ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে বিতর্ক দীর্ঘদিন ধরে চলছে, তা নিয়ে এবার সরাসরি অবস্থান নিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। তার বক্তব্যে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে যে, বিশ্বের অন্য দেশগুলো যদি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র রাখার অধিকার ভোগ করে, তাহলে একই অধিকার থেকে ইরানকে বঞ্চিত করার কোনো নৈতিক বা রাজনৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না।
ইসলামাবাদে সফররত ইরানের রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে শেহবাজ শরিফ শুধু সাম্প্রতিক আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েই কথা বলেননি, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে হওয়া সাম্প্রতিক সমঝোতার পেছনের বিভিন্ন বিষয়ও তুলে ধরেন। তিনি বিশেষভাবে পরিষ্কার করে দেন যে, বহুল আলোচিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এ ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি এবং এটি কখনোই আলোচ্যসূচির অংশ ছিল না।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বিষয়ে নানা ধরনের গুজব ও ভুল ব্যাখ্যা ছড়ানো হলেও বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার ভাষায়, সমঝোতার আলোচনায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি এবং ইরানও এ বিষয়ে কোনো আলোচনা করতে আগ্রহ দেখায়নি। তিনি জোর দিয়ে বলেন, এই বিষয়ে তিনি পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েই কথা বলছেন।
শেহবাজের বক্তব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বিদ্যমান তথাকথিত দ্বৈত মানদণ্ড নিয়ে তার সমালোচনা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি কিছু দেশ নিজেদের নিরাপত্তার জন্য ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পরিচালনা করতে পারে, তাহলে একই অধিকার ইরানের ক্ষেত্রে অস্বীকার করা হবে কেন? তার মতে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় এমন বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অবিচারই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক অস্থিরতাও বাড়াতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তানের এই অবস্থান কেবল একটি কূটনৈতিক মন্তব্য নয়; বরং এটি মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানকে ঘিরে আন্তর্জাতিক চাপ, নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে অনেক দেশই এখন আরও ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থানের পক্ষে কথা বলছে। শেহবাজ শরিফের বক্তব্য সেই ধারারই একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কিছু শক্তি এখনো এই শান্তি প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তার মতে, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে শুরু করা ইরানকে পুনরায় অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মহল সক্রিয় রয়েছে। তবে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, চলমান কূটনৈতিক উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথকে আরও শক্তিশালী করবে।
উল্লেখ্য, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া মার্কিন-ইসরায়েল ও ইরান সংশ্লিষ্ট সামরিক সংঘাতের পর এটিই ছিল ইরানের রাষ্ট্রপতির প্রথম বিদেশ সফর। পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পথ তৈরি হয় এবং গত সপ্তাহে একটি আনুষ্ঠানিক সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে ঘিরেই এখন আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।
শেহবাজ শরিফ তার বক্তব্যে তুরস্ক, কাতার, সৌদি আরব এবং মিসরের নেতৃত্বের প্রতিও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তার মতে, এসব দেশের সহযোগিতা ছাড়া যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার পরিবেশ তৈরি করা আরও কঠিন হয়ে পড়ত। তিনি জানান, আগামী সপ্তাহে তিনি তেহরান সফর করবেন, যেখানে দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করা এবং চলমান সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হবে।
পর্যবেক্ষকদের মতে, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্য শুধু ইরানের প্রতি সমর্থনের বার্তা নয়, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা, কৌশলগত ভারসাম্য এবং আন্তর্জাতিক নীতির ক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থানও প্রকাশ করে। ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে, তবে ইসলামাবাদ যে এই প্রশ্নে তেহরানের পাশে দাঁড়িয়েছে, তা এখন আর কোনো গোপন বিষয় নয়।

