মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উত্তেজনা কমতে শুরু করায় এখন নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে বিশ্বের জ্বালানি বাজার। যুদ্ধের কারণে বন্ধ হয়ে যাওয়া তেলকূপ, স্থগিত উৎপাদন এবং সীমিত রপ্তানির পর আবার স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছে অঞ্চলটির তেলসমৃদ্ধ দেশগুলো। হরমুজ প্রণালি আবার নৌযান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তির বার্তা পৌঁছেছে। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা তেলক্ষেত্রগুলো কি আগের মতো উৎপাদনে ফিরতে পারবে?
এই প্রশ্নকে ঘিরেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য। সংঘাত চলাকালে তিনি একাধিকবার দাবি করেছিলেন, দীর্ঘ সময় তেল উৎপাদন বন্ধ থাকলে ভূগর্ভস্থ চাপের কারণে তেলক্ষেত্রে বড় ধরনের ক্ষতি এমনকি বিস্ফোরণও ঘটতে পারে। তার মতে, একবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে অনেক ক্ষেত্রেই সেই তেল আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয় না।
তবে জ্বালানি খাতের বিশেষজ্ঞরা বিষয়টিকে অনেক বেশি সতর্ক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিতে দেখছেন। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে কিছু প্রযুক্তিগত ঝুঁকি তৈরি হয় ঠিকই, কিন্তু ট্রাম্প যে ধরনের বিপর্যয়ের কথা বলেছেন, বাস্তবে পরিস্থিতি সাধারণত ততটা ভয়াবহ হয় না।
কেন বন্ধ হয়েছিল উৎপাদন?
ইরানকে ঘিরে সামরিক সংঘাতের সময় হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়। প্রণালিতে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় তেলবাহী জাহাজের চলাচল ব্যাহত হয় এবং উৎপাদক দেশগুলো সংরক্ষণ সংকটে পড়ে।
একই সময়ে ড্রোন হামলা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইরাকের কিছু তেলক্ষেত্রে উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়। নিষেধাজ্ঞা ও রপ্তানি সংকটের কারণে ইরানকেও কিছু তেলকূপের কার্যক্রম স্থগিত করতে হয়েছিল।
তবে তেল উৎপাদন বন্ধ করা যতটা সহজ মনে হয়, বাস্তবে তা নয়। এটি অত্যন্ত জটিল একটি প্রকৌশল প্রক্রিয়া। একটি কূপ বন্ধ করার আগে চাপ নিয়ন্ত্রণ, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ভবিষ্যৎ পুনরায় চালুর বিষয়গুলো মাথায় রাখতে হয়। ফলে পুরো কাজটি সম্পন্ন করতে কয়েক দিন থেকে কয়েক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
কূপ বন্ধ থাকলে কী ঘটে?
ভূগর্ভে থাকা তেলের ভান্ডার একটি জীবন্ত ব্যবস্থার মতো কাজ করে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকলে সেখানে চাপের ভারসাম্য পরিবর্তিত হতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পানির অনুপ্রবেশ বাড়তে পারে, যা পরবর্তীতে উৎপাদনের সক্ষমতা কমিয়ে দেয়।
এ ছাড়া পাম্প, পাইপলাইন এবং অন্যান্য যন্ত্রাংশে মরিচা ধরার ঝুঁকি তৈরি হয়। বালু বা অন্যান্য উপাদান জমে উৎপাদন ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ না হলে তেল বা গ্যাস লিক হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ে।
বিশ্ববাজার বিশ্লেষক বিকাশ দ্বিবেদীর মতে, তেলক্ষেত্র পুনরায় চালুর পর কী পরিস্থিতি তৈরি হবে, তা আগে থেকে শতভাগ নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। প্রতিটি ক্ষেত্রের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হওয়ায় ফলাফলও ভিন্ন হতে পারে।
ট্রাম্পের আশঙ্কা কতটা সত্য?
বিশেষজ্ঞদের বড় অংশ মনে করেন, দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে কিছু ক্ষতি হতে পারে, কিন্তু ব্যাপক বিস্ফোরণ বা স্থায়ী ধ্বংসের আশঙ্কা অনেকটাই অতিরঞ্জিত।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অতীতেও বহুবার দীর্ঘ সময়ের জন্য তেলকূপ বন্ধ রাখা হয়েছে। বিশেষ করে বৈশ্বিক মহামারির সময় জ্বালানির চাহিদা ধসে পড়লে অসংখ্য তেলক্ষেত্রের উৎপাদন স্থগিত করা হয়েছিল। তখনও বড় ধরনের স্থায়ী ক্ষতির ঘটনা খুব কমই দেখা গেছে।
উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ অতীতেও বহুবার সাময়িকভাবে কূপ বন্ধ রেখেছে। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা তাদের রয়েছে।
বরং কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন বন্ধ রাখার ফলে ভূগর্ভস্থ চাপ নতুনভাবে ভারসাম্যে আসে এবং পরবর্তীতে উৎপাদন আরও কার্যকর হতে পারে। যদিও এটি সব ক্ষেত্রের জন্য প্রযোজ্য নয়।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
যুদ্ধ শেষ হওয়া মানেই সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া নয়। তেলকূপ পুনরায় চালু করাও একটি ধীর এবং নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া।
প্রথমে প্রতিটি কূপের অবস্থা পরীক্ষা করতে হবে। এরপর ধাপে ধাপে উৎপাদন বাড়াতে হবে যাতে ভূগর্ভস্থ ভান্ডারের ওপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে পানি ও গ্যাস প্রবেশ করিয়ে চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।
মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল তেলক্ষেত্রগুলো একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত অবকাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। ফলে একটি দেশের সিদ্ধান্ত অন্য দেশের উৎপাদন ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করতে পারে। এ কারণে পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বাজারের জন্য কী বার্তা?
বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্ব জ্বালানি বাজারের জন্য স্বস্তিদায়ক হলেও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। উৎপাদন পুনরায় শুরু হতে কিছুটা সময় লাগবে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে উৎপাদন আগের তুলনায় কমও থাকতে পারে।
তবে সামগ্রিকভাবে বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যের তেলশিল্প এই ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় যথেষ্ট অভিজ্ঞ। তাই যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো ধীরগতির প্রযুক্তিগত পুনরুদ্ধার, কোনো নাটকীয় বিপর্যয় নয়।
অর্থাৎ, তেলক্ষেত্রে ভয়াবহ বিস্ফোরণের যে আশঙ্কা নিয়ে আলোচনা চলছে, বাস্তবতা আপাতত তার চেয়ে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও প্রযুক্তিনির্ভর। এখন বিশ্বের নজর থাকবে, কত দ্রুত মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদকরা পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরে আসতে পারে এবং সেই পুনরুদ্ধার বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে কতটা স্থিতিশীল করতে পারে।

