শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এসব তথ্য বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে যাচাই করা হয়েছে। তবে সংস্থাটি মনে করছে, প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এর চেয়েও বেশি হতে পারে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুর সংখ্যা। নিহত ৭০২ জনের মধ্যে ২২৪ জন নারী এবং ১৫৩ জন শিশু। সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে সাধারণ মানুষ যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, এই পরিসংখ্যান তারই প্রতিফলন।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাণহানির সবচেয়ে বড় কারণ ছিল আকাশপথে পরিচালিত হামলা। যুদ্ধবিমান, ড্রোন, প্যারামোটর এবং জাইরোকপ্টার ব্যবহার করে চালানো অভিযানে অন্তত ৫০৫ জন নিহত হয়েছেন। মোট মৃত্যুর প্রায় ৫৭ শতাংশই এসব হামলার ফল। নিহতদের মধ্যে ১৭৫ জন নারী এবং ১১২ জন শিশু ছিলেন। অর্থাৎ সংঘাতের মূল মূল্য দিচ্ছে নিরস্ত্র সাধারণ মানুষ।
জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের মুখপাত্র রাভিনা শামদাসানি জানিয়েছেন, যাচাই করা এই ৭০২টি মৃত্যুর ঘটনার দায় মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর বর্তায়। তবে তিনি একই সঙ্গে উল্লেখ করেন, এর অর্থ এই নয় যে অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় বেসামরিক মানুষ নিহত হয়নি। প্রতিবেদনে শুধু সেই ঘটনাগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর বিষয়ে জাতিসংঘের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ রয়েছে।
বর্তমান সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে ফিরে যেতে হয় ২০২১ সালে। সে বছর সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে সেনাবাহিনী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে। এরপর থেকেই দেশজুড়ে বিক্ষোভ, প্রতিরোধ আন্দোলন এবং সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সংঘাত গৃহযুদ্ধের রূপ নেয়।
পাঁচ বছর ধরে সরাসরি সামরিক শাসনের পর এ বছর নির্বাচন আয়োজন করে জান্তা সরকার। কিন্তু নির্বাচন নিয়ে শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন ছিল। বিরোধী শক্তির বড় অংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে থাকায় ভোটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত জান্তা-সমর্থিত রাজনৈতিক শক্তিগুলো প্রায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে তার উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক সমাধানের পথ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি সামরিক অভিযানও আরও তীব্র হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ ক্রমেই ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্যে পড়ছে।
জাতিসংঘের এই প্রতিবেদন শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি মিয়ানমারের চলমান বাস্তবতার এক কঠিন প্রতিচ্ছবি। নারী ও শিশুদের বিপুল প্রাণহানি দেখিয়ে দিচ্ছে, সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন আর শুধু সশস্ত্র পক্ষগুলো নেই, বরং সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ নাগরিকরাই। আন্তর্জাতিক মহলের আশঙ্কা, দ্রুত কোনো রাজনৈতিক সমাধান বা কার্যকর শান্তি উদ্যোগ না এলে মিয়ানমারের মানবিক পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

