ইতালির রাজধানী রোমে এক বাংলাদেশি পরিবারের ওপর ভয়াবহ হামলায় তিনজন নিহত এবং একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় শুক্রবার (২৬ জুন) রাত প্রায় ৯টার দিকে শহরের পশ্চিমাঞ্চলের পিনেতা সাচেত্তি এলাকার ভিয়া মন্তিগ্লোতে একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাটে এ ঘটনা ঘটে। হত্যাকাণ্ডের পর পুরো এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করেছে ইতালীয় পুলিশ এবং হামলার কারণ উদঘাটনে ব্যাপক তদন্ত শুরু হয়েছে।
নিহতদের মধ্যে পরিবারের কর্তা কামাল হোসেনের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে। তাঁর গ্রামের বাড়ি বাংলাদেশের নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ইতালিতে বসবাস করছিলেন। হামলায় নিহত অন্য দুইজন হলেন তাঁর স্ত্রী এবং পাঁচ বছর বয়সী কন্যাসন্তান।
একই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন পরিবারের ১৮ বছর বয়সী বড় ছেলে। তাকে দ্রুত উদ্ধার করে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে ইতালীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, প্রাথমিক চিকিৎসার পর তার শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল এবং তিনি আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন।
স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি ধারালো অস্ত্র নিয়ে ওই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে পরিবারের সদস্যদের ওপর হামলা চালায়। আকস্মিক এ হামলায় কামাল হোসেন, তাঁর স্ত্রী এবং ছোট মেয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। হামলাকারীকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে বড় ছেলেও ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত হন। পরে তিনি আহত অবস্থায় ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে সাহায্য চাইলে প্রতিবেশীরা জরুরি সেবায় ফোন করেন।
খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে ইতালীয় পুলিশ, অ্যাম্বুলেন্স এবং বিশেষ পুলিশ বাহিনী কারাবিনিয়েরির সদস্যরা। তারা নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে এবং আহত যুবককে হাসপাতালে পাঠায়। এরপর পুরো ভবন ঘিরে আলামত সংগ্রহ ও তদন্ত কার্যক্রম শুরু করা হয়।
ঘটনার পর ইতালীয় পুলিশের বিশেষ তদন্ত ইউনিট এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন নমুনা ও আলামত সংগ্রহ করেছেন। আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং সম্ভাব্য প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গেও কথা বলছেন তদন্ত কর্মকর্তারা। হামলাকারীকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে বিভিন্ন স্থানে অভিযান চলছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে কী উদ্দেশ্য কাজ করেছে, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। এটি পূর্বপরিকল্পিত হামলা, ডাকাতির চেষ্টা নাকি ব্যক্তিগত বিরোধের জের—সব ধরনের সম্ভাবনাই তদন্তে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে এ মুহূর্তে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ থেকে বিরত রয়েছে পুলিশ।
রোমে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির সদস্যরা এ ঘটনায় গভীর শোক ও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত তদন্ত শেষ করে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ইতালীয় কর্তৃপক্ষের আরও কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।
ইতালীয় পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, এটি অত্যন্ত মর্মান্তিক ও নৃশংস একটি হত্যাকাণ্ড। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত পরিচালনা করা হচ্ছে। তদন্তে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া গেলে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
এই ঘটনায় ইতালিতে বসবাসরত বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা এবং প্রবাসী পরিবারগুলোর সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তদন্ত শেষ হলে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ এবং দায়ীদের বিষয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য জানা যাবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।

