ইরান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। এই বাস্তবতার কেন্দ্রে শুধু ইরান, ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র নেই; বড় প্রশ্ন হয়ে উঠেছে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো কোন দিকে ঝুঁকবে। চীনের জন্য বিষয়টি এখন আরও সংবেদনশীল। কারণ বেইজিং বুঝতে পারছে, মধ্যপ্রাচ্যে তার প্রভাব টিকিয়ে রাখতে হলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে পুরোপুরি ওয়াশিংটনের দিকে চলে যেতে দেওয়া যাবে না।
১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান যুদ্ধ থামাতে একটি অন্তর্বর্তী চুক্তিতে সই করেন। এর ফলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে যায় এবং ইরানের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করা তেল নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পথ তৈরি হয়। যুদ্ধ শেষের আলোচনায় পৌঁছালেও এর প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। এই সংঘাত দেখিয়ে দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি শক্তি নিজেদের স্বার্থ, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ জোট নিয়ে নতুন করে হিসাব করছে।
চীনের হিসাবটিও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বেইজিংয়ের প্রধান লক্ষ্য আর শুধু ইরানের পাশে থাকা নয়। বরং তার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো উপসাগরীয় শক্তিগুলো, বিশেষ করে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত, যেন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক বলয়ের ভেতরে পুরোপুরি ঢুকে না পড়ে।
এই পরিবর্তনের পেছনে শুধু ইরান যুদ্ধ নয়, চীনের নিজস্ব কূটনৈতিক অগ্রাধিকার বদলও কাজ করছে। এপ্রিল ২০২৫ সালে চীন প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রীয় সম্মেলন করে। ১২ বছরের মধ্যে এটিই ছিল এমন প্রথম সম্মেলন। সেখানে বেইজিং নিজের আশপাশের অঞ্চলকে পররাষ্ট্রনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় বসায়। এর অর্থ হলো, মধ্যপ্রাচ্য চীনের কাছে এখনও গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা আর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নয়।
এই কারণেই ইরান যুদ্ধের পর চীনের মধ্যপ্রাচ্যনীতি অনেক বেশি বাস্তববাদী হয়ে উঠেছে। বেইজিং এখন বুঝতে পারছে, সীমিত সম্পদ ও মনোযোগ দিয়ে তাকে এমন একটি অঞ্চল সামলাতে হবে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র এখনও সবচেয়ে শক্তিশালী নিরাপত্তা প্রদানকারী এবং যেখানে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের বাঁচাতে দ্রুত অবস্থান বদলাতে পারে।
যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের অবস্থানকে আরও পরিষ্কার করে দিয়েছে। ইসরায়েল এখন নিঃসন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ শিবিরে। ইরান যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও দূরে সরে গেছে এবং শিগগিরই তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম। এই জায়গায় চীনের জন্য একটি সুবিধা আছে। ইরান অর্থনৈতিকভাবে চীনের ওপর নির্ভরশীল এবং একই ওজনের বিকল্প অংশীদার তার সামনে নেই। ফলে চীন ইরানে খুব বেশি নতুন বিনিয়োগ বা ঝুঁকি না নিয়েও তেহরানের ওপর প্রভাব ধরে রাখতে পারে।
তবে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর প্রশ্নটি আলাদা। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এখনও পুরোপুরি এক শিবিরে আটকে যায়নি। তারা অর্থনীতি, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও কূটনীতির ক্ষেত্রে নানা দিক খুলে রাখতে চায়। চীনের জন্য এখানেই সুযোগ, আবার এখানেই ঝুঁকি।
চীন ইরানকে নানা বাস্তব উপায়ে সহায়তা করেছে। ইরানের তেল রপ্তানির বড় অংশ চীন কিনেছে। যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর ওপর ইরানি হামলার নিন্দা করা থেকেও বেইজিং বিরত থেকেছে। কিন্তু এই সংঘাত চীনের সীমাও দেখিয়েছে। চীন সরাসরি সামরিক সহায়তা দেয়নি, ইরানের মাটিতে সামরিক উপস্থিতি তৈরির দিকেও যায়নি। অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে সামনে রেখে বেইজিং এ ধরনের পদক্ষেপ এড়িয়ে গেছে।
