বাংলাদেশের বহুল আলোচিত স্ট্রিট আর্ট চরিত্র ‘সুবোধ’ কি এবার দেশের সীমানা পেরিয়ে ভারতের সিকিমে পৌঁছে গেছে? এমন প্রশ্নই এখন ঘুরছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। রহস্যময় শিল্পী হবেকি-র নতুন একটি গ্রাফিতি প্রকাশের পর শিল্পপ্রেমী, বিশ্লেষক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে শুরু হয়েছে নানা আলোচনা ও ব্যাখ্যা। অনেকের মতে, এটি কেবল একটি দেয়ালচিত্র নয়; বরং সীমান্ত, স্বাধীনতা এবং মানুষের চলাচলকে ঘিরে গভীর এক প্রতীকী বার্তা।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ‘হকার অব সুবোধ’ নামে পরিচালিত একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে নতুন শিল্পকর্মটির ছবি প্রকাশ করা হয়। ছবির ক্যাপশনে লেখা ছিল— “রংপো, সিকিম, ভারত”। ছবিতে দেখা যায়, গ্যাংটক-রংপো সড়কের মাজিতার নালা সেতুর দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের একটি কংক্রিটের দেয়ালে বিশাল আকৃতির গ্রাফিতিটি আঁকা হয়েছে। স্টেনসিল ও স্প্রে রঙে তৈরি প্রায় ২০ ফুট দীর্ঘ ও ১২ ফুট উঁচু এই শিল্পকর্মের পাশে শিল্পীর পরিচিত স্বাক্ষর “হবেকি?”-ও রয়েছে। জানা গেছে, গত ৩০ জুন প্রথম স্থানীয়ভাবে দেয়ালচিত্রটি নজরে আসে।
এই নতুন গ্রাফিতিতে সুবোধকে দেখা যাচ্ছে একেবারেই ভিন্ন রূপে। এতদিন তাকে দৌড়াতে, পালাতে কিংবা অদৃশ্য কোনো ভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করতে দেখা গেলেও এবার সে যেন শান্ত, ক্লান্ত এক পথিক। খালি গায়ে, এলোমেলো চুলে এবং ছেঁড়া জিন্স পরে একটি দোলনায় শুয়ে আছে সে। তবে সেই দোলনাটি বাঁধা রয়েছে কাঁটাতারের সঙ্গে। তার ডান হাতে রয়েছে একটি তার কাটার যন্ত্র, আর বাম হাত ঝুলে আছে নিচে রাখা পানিভর্তি একটি বালতির দিকে।
প্রথম দেখায় দৃশ্যটি শান্ত ও নিরীহ মনে হলেও শিল্পকর্মের প্রতিটি উপাদান আলাদা অর্থ বহন করে। দোলনা সাধারণত বিশ্রাম, স্বস্তি এবং স্বাধীনতার প্রতীক। অন্যদিকে কাঁটাতার বোঝায় সীমান্ত, নিষেধাজ্ঞা, বিভাজন ও নিয়ন্ত্রণ। এই দুই বিপরীত প্রতীককে পাশাপাশি রেখে শিল্পী যেন এমন এক বাস্তবতার কথা তুলে ধরেছেন, যেখানে স্বাধীনভাবে চলাচলের স্বপ্ন বারবার সীমান্তের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়। আর হাতে থাকা তার কাটার যন্ত্রটিও বাস্তব কোনো ঘটনার ইঙ্গিত নয়; বরং অনেকে এটিকে সীমাবদ্ধতা ভাঙার আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবেই দেখছেন।
শিল্পকর্মটি প্রকাশের সময়টিও অনেকের নজর কেড়েছে। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রায় দুই বছর বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতের পর্যটক ভিসা কার্যক্রম সীমিত ছিল। পরে ২৮ জুন থেকে আবার বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটক ভিসা চালু হয় এবং দেশের পাঁচটি ভিসা কেন্দ্রের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। এর মাত্র দুই দিন পর ভারতের সিকিমে সুবোধের উপস্থিতি অনেকের কাছে কেবল কাকতালীয় নয়, বরং সময়ের সঙ্গে মিল রেখে তৈরি করা একটি প্রতীকী বার্তা বলেই মনে হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ এটিকে দুই দেশের মানুষের যাতায়াতের নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন বলছেন, আবার কেউ সীমান্ত অতিক্রমের প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন। তবে শিল্পী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
রংপোকে শিল্পকর্মের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়াটাও তাৎপর্যপূর্ণ। সিকিমে প্রবেশের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত এই এলাকা প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের যাতায়াত, পরিচয় যাচাই এবং অনুমতির প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। ফলে সীমান্ত ও চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে প্রতীকী বার্তা দেওয়ার জন্য এই স্থানকে অনেকেই যথাযথ বলে মনে করছেন।
হবেকির শিল্পকর্ম বরাবরই দর্শকের নিজস্ব ব্যাখ্যার জন্য উন্মুক্ত থাকে। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কেউ এটিকে সীমান্ত রাজনীতির ভাষ্য হিসেবে দেখছেন, কেউ অভিবাসন ও পরিচয়ের সংকটের প্রতিফলন হিসেবে ব্যাখ্যা করছেন, আবার কেউ মনে করছেন এটি মানুষের স্বাধীনভাবে চলাচলের অধিকারের পক্ষে এক নীরব শিল্পীসুলভ বক্তব্য। শিল্পী কোনো ব্যাখ্যা না দেওয়ায় এই গ্রাফিতিকে ঘিরে রহস্য আরও বেড়েছে।
বাংলাদেশের দেয়াল থেকে শুরু করে এবার ভারতের সিকিম—সুবোধের এই নতুন উপস্থিতি আবারও দেখিয়ে দিল, স্ট্রিট আর্ট শুধু রঙ-তুলির কাজ নয়; এটি সমাজ, রাজনীতি, সীমান্ত এবং মানুষের অনুভূতিকে একসঙ্গে তুলে ধরার শক্তিশালী মাধ্যমও হতে পারে। এই শিল্পকর্মের প্রকৃত অর্থ হয়তো কেবল শিল্পীই জানেন, কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত—সিকিমের এই গ্রাফিতি সীমান্তের দুই পাশেই নতুন করে আলোচনা, কৌতূহল এবং নানা ব্যাখ্যার জন্ম দিয়েছে।

