মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এক প্রতিবেদনে গোয়েন্দা মূল্যায়নের বরাত দিয়ে দাবি করা হয়েছে, নতুন নেতৃত্বে ইরানের পারমাণবিক নীতিতে পরিবর্তন আসতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত বা ঘোষণা দেয়নি তেহরান।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে পরিবর্তনের পর দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি গোয়েন্দা সংস্থার মূল্যায়নকে কেন্দ্র করে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, নতুন নেতৃত্ব পূর্বসূরিদের তুলনায় পারমাণবিক অস্ত্র ইস্যুতে ভিন্ন অবস্থান নিতে পারে।
মার্কিন সংবাদপত্র নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি ভবিষ্যতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নতুন দিকনির্দেশনা দিতে পারেন। যদিও তিনি এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে পারমাণবিক বোমা তৈরির পক্ষে কোনো বক্তব্য দেননি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ইরানের পারমাণবিক প্রযুক্তির উন্নয়নে সমর্থন দিলেও সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির পক্ষে ছিলেন না। অন্যদিকে বর্তমান নেতৃত্ব এবং দেশটির কট্টরপন্থী রাজনৈতিক বলয় ভবিষ্যতে সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা ইরানের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত চিন্তাভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। তাদের ধারণা, যদি তেহরান মনে করে যে শক্তিশালী প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োজন, তাহলে দেশটির কৌশলগত নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বর্তমানে ইরান হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের প্রভাব আরও জোরদার করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি বা কূটনৈতিক আলোচনায়ও কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থান ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তেহরান এখন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক সক্ষমতার প্রশ্নে আরও দৃঢ় নীতি অনুসরণ করছে।
তবে মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারাই সতর্ক করে বলেছেন, মোজতবা খামেনির অবস্থান নিয়ে তাদের অধিকাংশ মূল্যায়ন সংঘাত শুরুর আগের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। যুদ্ধ চলাকালে তিনি গুরুতর আহত হন বলে দাবি করা হয়েছে এবং এরপর থেকে জনসমক্ষে তার উপস্থিতিও অনেক কমে গেছে। ফলে তার বর্তমান অবস্থান বা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও মোজতবা খামেনি এখনও তার পূর্বসূরির মতো পূর্ণ রাজনৈতিক ও ধর্মীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা আলী খামেনির পর নেতৃত্বের এই পরিবর্তন ইরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ ইরানের বিরুদ্ধে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বলা হয়েছে, ইরান এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি পুনরায় সম্প্রসারণের ঘোষণা দেয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, সাম্প্রতিক হামলার পর ইরান তাদের পারমাণবিক অবকাঠামো আরও নিরাপদ করার উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে কিছু সেন্ট্রিফিউজ মধ্য ইরানের একটি উচ্চ নিরাপত্তাসম্পন্ন ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় স্থানান্তরের চেষ্টা চলছে বলে তারা মনে করছেন।
তবে এসব মূল্যায়ন মূলত মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষণ ও সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশিত। ইরান সরকার এখন পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির বিষয়ে কোনো নতুন নীতিগত ঘোষণা দেয়নি। ফলে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা ও জল্পনা অব্যাহত থাকলেও বাস্তবে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে।