ইরানের পক্ষে এই বাস্তবতা মেনে নেওয়া ছাড়া খুব বেশি পথ নেই। কারণ তার বিকল্প অংশীদার সীমিত। তাই চীন-ইরান সম্পর্ক টেকসই হলেও সেটি চীনের জন্য তুলনামূলক কম খরচের সম্পর্ক। কিন্তু সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে চীনকে অনেক বেশি সূক্ষ্মভাবে চলতে হবে।
চীনের ভয় হলো, এই দুই উপসাগরীয় শক্তি যদি ইসরায়েলের মতো যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ব্যবস্থার ভেতরে পুরোপুরি ঢুকে যায়, তাহলে বেইজিংয়ের হাতে বাণিজ্যিক সম্পর্ক থাকলেও কূটনৈতিক প্রভাব অনেক কমে যাবে। চীন তখন তেল কিনতে পারবে, বাজারে পণ্য বিক্রি করতে পারবে, কিন্তু বড় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে তার প্রভাব সীমিত হয়ে পড়বে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, চীন যুক্তরাষ্ট্রের মতো নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিতে প্রস্তুত নয়। ওয়াশিংটন বহু দশক ধরে উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত। সামরিক ঘাঁটি, অস্ত্র সরবরাহ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা, গোয়েন্দা সহযোগিতা—এসব ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান গভীর। চীন এ জায়গায় প্রতিযোগিতায় নামতে চায় না, অন্তত এখনই নয়। তাই বেইজিংয়ের লক্ষ্য জেতা নয়; বরং প্রতিপক্ষকে পুরোপুরি জিততে না দেওয়া।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের ক্ষেত্রে চীনের অবস্থান দুর্বল হয়েছে। যুদ্ধের সময় আমিরাত দেখেছে, যুক্তরাষ্ট্রের সরবরাহ করা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তার ভূখণ্ডের দিকে আসা শত শত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং হাজার হাজার ড্রোন ঠেকাতে ভূমিকা রেখেছে। আবুধাবির কাছে এর বার্তা পরিষ্কার—সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের বিকল্প নেই।
এপ্রিল মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্টের কূটনৈতিক উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করেন এবং এই সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার অঙ্গীকার করেন। যুদ্ধের পর এই অবস্থান আরও দৃঢ় হয়েছে। প্রতিরক্ষা থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা—দুই ক্ষেত্রেই আমিরাত এখন যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোর দিকে বেশি ঝুঁকছে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত প্যাক্স সিলিকা এবং স্টারগেট প্রকল্পে যুক্ত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যখন স্পষ্ট করে দেয় যে জি ফোরটি টু–এর চীনা অংশীদারিত্ব আমেরিকান চিপ পাওয়ার পথে বাধা, তখন প্রতিষ্ঠানটি হুয়াওয়ের সরঞ্জাম সরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ও এনভিডিয়ার প্রসেসর পাওয়ার পথ নেয়। এর ফলে আমিরাতের জন্য চীনের সঙ্গে প্রযুক্তিগত সহযোগিতার জায়গা সংকুচিত হয়েছে।
সৌদি আরবের অবস্থান তুলনামূলকভাবে বেশি খোলা। মার্চ ২০২৩ সালে চীন সৌদি আরব ও ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে মধ্যস্থতা করে। এর মাধ্যমে বেইজিং দেখায়, সে এমন এক বহিরাগত শক্তি, যে একই সঙ্গে রিয়াদ ও তেহরানের সঙ্গে কথা বলতে পারে। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতায়ও চীনের সক্রিয় ভূমিকার কথা ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করেন। চীনের প্রভাব এখানে সামরিক শক্তির ওপর নয়, অর্থনৈতিক নির্ভরতার ওপর দাঁড়িয়ে।
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্ক রাখলেও নিজেকে পুরোপুরি যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা কাঠামোর ভেতরে আটকে রাখেনি। দেশটি নিজের ভূখণ্ডে স্থায়ী মার্কিন ঘাঁটি চায়নি, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তির পথেও যায়নি। সংযুক্ত আরব আমিরাত বা বাহরাইনের তুলনায় সৌদি আরব বেশি কাঠামোগত দূরত্ব বজায় রেখেছে। এটাই চীনের জন্য সুযোগ তৈরি করেছে।
