ভারত ও পাকিস্তানের দীর্ঘদিনের বিরোধপূর্ণ সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু আবারও সামনে এসেছে। এবার উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সিন্ধু পানি চুক্তি। পাকিস্তান সরকার স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছে, দেশটির প্রাপ্য পানির প্রবাহে বাধা দেওয়ার যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে মোকাবিলা করা হবে। ইসলামাবাদের এই বক্তব্য দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বিদ্যমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মুসাদিক মালিক এক সংবাদ সম্মেলনে ভারতের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে বলেন, ইসলামাবাদের ন্যায্য পানির অংশ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হচ্ছে। তার ভাষ্য, আন্তর্জাতিক চুক্তিতে নিশ্চিত হওয়া পাকিস্তানের পানির অধিকার কোনোভাবেই খর্ব করা যাবে না।
তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশের নেতৃত্ব প্রকাশ্যে এমন বক্তব্য দিয়েছে যে পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেওয়া হবে না। এমন অবস্থান আন্তর্জাতিক আইন ও বিদ্যমান চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পাকিস্তানের মতে, পানির প্রশ্নটি শুধু পরিবেশগত নয়, এটি সরাসরি দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। মুসাদিক মালিক বলেন, পাকিস্তানের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফলে নদীর পানির প্রবাহ কমে গেলে কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। তার দাবি, দেশের মোট অর্থনীতির প্রায় এক-চতুর্থাংশ কৃষি খাতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও কঠোর ভাষায় বলেন, পাকিস্তানের প্রাপ্য পানি কেড়ে নেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টার পরিণতি কঠিন হবে। এমনকি তিনি মন্তব্য করেন, কেউ যদি পাকিস্তানের পানির অধিকার হরণ করতে চায়, তবে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিশ্বের অনেক আন্তঃসীমান্ত নদীতে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি না থাকলেও উজান থেকে ভাটিতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় থাকে। সেখানে সিন্ধু নদীর মতো আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতাভুক্ত নদীতে পানি আটকে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।
তবে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, পাকিস্তানের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে এসব বক্তব্য প্রকাশিত হলেও তারা স্বাধীনভাবে বক্তব্যগুলোর সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
একই সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার বলেন, সিন্ধু পানি চুক্তি এখনো আন্তর্জাতিকভাবে কার্যকর রয়েছে এবং এটি কোনো দেশ একতরফাভাবে স্থগিত, বাতিল কিংবা পরিবর্তন করতে পারে না। তার দাবি, আন্তর্জাতিক আইনও পাকিস্তানের অবস্থানকে সমর্থন করে।
তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফ এবং সেনাপ্রধান আসিম মুনির একাধিকবার স্পষ্ট করেছেন যে, পানির প্রশ্ন পাকিস্তানের জন্য একটি ‘রেডলাইন’ বা অতিক্রম করা যাবে না—এমন সীমা।
এই বক্তব্যের পেছনে সাম্প্রতিক আরেকটি ঘটনারও প্রভাব রয়েছে। কয়েক সপ্তাহ আগে ভারতের কেন্দ্রীয় পানিসম্পদমন্ত্রী সি আর পাটিল এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, আগামী দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে সিন্ধু নদীর পানিতে ভারতের প্রাপ্য অংশ পুরোপুরি ব্যবহার করা হবে এবং ভারতের জন্য বরাদ্দ এক ফোঁটা পানিও পাকিস্তানে যেতে দেওয়া হবে না। সেই মন্তব্যের পরই ইসলামাবাদের পক্ষ থেকে নতুন করে কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখা গেল।
এদিকে ভারতের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তান বর্তমানে তীব্র পানি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে সিন্ধ ও বেলুচিস্তান অঞ্চলে পানির ঘাটতির কারণে কৃষি, জীবিকা এবং স্থানীয় অর্থনীতি উল্লেখযোগ্য চাপের মুখে রয়েছে।
প্রতিবেদনগুলোতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ পানিসংকটের প্রভাব ভোগ করছে। যদিও পাকিস্তান এই পরিস্থিতির জন্য ভারতের পদক্ষেপকে দায়ী করছে, তবে বিভিন্ন বিশ্লেষণে দুর্বল পানি ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং অভ্যন্তরীণ পানি বণ্টন ব্যবস্থার ত্রুটিকেও সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিন্ধু পানি চুক্তি বহু দশক ধরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, নিরাপত্তা ইস্যু এবং পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে এই চুক্তিও এখন নতুন করে বিতর্কের কেন্দ্রে চলে এসেছে। যদি দুই দেশ কূটনৈতিক সংলাপের মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে না পায়, তাহলে পানির প্রশ্ন ভবিষ্যতে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় ভূরাজনৈতিক সংকটে পরিণত হতে পারে।

