মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্ভাব্য আলোচাকে ঘিরে নতুন বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান নিজেই বৈঠকের অনুরোধ জানিয়েছে এবং সেই অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতেই মঙ্গলবার কাতারের রাজধানী দোহায় দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। তবে ট্রাম্পের এই বক্তব্য প্রকাশের কিছুক্ষণের মধ্যেই তেহরান তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করে।
মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশাল-এ সম্পূর্ণ বড় হাতের অক্ষরে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ইরান বৈঠকের অনুরোধ করেছে এবং মঙ্গলবার দোহায় সেই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। বার্তার শেষে তিনি নিজেকে ‘প্রেসিডেন্ট ডিজেটি’ বলেও উল্লেখ করেন।
ইন্টারনেট সংস্কৃতিতে পুরো বাক্য বড় হাতের অক্ষরে লেখা সাধারণত চিৎকার করে বক্তব্য দেওয়ার সমতুল্য হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রযুক্তিবিষয়ক বিভিন্ন বিশ্লেষণে এটিকে অনেক সময় অনলাইন শিষ্টাচারের পরিপন্থী বলেও ধরা হয়। তবে ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের লেখার ধরন ব্যবহার করে আসছেন।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে ব্যবহারবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে তৎকালীন টুইটার কর্তৃপক্ষ ট্রাম্পের অ্যাকাউন্ট স্থগিত করেছিল। পরে তিনি নিজস্ব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশাল চালু করেন। পরবর্তীতে মালিকানা পরিবর্তনের পর তার এক্স অ্যাকাউন্ট পুনরায় চালু হলেও তিনি এখনো মূলত ট্রুথ সোশালেই বেশি সক্রিয়।
তবে ট্রাম্পের সর্বশেষ দাবির সঙ্গে একমত নয় ইরান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাই স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো পর্যায়ের বৈঠকের পরিকল্পনা আপাতত নেই।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিনিধিদল চলতি সপ্তাহে দোহা সফরে যাবে ঠিকই, কিন্তু সেই সফরের উদ্দেশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা নয়। তিনি বলেন, চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা নিয়ে দরকষাকষির মতো পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি এবং আগামী কয়েক দিনের মধ্যে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো বৈঠকের পরিকল্পনাও নেই।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আবার ভিন্ন চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। ট্রাম্পের মুখপাত্র জানিয়েছেন, এ সপ্তাহে উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় অংশ নিতে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ট্রাম্পের উপদেষ্টা ও জামাতা জ্যারেড কুশনার দোহায় যাচ্ছেন। পরে সংবাদমাধ্যমও নিশ্চিত করেছে যে, স্টিভ উইটকফ ইতোমধ্যে কাতারের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে দোহায় কী ধরনের কূটনৈতিক তৎপরতা চলবে, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে কৌতূহল আরও বেড়েছে।
এর আগে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালিতে আন্তর্জাতিক নৌযান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি প্রাথমিক সমঝোতায় পৌঁছেছিল। কিন্তু সেই সমঝোতা কার্যকর হওয়ার আগেই উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে এবং চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
পরবর্তীতে ট্রাম্প আবারও দাবি করেন, দুই দেশ সংঘাত বন্ধ রাখতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। কিন্তু সেই ঘোষণার পরও উভয় দেশের সরকারি বক্তব্যে একাধিক বিষয়ে অসামঞ্জস্য দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে সম্ভাব্য বৈঠক, আলোচনার উদ্দেশ্য এবং সময়সূচি নিয়ে দুই পক্ষের বক্তব্য একেবারেই মিলছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয় দেশই কূটনৈতিক যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না। তবে প্রকাশ্য বক্তব্য ও বাস্তব কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যে যে পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তা ইঙ্গিত দিচ্ছে—চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে এখনো অনেক জটিলতা রয়ে গেছে। দোহার সাম্প্রতিক কূটনৈতিক তৎপরতা সেই জটিলতা কমাবে নাকি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করবে, সেটিই এখন আন্তর্জাতিক রাজনীতির অন্যতম আলোচ্য বিষয়।