সৌদি আরব ছিল প্রথম উপসাগরীয় দেশ, যে চীনা ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র সংগ্রহ করে। কাতারের সঙ্গে এটি এখনও সেই দুই দেশের একটি, যারা এমন অস্ত্র নিয়েছে। পরবর্তীতে সৌদি আরব চীনের গণমুক্তি ফৌজের নৌবাহিনীর সঙ্গে যৌথ মহড়াও করেছে। পাশাপাশি দেশটি প্যাক্স সিলিকা এবং স্টারগেট কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উদ্যোগের বাইরে থেকেছে। এই দূরত্বই বেইজিংয়ের কূটনৈতিক কাজের জায়গা।
তবে সৌদি আরবও সহজ অংশীদার নয়। রিয়াদ নিজের স্বার্থ দেখে চলে। সে চীনের সঙ্গে অর্থনীতি, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে সম্পর্ক রাখতে চায়, আবার যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতাও পুরোপুরি হারাতে চায় না। তাই চীনের সামনে কাজ হলো সৌদি আরবকে নিজের দিকে টেনে আনা নয়, বরং তাকে একচেটিয়াভাবে যুক্তরাষ্ট্রের দিকে চলে যাওয়া থেকে ঠেকানো।
ইরান যুদ্ধের আরেকটি বড় প্রভাব পড়েছে চীনের আঞ্চলিক কূটনৈতিক পরিকল্পনায়। জুনের মাঝামাঝি বেইজিংয়ে দ্বিতীয় চীন-আরব রাষ্ট্র সম্মেলন হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে তা অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যায়। একইভাবে চীন-উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ সম্মেলনও পিছিয়ে পড়ে। এই মঞ্চগুলো ব্যবহার করে চীন তার অবস্থান শক্ত করতে চেয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধ সেই পরিকল্পনায় বিরতি এনে দিয়েছে।
এখন বেইজিংয়ের হাতে সময় কম। কারণ উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো দ্রুত নিজেদের নিরাপত্তা, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ করছে। একবার যদি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় গভীরভাবে ঢুকে যায়, তাহলে সেখান থেকে তাদের সরানো কঠিন হবে। তখন চীনের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, কিন্তু সেই সম্পর্ক অনেক বেশি সীমিত ও বাণিজ্যনির্ভর হয়ে পড়বে।
এখানে চীনের কৌশলকে প্রতিরোধমূলক কূটনীতি বলা যায়। সে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে দিতে চায় না, কারণ তার সে সক্ষমতা ও আগ্রহ এখন নেই। সে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা রক্ষক হতে চায় না, কারণ তা খুব ব্যয়বহুল ও ঝুঁকিপূর্ণ। সে শুধু এমন একটি অবস্থান ধরে রাখতে চায়, যেখানে রিয়াদ ও আবুধাবি বেইজিংয়ের সঙ্গে কাজ করার দরজা বন্ধ না করে।
এই কৌশল চীনের বৃহত্তর পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গেও মেলে। বেইজিং এখন নিজের আশপাশের অঞ্চলকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে সে সীমিত খরচে প্রভাব ধরে রাখার পথ খুঁজছে। জ্বালানি, বাজার, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও কূটনৈতিক সংযোগ—এসব ক্ষেত্রে চীন সক্রিয় থাকবে। কিন্তু সামরিক প্রতিশ্রুতি বা নিরাপত্তা নিশ্চয়তার মতো ভারী বোঝা নিতে সে প্রস্তুত নয়।
ইরান যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র তাই নতুনভাবে পড়তে হবে। ইরান চীনের দিকে বাঁধা, ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে স্থির, সংযুক্ত আরব আমিরাত দ্রুত ওয়াশিংটনের দিকে ঝুঁকছে, আর সৌদি আরব এখনও হিসাব কষছে। এই হিসাবের মধ্যেই চীনের সবচেয়ে বড় সুযোগ লুকিয়ে আছে।
শেষ পর্যন্ত বেইজিংয়ের লক্ষ্য খুব উচ্চাকাঙ্ক্ষী নয়। চীন উপসাগর জয় করতে চাইছে না; সে শুধু উপসাগর হারাতে চায় না। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত যেন এমন জায়গায় না পৌঁছায়, যেখানে চীনের সঙ্গে কৌশলগত সহযোগিতা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে—এটাই তার মূল লক্ষ্য। মধ্যপ্রাচ্যে চীনের নতুন বাস্তববাদী কৌশলের কেন্দ্রে তাই ইরান নয়, উপসাগরই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

